সঞ্জয় বড়ুয়া

বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত হলেও জলাবদ্ধতার কারণে এখন সবধরনের বাণিজ্য থমকে আছে আগ্রাবাদ এলাকায়। আর এলাকার আশপাশের সবার জীবন কাটছে পানিবন্দি অবস্থায়। দেশের প্রায় সব ব্যাংকের প্রধান শাখা অফিসগুলো এখানে। সরকারি অফিস, নামিদামি করপোরেট অফিস থেকে শুরু করে মার্কেট, শপিং সেন্টারও আছে আগ্রাবাদে। বাণিজ্যিক এই এলাকার চারদিকে অনেক স্কুলকলেজও রয়েছে। আরো আছে আবাসিক এলাকায় হাজার হাজার পরিবারের বসতি। কিন্তু সবাই এখন নিয়মিত পানিবন্দি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর অন্যতম কারণ দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং মৃতপ্রায় মহেশখালের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব।

অল্প বৃষ্টি হলেই আগ্রাবাদসহ সিডিএ আবাসিক, মোগলটুলী, বেপারী পাড়া, ছোটপুল, হালিশহরের অলিগলিতে পানি ওঠে। ভারি বর্ষণ হলেই এলাকার ৮০ ভাগ জায়গা হাঁটু পানিতে ডুবে যায়। কোথাও কোথাও কোমর পর্যন্ত পানি থাকে। সেই সাথে জোয়ারের পানিতেও প্লাবিত হয় এখানকার বেশিরভাগ রাস্তাঘাটবাড়িঘর। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চায় ব্যবসায়ীচাকরিজীবীসাধারণ মানুষ সবাই। স্থানীয় এবং অভিজ্ঞদের মতে, আগ্রাবাদের চারদিকে নালানর্দমাগুলো নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন। সেই সাথে আগ্রাবাদের চারদিকে এবং সিডিএ আবাসিকসহ আশেপাশের এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত না হয় সেজন্য মহেশ খালে ুইচ গেইট নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। পানি সেচের জন্য পর্যাপ্ত পাম্পের ব্যবস্থাসহ ড্রেনেজ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার দাবি এলাকাবাসীর। নয়তো শুধুমাত্র পানিবন্দি থাকার কারণেই বাণিজ্যিক এলাকার বাণিজ্য যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতিও।

বাসা এবং কর্মস্থল দুই জায়গাতেই পানির সাথে নিয়মিত যুদ্ধ করতে হয়। রেলওয়ে কর্মকর্তা পে এন্ড ক্যাশ বিভাগের অডিটর আশরাফ উদ্দিন আহমেদ জানান, গতকাল ভারি বর্ষণের মাঝে আগ্রাবাদ থেকে কর্মস্থল পুরাতন রেলওয়ে স্টেশনের পাশে আসতে তাকে বিভিন্নস্থানে প্রায় সাঁতরে আসতে হয়েছে। তার মতো বেহাল দশা আগ্রাবাদের আরো অনেকের। আগ্রাবাদ ডেবার পাড়ের গাউছিয়া পাড়ার এই বাসিন্দা বলেন, ‘আগ্রাবাদে এভাবে পানি উঠতে কখনো দেখিনি। আগে বৃষ্টি বেশি হলে পানি দ্রুত সরে যেতো। কিন্তু এখন পানি সরছেই না, শুধু বাড়ছে।’

চট্টগ্রামের প্রত্যেকটি নালানর্দমা এবং খালগুলো দখলমুক্ত করে নগর পরিকল্পনায় এখন থেকেই যদি আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগে তাহলে জলাবদ্ধতা আরো বাড়বে উল্লেখ করে সিটি ব্যাংক লিমিটেডের আগ্রাবাদ শাখার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. নেয়ামত উল্লাহ বলেন, ‘অবিশ্বাস্যভাবে পানি বাড়ছে চট্টগ্রামে। আগ্রাবাদে এভাবে পানিবন্দি জীবন কাটাতে দেখিনি কখনো। পানি নিষ্কাষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই এখানে। সবকিছু পুরনো আমলের। আর বড় বড় নালা এবং খালগুলোও দখলের কারণে এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জলাবদ্ধতা বাড়ছে। দ্রশুত সময়োপযোগী পরিকল্পনা নিয়ে তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন। নয়তো এভাবে বাণিজ্যিক এলাকার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি।’

গত মাসে ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী অতি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কারণে মাত্র একদিন অফিসের কাজ করা সম্ভব হয়েছে জানিয়ে শ্যামলী আবাসিকের বাসিন্দা মো. শাহনেওয়াজ বলেন, উত্তর আগ্রাবাদের শান্তিবাগের চারদিকে কোমর পানিতে গৃহবন্দি হয়ে আছি। তবু দৈনন্দিত প্রয়োজনে বিভিন্ন কাজে বাইরে যেতে হয়। বেহাল রাস্তাঘাটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জলাবদ্ধ নগরীতে যাতায়াত করতে হয় উল্লেখ করে এই ব্যবসায়ী আরো বলেন, আগ্রাবাদের চারদিকে শুধু পানি নয়, রাস্তাঘাটের অবস্থাও খুব খারাপ। এভাবে তো এলাকায় থাকা সম্ভব নয়।

শিক্ষার্থীদের অবস্থা আরো খারাপ। নিয়মিত কোচিং এবং পড়ালেখার প্রয়োজনে কখনো আগ্রাবাদ, সিডিএ আবাসিক এবং হালিশহরে যাতায়াত কাউসার আহমেদের। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে হাঁটু পানি দেখেও ফিরতে পারেনি বাসায়। বাড়তি রিকসাভাড়া করে যেতে হয়েছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে।

মোগলটুলী বাজারের আবেদীন ভবনের চারদিকে অলিগলিরাস্তাঘাট নর্দমার পানিতে একাকার। তাই কলেজ যাওয়া হচ্ছে না উল্লেখ করে ঋতুপর্ণা বড়ুয়া বলেন, এখানে একটু বৃষ্টি হলেই নর্দমার পানি রাস্তায় উঠে আসে। সব সময় এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। এবছর ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকেই নিয়মিত পানিবন্দি থাকতে হচ্ছে। চারদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে এলাকার বেশিরভাগ ঘরবাড়িতে হাঁটু পানি।

আগ্রাবাদ, সিডিএ আবাসিক, বেপারী পাড়া, ছোটপোল, বড়পোল, মোগলটুলী, হালিশহরসহ বেশিরভাগ এলাকা এখন নিয়মিত পানিবন্দি থাকে উল্লেখ করে সিডিএ আবাসিকের বাসিন্দা ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন বলেন, ‘আলোচিত মহেশ খালে সম্প্রতি জোয়ারের কারণে দুর্ভোগে পড়েছে নগরীর আগ্রাবাদ ও হালিশহরের হাজার হাজার পরিবার, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী মানুষজন।’ মহেশখালের বাঁধ অপসারনের পরও দীর্ঘ দুই বছর ধরে জমে থাকা আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করে এই খালকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চট্টগ্রামেও অনেক নিচু এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকা। তাই জোয়ারের পানিতে এ এলাকা যাতে আর প্লাবিত হতে না হয় সেজন্য সল্টগোলা রেলক্রসিংয়ে মহেশখালের মুখে ুইচ গেইট নির্মাণসহ পানি নিষ্কাষণের জন্য প্রয়োজনীয় পাম্পের ব্যবস্থা করতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন সবাইকে এক হয়ে দ্রুত এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। নয়তো জনশূণ্য হয়ে পড়বে আগ্রাবাদের বেশিরভাগ আবাসিক এলাকা।’

LEAVE A REPLY