কাশ্মিরের বিরোধপূর্ণ সীমানায় ভারতের সেনাঘাঁটিতে হামলার পেছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে ভারত। ঘটনার পাল্টায় পাকিস্তানকে ‘কড়া জবাব’ দেওয়ার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে ভারতের সেনাবাহিনীর মধ্যে। ভারতের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সীমান্ত পেরিয়ে পাক ভূখণ্ডে সীমিত সময়ের জন্য হামলার দাবি তুলেছে ভারতীয় সেনার একটা বড় অংশ। কিন্তু এর ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে বলেও আশঙ্কা করছে কেন্দ্র।

ওই এলাকায় দুই যুগের বেশি সময় ধরে চলা বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডের মধ্যে রোববারের ভয়াবহ ওই হামলায় ১৭ জন ভারতীয় সেনা সদস্য নিহত হন; আহত হন ৩৫ জন। এই হামলার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর। এই ঘটনা পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জিত তিক্ত সম্পর্কের এ দুটি দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনা আরও উসকে দিয়েছে; তৈরি হয়েছে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কা। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সামরিকায়িত এই সীমানাজুড়ে অনেক জায়গায় ভারত ও পাকিস্তানের সেনারা খুব কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও প্রায়ই ঘটে থাকে। ভারতের লেফটেনেন্ট রণবির সিং নয়া দিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, রোববারের হামলায় পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী জাইশমোহাম্মদের ছাপ রয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহিত নমুনাগুলোতে ইঙ্গিত মিলেছে, হামলাকারীরা বিদেশি এবং তাদের অস্ত্র ও সজ্জায় পাকিস্তানের চিহ্ন রয়েছে। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকরা উপযুক্ত জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে।’ তবে এবিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

এদিকে নয়াদিল্লির মন্তব্যকে ‘ভিত্তিহীন এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন’, বলে উল্লেখ করেছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার এক বিবৃতি প্রকাশ করে ইসলামাবাদের তরফে দাবি করা হয়েছে, কোনও প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানকে দায়ী করছে ভারত। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ‘ভারতের রাজনৈতিক এবং সামরিক নেতৃত্ব যে ভাবে কোনও প্রমাণ ছাড়াই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করছে, তাতে পাকিস্তান অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’ ইসলামাবাদের এই বিবৃতির কোনও ছাপ অবশ্য নয়াদিল্লির নর্থ ব্লক বা সাউথ ব্লকে দেখা যায়নি। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু গতকাল বলেছেন, ‘আমাদের অভিযোগকে পাকিস্তান মানল না নস্যাৎ করল, তাতে সত্যিই কিছু যায় আসে না। পাকিস্তান কী বলল, সে নিয়ে আমাদের ভাবার কোনও প্রয়োজন নেই।’ রিজিজুর মন্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত, পাকিস্তানের সঙ্গে কোনও আলোচনা বা দ্বিপাক্ষিক কর্মসূচির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজার চেষ্টা আপাতত নয়াদিল্লি করবে না।

উরির হামলার পর ভারত কিভাবে এর জবাব দেবে তা ঠিক করার জন্য দিল্লিতে সিনিয়র মন্ত্রীদের সাথে গতকাল বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকে ‘হট পারস্যুট’এর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। ‘হট পারস্যুট’ হচ্ছে পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদীদের ধাওয়া করে, প্রয়োজনে সীমান্ত বা নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে জঙ্গি ঘাঁটিতে প্রত্যাঘাত করা। কিন্তু সে বিষয়েও এখনই সবুজ সংকেত দিতে নারাজ নয়াদিল্লি। তবে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ভিডিও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে মন্ত্রিসভাকে বুঝিয়েছেন, ভারতপাক সীমান্ত বা নিয়ন্ত্রণরেখা জুড়ে এখন যেটা চলছে ‘তা সীমিত যুদ্ধেরই ক্ষুদ্র সংস্করণ’।

বিজেপির একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশও কঠোর প্রত্যাঘাতের নীতি অনুসরণ করতে চাইছে। বিজেপি নেতা রাম মাধব মন্তব্য করেছেন, ‘একটা দাঁতের জবাবে গোটা চোয়ালটাই নিয়ে নিতে হবে।’ কিন্তু পাকিস্তান সম্পর্কে ঠিক কতটা ও কী ধরনের কঠোর নীতি নেওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে বিজেপির ভিতরে এবং বাইরে অনেক প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। প্রথমত, কূটনীতিকরা বলেছেন, বাস্তবে সীমিত যুদ্ধ বলে কিছু হয় না। যে কোনও মুহূর্তে তা ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। আর ভারত পাকিস্তান উভয়েই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র। দ্বিতীয়ত, সংযত থাকার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে। বিশেষ করে আমেরিকা দু’দেশের রাজনৈতিক উত্তাপ কমানোর পক্ষে। কূটনীতিকদের একাংশ বলছেন, উরির ঘটনা আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানকে কোণঠাসা করার নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে নয়াদিল্লিকে। মোদীকে তাই সব মতামতই খতিয়ে দেখতে হবে।

বিবিসির নিরাপত্তা বিশ্লেষক রাহুল বেদি লিখছেন, ভারতের নিরাপত্তা নীতির সাথে জড়িতদের একটি অংশ বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানকে একটি বার্তা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তারা মনে করেন, পাকিস্তানের হাতে পারমাণবিক বোমা থাকলেও স্বল্প মাত্রার ঝটিকা একটি সামরিক অভিযান সম্ভব। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা লে. জেনারেল বিজয় কাপুর বলেছেন, ‘পাকিস্তানকে এখনই দেখাতে হবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কতোটা।’ কিন্তু রাহুল বেদি বলছেন, সেরকম অভিযানের পেছনে ঝুঁকি যে কতো মারাত্মক হতে পারে, তা নিয়ে হয়তো এই তত্ত্বের সমর্থকরা অতোটা ভাবেন না। তাছাড়াও, রোববারের হামলার পর সময় যত পার হচ্ছে সে ধরনের ঝটিকা সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে গেছে। খবর বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার।

LEAVE A REPLY