হাসান আকবর

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

পর্যটন বান্ধব একটি দেশ মালদ্বীপ। পৃথিবীতে পর্যটনের উপর ভর করে অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে যেসব দেশ তাদের মধ্যে মালদ্বীপের অবস্থান বেশ উপরের দিকে। পর্যটনকে মালদ্বীপে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়। গুরুত্ব দেয়া হয় পর্যটকদের। পর্যটকদের বিনোদনের নানা আয়োজন রয়েছে দেশটিতে। অতি সাধারণ একটি জিনিসকেও অসাধারণ করে তোলা হয়েছে। পর্যটনের এই তীর্থক্ষেত্রে পর্যটকদের পকেট কাটার কত ধরনের আঞ্জাম যে রয়েছে তাও বেশ টের পাচ্ছিলাম। মনে পড়ছিল ইমিগ্রেশন অফিসারের কথা। আমার পাসপোর্টে ভিসার সীল দেয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘মালদ্বীপ খুবই ব্যয়বহুল দেশ।’ এখন ঘাটে ঘাটে ব্যবসার পসরা রেখে মনে হচ্ছে মালদ্বীপ শুধু ব্যয়বহুলই নয়, মহা খচচের একটি দেশ বলে মনে হচ্ছিল। ইমিগ্রেশন অফিসার মনে হয় আমার চেহারা দেখে টের পেয়েছিলেন যে, মালদ্বীপ আমাদের জন্য নয়।

আমার এডিটর স্যার দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক জনপ্রতি প্রায় দুইশ’ ডলার দিয়ে সাবমেরিন ভ্রমণের টিকেট কেটে ফেললেন। যতটুক জানলাম, সাবমেরিন স্টেশনটি ভারত মহাসাগরের গভীরে। রাজধানী মালে দ্বীপের নিকটস্থ সাগরে। মালদ্বীপ এসে রাজধানী মালে না দেখে চলে গেলে একটি অতৃপ্তি থেকে যাবে। স্যারকে কথাটি বলতে তিনি বললেন, আমরা মালেও দেখবো। কিন্তু ট্যুর অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী তরুণী ঠোঁট উল্টে বললেন, ওটির জন্য আলাদা প্যাকেজ। সকালে চলে গেছে। এখনতো আর সম্ভব নয়। তবে আপনারা চাইলে আমি স্পেশ্যাল একটি প্যাকেজের আয়োজন করে দিতে পারি। জনপ্রতি ৯০ ডলার লাগবে। ইউ এস ডলার। জনপ্রতি সাত হাজার তিনশ’ টাকারও বেশি। প্যাকেজে কি কি সুবিধা আছে জানতে চাইলাম। তরুণী মনছোঁয়া হাসিতে বললেন, তেমন কিছু নয়। যাওয়া আর আসা। ওখানে নিজেরা গাড়ি ভাড়া করে ঘুরবেন। আবার ঘাটে আসলে আমাদের ইয়ট আপনাদের তুলে নিয়ে আসবে। মেজাজ খারাপ হওয়ার উপক্রম। আমি বললাম, সাবমেরিন স্টেশনতো মালের কাছেই। সাবমেরিন থেকে ফেরার পথে তুমিতো অনায়াসে আমাদের মালে দেখিয়ে নিয়ে আসতে পারো। তরুণী বললেন, তা হবে না। আমাদের ওই ধরনের একটি প্যাকেজ আছে। ওটি সকালে চলে গেছে। ওই প্যাকেজের রেট তোমরা এখন যেই প্যাকেজ নিয়েছো তার থেকে বেশি। আমার বুঝতে বাকি থাকলো না যে, ঘাটে ঘাটে ডলার কামানোর কল বসিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে যা ইচ্ছে তা করার কোন সুযোগ নেই। বাস না হলে টেম্পো, টেম্পো না হলে টেক্সি বা মোটর রিক্সা নিয়ে চষে বেড়ানোর কোন উপায় নেই। কারো উপর তেজ দেখিয়ে কোথাও হেঁটে চলে যাবেন? নৈব! নৈব! আপনি যা করুন না কেন, স্পিড বোটে চড়তে হবে। বোটের মালিক আর দ্বীপের মালিক একই ব্যক্তি। এখানে দ্বীপের রুম ভাড়া নির্ধারণের এখতিয়ার যেমন তার, একই সাথে বোটের ভাড়া নির্ধারণের সর্বময় ক্ষমতাও তার। আপনি ইচ্ছে হয় চড়ুন, নাহয় দ্বীপে গা এলিয়ে হাওয়া খান। আপনাকে বিমানবন্দর থেকে ইয়টে চড়িয়ে দ্বীপে আনা হয়েছে, আবার বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়া হবে। তা নিয়ে কোন আপত্তি বা বাড়তি কড়ি কেউ দাবি করবে না।

