আহমদ মমতাজ

খ্রিস্টিয় ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি আমি ও রাইহান নাসরিনের লেখা চট্টল মনীষা (প্রথম খণ্ড) প্রকাশিত হয়। গ্রন্থের ‘মুখবন্ধ’তে লিখেছিলাম “প্রজ্ঞাবান, তীক্ষ্নবুদ্ধিসম্পন্ন ও প্রতিভাবান ব্যক্তিরাই মনীষী। যাঁদের বুদ্ধিমত্তা ও মনীষীসুলভ কর্মকান্ডে সমাজ আলোকিত, জগৎ উপকৃত এবং মনুষ্যত্ব বিকশিত হতে পারে তাঁরাই মনীষী। প্রাচীনকাল থেকে এ সকল মনীষীর আবির্ভাবে সমাজ আলোকিত হয়েছে। যুগে যুগে সমাজকে জাগিয়েছেন যাঁরা এমন হাজারো মনীষীর পদস্পর্শে ধন্য চট্টগ্রাম কিন্তু এঁদের অনেকেই আজ আমাদের কাছে অজানা, অচেনা। অথচ এঁদের অবদানের একদিকে যেমন সামাজিক মূল্য রয়েছে তেমনি ইতিহাসের প্রয়োজনে তাঁদের পরিচয় জানার গুরুত্বও অপরিসীম।”

আমরা দীর্ঘদিন (অন্তত এক যুগ) ধরে চট্টগ্রামের বি মৃত প্রায় মনীষীদের জীবনী ও কর্ম সম্পর্কে অদম্য কৌতূহল নিয়ে কাজ করেছি ও কিছু কমবেশি চার শ’জনের জীবনী সংগ্রহ করেছি, তার মধ্যে ২১৫ জনের জীবনী ‘চট্টল মনীষা’ প্রথম খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এঁদের মধ্যে অনেকের পরিচিতি ও সামাজিক জীবনে তাঁদের অবদান বা ত্যাগতিতিক্ষা কালের গর্ভে মিলিয়ে গেছে। বর্তমান ও ভূবিষ্যৎ প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হতে পারে তা তাঁদের আদর্শে উজ্জীবিত হতে পারে এমন আশায় বুক বেঁধে আমরা এক দুরূহ কাজে হাত দিয়েছি।

দক্ষিণচট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার শিলাইগড়া গ্রামের উকিল মোখলেসুর রহমান এমনই একজন ব্যক্তিত্ব যিনি তাঁর একাত্তর বছরের জীবনের পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় কর্মসূত্রে কলকাতায় কাটালেও জন্মস্থান চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষের সাথে সর্বদা নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। নানা উপলক্ষে কলকাতায় যাওয়া চট্টগ্রামবাসীর জন্য এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কলকাতার বাড়ি ছিলো সদা উন্মুক্ত ও থাকাখাওয়ার জন্য পরম নির্ভরতার স্থান। আইনপেশার পাশাপাশি সাংবাদিকতালেখালেখি এবং সামাজিক কল্যাণমুখি সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ও কলকাতায় চট্টগ্রাম সম্মিলনীর কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। সাহিত্যসংস্কৃতিক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চট্টগ্রাম সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক পদক লাভ করেন। আইনপেশাসহ নানাবিধ ব্যস্ততা সত্ত্বেও বছরের একটি মাস তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কাটিয়ে যেতেন, গ্রামের শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে অবদান রাখেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও নিষ্ঠাআন্তরিকতায় একজন সফল আইনজীবী, সামাজিকসাংস্কৃতিকসাংবাদিকতা জগতে বহুল পরিচিতি ও সাধারণ মানুষের কাছে মানবতাবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

উকিল মোখলেসুর রহমানের জন্ম ১৯০৪ সালে শিলাইগড়া গ্রামের থানাদার বাড়িতে। তাঁর পিতা হেদায়েত আলী চৌধুরীর জমিদারী ছিল। তিনি স্থানীয় ধানপুরা বাজারে মসজিদ পুকুর ও খালের উপর সাঁকো নির্মাণ করেন। ১৯৩২ সালে মৃত্যুর আগে স্ত্রী ওমদাদুন নেছা ও পুত্র উকিল মোখলেছুর রহমানসহ পবিত্র হজ্ব পালন করেন। মৃত্যুকালে রেখে যান ৪ পুত্র, ৩ কন্যা ও স্ত্রী ওমদাদুন্নেছা চৌধুরীকে। জমিদারসমাজকর্মী হেদায়েত আলীর পুত্ররা হলেনআবদুল আজিজ চৌধুরী, আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী, মোখলেসুর রহমান চৌধুরী ও ওবায়দুর রহমান চৌধুরী।