তবে ফেলো কড়ি মাখো তেলের ব্যাপার স্যাপার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মালদ্বীপের হেথায় হোথায়। রাতে পাঁচ সাত লাখ টাকা ভাড়া দিয়ে মালদ্বীপের বিভিন্ন রিসোর্টে যেমন পর্যটক থাকেন, তেমনি এক বেলায় হাজার হাজার টাকা খরচ করে মানুষ খাওয়া দাওয়াও করেন। আবার হাজার হাজার টাকা খরচ করে সাবমেরিনে চড়েন। ইয়টে চড়ে সাগর চষে বেড়ান। একটি দ্বীপের কথা শুনলাম। নাম নাকি রাঙ্গালিয়া। এই দ্বীপে পানির নিচে একটি রেস্টুরেন্ট তৈরি করা হয়েছে। যেখানে এক বেলা লাঞ্চ বা ডিনার সারতে ব্যয় হয় এক হাজার ইউএস ডলার। অথচ রেস্টুরেন্টে নাকি জায়গা পাওয়া যায়না। আমরা যেই দ্বীপে রয়েছি সেটির নাম প্যারাডাইজ। এই ধরনের আরো বহু বহু দ্বীপকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। পর্যটকেরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এসব দ্বীপে। রাত কাটাচ্ছে। দিন কাটাচ্ছে। আনন্দে ভাসছে। মালদ্বীপের অর্থনীতির চাকা কেবলই সামনে ঘুরছে। পর্যটন খাত থেকে আয় রোজগার কেবলই বাড়ছে।

আমরা যেই ডেক্সে বসে সাবমেরিনের টিকেট করছি তার পাশে একটি ঢাউশ সাইজের পোস্টারে মালদ্বীপের বিভিন্ন দ্বীপের কিছু খন্ডচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে উচ্ছ্বল উজ্জ্বল নারী পুরুষের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, জীবনে উপভোগ করার অনেক কিছু রয়েছে। সাবমেরিনের টিকেট কাটার পর রাজধানী মালে দেখার জন্য স্পেশ্যাল এ্যারেজমেন্টের টিকেট কাটবো কি কাটবো না তা নিয়ে চিন্তা করছিলাম আমরা। এই সময় আমার ম্যাডাম মিসেস কামরুন মালেক এডিটর স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললেন, মালে দেখবো। টিকেট কেটে নাও। এডিটর স্যার আর কোন কথা না বলে আবারো আমাদের প্রত্যেকের জন্য মালে ভ্রমণেরও টিকেট কিনে নিলেন। আমি একা যদি মালদ্বীপে বেড়াতে আসতাম তাহলে এত চড়া দামে টিকেট কেটে সাবমেরিন বা মালে দেখার সাহসই করতাম না। এখন ব্যাপারটি হলো, আমরা সাবমেরিন দেখতে যাবো অন্যান্যদের সাথে প্যাকেজে। ওখান থেকে অন্যান্যদের সাথে ফিরে আসবো। এখান থেকে আবারো আমাদেরকে একটি স্পিড বোট মালে নিয়ে যাবে। ওই বোটটি শুধু আমাদের। তরুণী ওয়াকিটকিতে কার কার সাথে কী কী সব আলাপ করলেন। স্পেশ্যাল প্যাকেজের এ্যারেজমেন্ট করে ফেললেন ত্বরিৎকর্মা তরুণী। আমি বুঝলাম যে, এই ধরনের দু’চারজন স্টাফ থাকলে ওই কোম্পানির উন্নতি কেউ ঠেকাতে পারে না।

তরুণী ডেক্স বন্ধ করে আমাদের ঘাটের দিকে যাওয়ার জন্য তাগাদা দিলেন। বোট চলে এসেছে বলেও জানালেন। এডিটর স্যার বললেন, চলো। ম্যাডামও উঠে দাঁড়ালেন। স্যারের শ্যালিকা গুলশান আকতার চৌধুরী রেহেনা, বড় মেয়ে ফাহমিদা মালেক, ছোট মেয়ে দৈনিক আজাদীর নির্বাহী সম্পাদক সানজিদা মালেক, স্যারের জামাতা লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী এবং আমি সাবমেরিনে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। লায়ন নুরুল আবসারও তৈরি হলেন সাবমেরিন ট্রিপে যাওয়ার জন্য। স্ত্রী শামীমা আকতার এবং পুত্র কন্যা মিলে ওনারা চারজন। সবমিলে বিশাল একটি দল হয়ে গেলাম আমরা। কাঠের পাটাতনের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম। সাবমেরিনে যাচ্ছি। অন্যরকমের এক উত্তেজনা আমার ভিতরে বাহিরে চাঞ্চল্য তৈরি করছিল।

ইয়টে চড়ে ছুটলাম আমরা। গন্তব্য সাবমেরিন স্টেশন। ওখান থেকে সাবমেরিনে চড়ে সাগরের তলদেশে যাত্রা। ছুটছিল ইয়ট। একই সাথে ছুটছিল আমার মন। বাংলাদেশের কোন সাবমেরিন নেই। চীন থেকে দুইটি সাবমেরিন কেনা হচ্ছে। (অবশ্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশে দুইটি সাবমেরিন এসে গেছে)। কোনদিন সাবমেরিন দেখিনি। বিদেশী সিনেমাতে তিমি মাছের মতো সাবমেরিনের ভেসে উঠা দেখেছিলাম। আহ, কী যে সুন্দর! কী যে সুন্দর! গভীর নীল সাগরে হঠাৎ ভোঁস করে ভেসে উঠে সাবমেরিন। কিছু বুঝে উঠার আগেই শত্রু ঘায়েল। অবশ্য আমরা এখন কোন শত্রু ঘায়েল করতে যাচ্ছি না। যাচ্ছি সাগরের তলদেশের জীববৈচিত্র দেখতে। সত্যি কথা বলতে কি সাবমেরিন দেখতে।