শিলাইগড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী থানাদার বাড়ির আদিপুরুষ ছিলেন চৌধুরী সামাদ আলী থানাদার। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সময় তিনি শিলাইগড়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রবাদ আছে ‘বখসে আলী ফৌজদারের তেইশ পালকি, থানাদারের বাইশ পালকি”। পূর্বপুরুষ সামাদ আলী থানাদারের বাইশ পালকিও থাকলেও উত্তরপুুরুষ পৌত্র হেদায়েত আলীর ছিল দুটি আট বেহারার পালকি ও দুটি ঘোড়া। তিনি নিজ ঘোড়ায় চড়তেন ও অন্তঃপুরের মেয়েরা চড়তেন পালকিতে। বিয়ে করেন বড় উঠান গ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাঠান বাড়ির মেয়ে ওমদাদুন্নেছা খানমকে। সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারের সন্তান মোখলেসুর রহমান গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়েন। ভর্তি হন বাড়ির নিকটবর্তী আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে। এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাঙালি ও বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান মনীষী আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। তিনি থানাদার বাড়িতেই থাকতেন এবং এই বাড়িতে থেকেই স্কুলে যাতায়াত করতেন। সাহিত্য বিশারদ আনোয়ারা স্কুলে শিক্ষকতা করেন ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত। তিনি লিখেছেনআনোয়ারা স্কুলে শিক্ষকতার কালই তাঁর পুঁথি সংগ্রহ ও লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার স্বর্ণযুগ। এরপর তিনি ইন্সপেক্টর অব স্কুলস্‌ অফিসে কেরানি পদে চাকরি পান ও ১৯৩৪ সালে সরকারি চাকরির বিধানমতে অবসর গ্রহণ করেন।

ধারণা করা যায় থানাদার বাড়ির শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবী হেদায়েত আলী চৌধুরীর আগ্রহে ও উদ্যোগে আবদুল করিম (পরবর্তীকালে সাহিত্যবিশারদ) এর এই বাড়িতে থাকাখাওয়ার সুব্যবস্থা হয়। আবদুল করিম যখন আনোয়ারা স্কুলে যোগদান ও এই বাড়িতে থাকতে শুরু করেন সেসময় মোখলেসুর রহমান ছিলেন এক দেড় বছরের শিশু। তিনি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে কিছুদিন পড়ে ভর্তি হন ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত আনোয়ারা মধ্য ইংরেজি স্কুলে। ১৯১৪ সালে এই স্কুল মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। মোখলেসুর রহমান ১৯২০ সালে আনোয়ারা হাই স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯২২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯২৬ সালে বি. এ পাস করে উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতা যান। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অধ্যক্ষের স্বাক্ষরিত সনদপত্র অনুযায়ী মোখলেসুর রহমানের দুই সেশনে ‘মহসিন বৃত্তি’ লাভের কথা জানা যায়। সেকালে মেধাবী বাঙালি মুসলমান ছাত্ররা উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এই মহসিন বৃত্তির অর্থে জীবনে প্রতিষ্ঠালাভ করেন। গুগলির বিখ্যাত দানবীর হাজি মুহাম্মদ মহসিনের অর্থে এই বৃত্তি চালু হয়। এদেশের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠিত হয় এই মহানুভব ব্যক্তির ফান্ডের টাকায়।

মোখলেসুর রহমান চট্টগ্রাম কলেজের কৃতী ছাত্র ছিলেন। নিয়মিত, মেধাবী ও সৃজনশীল কাজের জন্য তিনি শিক্ষকদের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য মোখলেসুর রহমানকে তাঁর ক্লাসের ৃভণ মতর্ দণ ঠর্ণ্রর্ ্রলঢণর্ভ উল্লেখ করেছেন। কলেজের অপর শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক এম. হাসান (খান বাহাদুর), অধ্যাপক খলিলুর রহমানসহ আরো কয়েকজন অধ্যাপক তাঁদের দেওয়া সনদপত্রে মোখলেসুর রহমানের বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি ও ইতিহাস বিষয়ে তাঁর গভীর অনুরাগ ও দক্ষতার কথা উল্লেখ করেন। চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্রাবস্থায় তিনি কলেজ ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেনএই তথ্য পাওয়া যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ ক্লাসে অধ্যয়নকালীন তাঁর শিক্ষক, বিশিস্ট ভাষাতাত্ত্বিক পন্ডিত ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের হাতে লেখা সনদপত্রে। মোখলেসুর রহমান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ বুৎপত্তি অর্জন করেন। তাঁর এই পারদর্শিতার কথা উল্লেখ আছে তাঁর শিক্ষক আচার্য সুনীতিকুমারের লেখায়। জানা যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় বাংলা ভাষায় শ্রেষ্ঠ রচনার জন্য আশুতোষ মেমোরিয়াল পুরস্কার ও চট্টগ্রাম সাহিত্য পরিষৎ কর্তৃক ১৯৩২ সালে রৌপ্য পদক লাভ করেন। তিনি ১৯২৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম. . পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইন বিষয়ে ১৯৩০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক ও ১৯৩৫ সালে বি. এল. ডিগ্রি অর্জন করেন।

মোখলেসুর রহমান কলকাতা জীবনে বিচিত্র ধরনের পেশা ও কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে লেখাপড়া ও থাকাখাওয়া ব্যয় নির্বাহের জন্য পড়াশুনার পাশাপাশি তেলের ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর ছোট ভাই ওবায়দুর রহমান চৌধুরী বার্মার রেঙ্গুনে থাকতেন। তিনি রেঙ্গুন থেকে জাহাজে কন্টেইনারে তেল পাঠাতেন কলকাতায়। মোখলেসুর রহমান সেই তেল বোতলজাত করে বিক্রি করতেন। ছাত্রাবস্থায় ব্যবসা করে তিনি প্রচুর অর্থ রোজগার করেন।

মোখলেসুর রহমান চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে কলেজ ম্যাগাজিন সম্পাদনার অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. . ক্লাসের ছাত্রাবস্থায় ৯১বি হ্যারিসন রোডস্থ ইউনানী মেডিকেল হল ও বেগম বাহার অফিসে ব্যবস্থাপক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। সম্ভবত তেলের ব্যবসা করেন এর পরবর্তী কোনো সময়। ইউনানী মেডিকেলের কারখানা ছিল দক্ষিণ কলকাতার ঢাকুরিয়া। মালিক ছিলেন বিশিষ্ট ইউনানী চিকিৎসক হেকিম মসিহার রহমান। তিনি ‘মোসলেম দর্পণ’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। পত্রিকাটি ১৯২৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়, রেজিস্ট্রার্ড নং ড.১৩৩৪. পত্রিকার কার্যালয় ৩৩ নং মুসলমান পাড়া লেন, শিয়ালদহ, কলকাতা। পত্রিকার সহসম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মোখলেসুর রহমান। পত্রিকাটির ৩য় বর্ষ ৩য় সংখ্যার (মার্চ, ১৯২৭) প্রচ্ছদে সম্পাদকঃ মৌলবী হাকিম মসিহর রহমান কোরায়শী ও সহ সম্পাদক মৌলবী মোখলেসুর রহমান বি. .নাম মুদ্রিত আছে। পত্রিকার সম্পাদকের এক প্রত্যয়নপত্রে (১৯৩৩) দেখা যায়, মোখলেসুর রহমান ইউনানী মেডিক্যাল হলের ৭ বছর ম্যানেজার দায়িত্বের পাশাপাশি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রুপ রিডারএর দায়িত্ব পালন করতেন।

মোখলেসুর রহমান ‘নওরোজ’ নামে একটি মাসিকপত্র সম্পাদনা করেন। ১৯২৭ সালের জুনে (বাংলা ১৩৩৪) প্রকাশিত প্রথম বর্ষ ৫ম ও ৬ষ্ঠ মুক্ত সংখ্যার (৪৯২ পৃষ্ঠা) প্রচ্ছদে সম্পাদক মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান বি. . আনোয়ারী মুদ্রিত হয়। পত্রিকার স্থায়িত্বকাল সম্পর্কে জানা যায়নি। এ বিষয়ে ১৯২৮ সালে আচার্য সুনীতিকুমারের লেখা প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। পত্রিকার প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যায় লেখা ছাপা কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন, কাজী আবদুল ওদুদ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেক খ্যাতিমান কবিসাহিত্যিকের।