মালদ্বীপের এই সাবমেরিন কোন সামরিক সাবমেরিন নয়। এটি তাদের প্রতিরক্ষার কাজেও ব্যবহৃত হয়না। এটি একটি পর্যটন কোম্পানি পরিচালনা করে। পুরোপুরি বেসরকারি উদ্যোগ। মালদ্বীপের এই সাবমেরিন ইতোমধ্যে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য মালদ্বীপের মন্ত্রীসভা সাগরের তলদেশে গিয়ে বৈঠক করেছিল। মালদ্বীপ এমনিতেই সাগরে বুকে ক্রমে তলিয়ে যাওয়া একটি দেশ। ভারত মহাসাগরের তলদেশের উচ্চতা এক মিটার বৃদ্ধি পেলে মালদ্বীপের অস্তিত্ব বিলীন হবে। ইতোমধ্যে নাকি অস্ট্রেলিয়া মালদ্বীপকে নিজেদের দেশের একটি অঞ্চল প্রদান করার ব্যাপারে পাকাপোক্ত কথা দিয়েছে। তবে ঠিক কবে নাগাদ মালদ্বীপবাসী অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে বসবাস শুরু করবে তা কেউ জানাতে পারেননি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মালদ্বীপ সফরকালে এই সাবমেরিনে চড়ে সাগরের তলদেশে গিয়েছিলেন। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক করেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেই সাবমেরিনে চড়ে সাগরের তলদেশে গিয়েছেন সেই একই সাবমেরিনে চড়ে আমিও সাগরের তলদেশে যাবো! এতে যদি আমার ব্লাড প্রেসার কিছুটা বেড়ে যায় তাতে কী আমাকে দোষ দেয়া চলে? আধাঘন্টারও বেশি সময় ইয়ট নিয়ে ছোটার পর আমরা সাবমেরিন স্টেশনে পৌঁছলাম। ইয়ট গিয়ে সাবমেরিন স্টেশনের সাথে থামলো। ভারত মহাসাগরের গভীর অঞ্চল। এখানে ঢেউ কিছুটা উচ্ছ্বল। ইয়ট দুলছিল। বেশ জোরে। সাবমেরিন স্টেশনে থাকা এক তরুণ এবং দুই তরুণী আমাদের প্রত্যেককে হাত ধরে ধরে খুব সাবধানতার সাথে নামালো। আমাদের টিকেটও চেক করা হলো। তাদের হাতে থাকা লিস্টে মিলিয়ে নেয়া হলো। ইতোমধ্যে আমাদের সবার নাম সাবমেরিন স্টেশনে পৌঁছে গেছে। ওয়াই ফাই সংযোগ রয়েছে সাবমেরিন স্টেশনে। প্রযুক্তি যে মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! কেন যে আমাদের টিকেট চেক করা হলো বুঝলাম না। এই গভীর সাগরে কারো পক্ষে কী টিকেট ছাড়া বা অনুমোদন ছাড়া আসা সম্ভব? কিছু বললাম না। সাবমেরিন স্টেশনটি রেল স্টেশনের মতো। সাগরের বুকে কিভাবে এমন সুন্দর একটি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে তা বেশ আশ্চর্য লাগছিল। সাগরের গভীর থেকে তোলা খুঁটির উপর লোহার পাটাতন বসিয়ে প্লাটফরম বানানো হয়েছে। সারি সারি চেয়ার পেতে দেয়া হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে চমৎকার বসার জায়গা। উপরে ছাউনিও রয়েছে। যেন চারপাশ খোলা একটি ঘর। বেশ বড় সড়। ঘরের ভিতরে চেয়ারে বসে উত্তাল সাগর দেখাতেও ভিন্ন ধরনের আনন্দ আছে। রয়েছে রোমাঞ্চ। যেন জাহাজের ডেকে বসে আছি! টাকা নিলেও আনন্দের যেন কমতি নেই এখানে ওখানে। চেয়ারে গিয়ে বসলাম। তরুণীদের একজনকে কাছে ডাকলাম। কতক্ষণে সাবমেরিনে চড়ানো হবে জানতে চাইলাম। বললো, একটু পরেই সাবমেরিনে তোলা হবে। আরো একটি ইয়ট আসছে অপর কোন দ্বীপ থেকে। দ্বীপের দেশ মালদ্বীপ। দ্বীপেরও অভাব নেই। রূপেরও অভাব নেই। অভাব নেই পর্যটকের। কোটি কোটি ডলারের ব্যবসাপাতিও বুঝি এভাবে চলছে। কেবলই চলছে। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী

LEAVE A REPLY