মোখলেসুর রহমানের কলকাতার সাহিত্যিক ও সুধী মহলে সুপরিচিতি ছিল। তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির (বাঙালি মুসলমানদের একটি সাহিত্য সংগঠন, কলকাতায় ১৯১১ সালে প্রতিষ্ঠিত) একাধিকবার কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। সমিতির প্রতিষ্ঠাতাগণ হলেনমওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রমুখ। পরবর্তীকালে যুক্ত হন মৌলবী আবদুল করিম বি., খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ প্রমুখ। জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে মুসলিম কবিসাহিত্যিকদের একত্রিত করে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে জাতীয় জাগরণ ও জাতীয়তাবোধের সঞ্চারে এই সমিতি দীর্ঘকালব্যাপী অবদান রাখে। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সাথে যুক্ত ছিলেন মুজফফর আহমদ (কমরেড) এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম করাচী থেকে ফিরে ও সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে এই সাহিত্য সমিতিতে আশ্রয় লাভ করেন ও সমিতির পত্রিকায় তাঁর অনেক লেখা প্রকাশিত হয়। ১৯২৯ ও ১৯৩০ সালে সমিতির অফিসিয়াল (সিলমোহর করা) চিঠিতে এই তথ্য পাওয়া যায়।

মোখলেসুর রহমান কলকাতায় চট্টগ্রামবাসীদের উদ্যোগে ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম সম্মিলনী সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন। সভাপতি ছিলেন দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, এবং চন্দ্র শেখর সেন, . বেনীমাধর বড়ণ্ডয়া ও বিপ্লবী বিনোদবিহারী দত্তসহ অনেক বিশিষ্ট চট্টগ্রামী। সংগঠনের ২৬ সদস্যের মধ্যে সহকারি সম্পাদক পদে মোখলেসুর রহমান বি. এল ছিলেন একমাত্র মুসলমান সদস্য।

মোখলেসুর রহমান এম. এ পাশ করার পর কিছুদিন কলকাতা কর্পোরেশনের অধীনে একটি স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৫ সালে বি.এল. ডিগ্রি লাভের পর তিনি প্রথমে আলীপুর ও শিয়ালদহ আদালতে আইন পেশায় যুক্ত হন। কয়েক বছরের মধ্যে আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। বিশেষ করে গরিব ও অসহায় মুসলমানদের মামলা তিনি বিনাফি’তে চালিয়ে যান। আইনজীবী হিসেবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন। কলকাতার সাধারণ মানুষ তাঁকে খুব সম্মান করতো, তাঁর বি বি বাগানের চেম্বার সাধারণ মক্কেলদের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত থাকতো। তাঁর দু’পায়ে সমস্যা ছিল, তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারতেন না। তাঁর জন্য বিশেষ কায়দায় জুতো তৈরি করে নিতেন এবং তা দিয়ে চলাফেরা করতেন। ‘নেংড়া উকিল’ নামে তাঁর খ্যাতি ছিল।

উকিল মোখলেসুর রহমান ১৯৪৬ সালে কলকাতা বার কাউন্সিলের সদস্য হন ও হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে সনদ লাভ করেন। তিনি এ বছরের প্রথমদিকে অ্যাপিলেট ডিভিশনের আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের সহকারী ছিলেন। কলকাতা হাইকোর্টে ১৯৪৬ থেকে ১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৯ বছর মামলা পরিচালনা করেন। কলকাতার পাশাপাশি চট্টগ্রাম জেলা আদালতেও তিনি বেশ ক’টি মামলা পরিচালনার জন্য আসেন। একটি মামলা ছিল আনোয়ারার জমিদার এয়ার আলী খাঁন প্রকাশ পেঁচু মিয়ার, অপরটি বাঁশখালীর জমিদার ও অবিভক্ত ভারতে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরীর। একজন প্রথিতযশা আইনজীবী হিসেবে কলকাতা ও চট্টগ্রামে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এডভোকেট মোখলেসুর রহমান বি বি বাগান রোডের বাড়ি ছিল চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধের সংগঠকদের জন্য আশ্রয়স্থল। আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, আবুল হোসেন (বর্তমানে সিপিডিএলএর চেয়ারম্যান) সারাহ বেগম কবরী (অভিনেত্রী), আবু মুসা চৌধুরী (বর্তমান মহিলা এমপি সাবিহা মুসার স্বামী) এবং নুরুল কবির চৌধুরী (ইপিআরএ কর্মরত ও ভ্রাতুষ্পুত্র) তাঁর দলের সদস্যদের নিয়ে এই বাড়িতে বেশ কিছুদিন অবস্থান করেন।

আক্তারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর অনুরোধে উকিল মোখলেসুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে এককালীন দশ হাজার টাকা অনুদান হিসেবে দেন।

উকিল মোখলেসুর রহমান নিজ গ্রামে জনস্বার্থে বাবার খননকৃত দিঘির পাড়ে বিরাট ঘাট নির্মাণ এবং বখসে আলী ফৌজদার মসজিদের সংস্কার কাজ করেন। মোগল যুগের নিদর্শন এই মসজিদের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এককালীন পঁচিশ হাজার টাকা ইসলামাবাদ টাউন কোঅপারেটিভ ব্যাংকে জমা রাখেন। কর্মসূত্রে কলকাতা থাকলেও প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে গ্রামে চলে আসতেন ও গ্রামবাসীকে মেজবান খাওয়াতেন। ১৯৩২ সালে পিতার মৃত্যুর পরের বছর কার্ড ছাপিয়ে বিতরণ করে বড় আকারে মেজবান (জেয়াফত) দেন। কার্ডে উল্লেখ করা হয় সকাল ৭ টা থেকে শুরু হয়ে সূর্যাস্তের পূর্বে পর্যন্ত মেজবানি খাওয়ানো হবে।

উকিল মোখলেসুর রহমানের পিতামাতার একটি ছবি তাঁর স্বজনদের কাছে রয়েছে। জানা যায় ১৯২৮ সালে কলকাতার শিয়ালদহ সংলগ্ন চৌধুরী স্টুডিও থেকে ফটোগ্রাফার ও ক্যামেরা আনিয়ে তিনি পিতামাতার ছবি তোলেন। এই স্টুডিও’র মালিক ছিলেন সীতাকুন্ডের অধিবাসী।

উকিল মোখলেসুর রহমানের সাংসারিক জীবন সম্পর্কে জানা যায় যে, বিহারের হাজি গোয়ানীর একমাত্র নাতনী সালমা বেগমকে বিবাহ করেন। গোয়ানীর একমাত্র পুত্র অতি অল্প বয়সে মারা যান। হাজি গোয়ানী মৃত্যুর আগে মোখলেসুর রহমানকে সে ওয়াকফ্‌ এস্টেটের মোতওয়াল্লি করেন। এই ওয়াকফ্‌ এস্টেটের সম্পত্তি ছিল ৭/১ বি বি বাগান লেনের বাড়ি, মসজিদ। উকিল এম. রহমান পুরানো বাড়ি ভেঙে নতুন ৩ টি ৩ তলা বাড়ি নির্মাণ করেন ও মসজিদ সংস্কার করেন। একটি বাড়িতে মুসাফিরখানা ও চট্টগ্রামের লোকজন আসলে থাকতেন। থাকা ও খাওয়ার বন্দোবস্থ ছিল। হাজি গোয়ানীর নাতনীর গর্ভে এক পুত্র এক কন্যা জন্ম গ্রহণ করেন। শিলাইপাড়া গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এলে তাঁর নাবালক পুত্রটি মারা যায়। মেয়ে হোসনে আরা বেগমের বিয়ে হয় মোহাম্মদ তৈয়বের সাথে। তিনি ছিলেন কলকাতায় একটি হাই স্কুলের হেডমাস্টার। সম্পর্কে মুহাম্মদ তৈয়ব ছিলেন রাজনীতিবিদ। তাত্ত্বিক আবুল হাশিমের ভ্রাতুষ্পুত্র। ২০০৯ সালে হোসনে আরা কলকাতায় মারা যান, রেখে যান গুলশানারা ও সুলতান আরা নামে দুই কন্যা। ১৯৩৭ সালের নভেম্বরে উকিল এম রহমানের স্ত্রী সালেমা বেগম মারা যান।

১৯৪০ সালের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রাম কলেজের তৎকালীন হিসাবরক্ষক ও চট্টগ্রাম শহরের (তৎকালীন পাঁচলাইশ থানাধীন) বাকলিয়া নিবাসী ছৈয়দ আবু ছাইদ মুহাম্মদ তাহের এর প্রথম কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে দুই মেয়ে ও এক পুত্র। এরা হলেনশাহজাদী আফছার চৌধুরী (মৃত্যু২০১৪) স্বামীনুরুল আবছার চৌধুরী, আনোয়ারা বেগম স্বামীমোহাম্মদ ইসমাইল ইকবাল। একমাত্র পুত্র মাশুকুর রহমান চৌধুরী ১৯৭৩ সালে ২১ বছর বয়সে কলকাতা গোবরা কবরস্থানের পুকুরে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে মারা যান। গোবরা কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। এই পুত্রের কিছুদিনের মধ্যে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়তে যাবার সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। একমাত্র পুত্রের অকাল মৃত্যুতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

উকিল এম. রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর কলকাতায় মৃত্যু হয়। তিনি এরপর মুসলিমা বেগম নামে কলকাতার এক স্থানীয় মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নিঃসন্তান এই স্ত্রী বর্তমানে জীবিত ও বি.বি.বাগান লেনের বাড়িতে বসবাস করছেন।

উকিল এম. রহমান ছিলেন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। কলকাতা ও চট্টগ্রামে বিপুল সম্পত্তির মালিক ছিলেন তিনি। তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সমস্ত সম্পত্তি কন্যা শাহজাদী খানমকে এবং কলকাতার সম্পত্তি (বি বি বাগান, তপসিয়া, বাইপাস ও শরৎ বসু রোডের বাড়ি) দুই মেয়ে ও স্ত্রী মুসলিম বেগমকে অংশ করে ভাগ করে দানপত্র করে যান। কেবল রাইফেল রেঞ্জের বাড়ি (পার্ক সার্কাস) এজমালি রাখেন। বাংলাদেশ থেকে তাঁর মেয়ে কিংবা বংশধরেরা এসে থাকতে পারে সেজন্যে ১২ কাটা জমির উপর বাড়িজায়গা নির্দিষ্ট করে দেন এবং দূরদর্শীতার স্বাক্ষর রাখেন। বৃহত্তর জীবনের টানে তিনি জন্মভূমিকে ছেড়ে গেছেন কিন্তু মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। নিজের নামের শেষে জুড়ে দেন আনোয়ারী। এম. রহমান আনোয়ারী নামে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

উচ্চ শিক্ষার্থে কলকাতায় গিয়ে কর্মজীবন ও বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যান। দ্বিতীয় স্ত্রী চট্টগ্রামের হলেও তাঁকেও নিয়ে যান কলকাতায়। দুই স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেন দুই পুত্র (দুই জনেরই অকাল মৃত্যু ঘটে) ও তিন মেয়ে। তারমধ্যে একমেয়েকে নিজ গ্রামে বিয়ে দেন আপন চাচাতো ভাই ও ভগ্নিপতি অছিউর রহমানের একমাত্র পুত্র নুরুল আবছার চৌধুরীর সাথে। জ্বালিয়ে রাখেন জন্মস্থানে নিজ বংশের আলো। এই কন্যার গর্ভজাত সন্তানরা হলেনপ্রকৌশলী জাহিদ আফছার চৌধুরী, আকবর আবছার চৌধুরী, প্রকৌশলী মঈনুদ্দিন, আবছার চৌধুরী, প্রকৌশলী জাহিদ আবছার চৌধুরী ও প্রকৌশলী জুনাইদ আবছার চৌধুরী এবং কানিজ মোসাব্বের ও নাজমা বেগম। এঁরা সবাই আনোয়ারার শিলাইগড়া গ্রামে বসবাস করছেন। অন্য মেয়ে ও বংশধরেরা কলকাতাতেই স্থায়ী হন।

সংস্কৃতিবানসাহিত্যসেবী ও লব্ধ প্রতিষ্ঠ আইনজীবী মোখলেসুর রহমান ১৯৭৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। গোবরা কবরস্থানে পুত্রের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে একটি গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহের কাজে কলকাতা গেলে গোবরা কবরস্থানে যাবার সুযোগ হয়েছিল। এই কবরস্থানে বাংলার অনেক কৃতী সন্তানের সমাধি রয়েছে। তাঁদের সাথে মরহুম উকিল এম. রহমানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করেছি। পিতাপুত্র পাশাপাশি শুয়ে আছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক।

 

LEAVE A REPLY