সারা দেশে চলমান বন্যায় চার জেলার আউশ ধান ও আমন বীজতলার ব্যাপক ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছেচট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের ৪৭ টি উপজেলার মধ্যে ২৯টির ৬৬ শতাংশ আউশ ও ৫২ শতাংশ আমন বীজতলা বন্যায় ভেসে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় ও আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে এ সব তথ্য। গত বোরো মওসুমে সিলেট বিভাগ ও হাওড় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যায় বোরো ধানের ব্যাপকাক্ষতি হয়। বোরোর পর আউশ নিয়েও একই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, কৃষি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ প্রসঙ্গে পত্রিকাটিকে বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের তালিকাও তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত বীজতলাও তৈরি করা হয়েছে। পানি কমে গেলে নাবি জাতের ধানের আবাদে উপকরণ ও বীজসহায়তা বিনামূল্যে দেওয়া হবে। আউশ ও আমন আবাদে কৃষককে প্রয়োজনীয় বীজ এবং উপকরণ সহায়তা ছাড়াও পদ্ধতিগত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পরিস্থিতির উত্তরণে কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ প্রদানে মাঠ পর্যায়ের সব কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জে আউশের আবাদ হয়েছে ১লাখ ৬১ হাজার ৬৬২ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টরের আউশ ধান বন্যার পানিতে দণ্ডায়মান অথবা পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় আছে। এর মধ্যে পানিতে দণ্ডায়মান আউশ ধানের পরিমাণ ৯৬ হাজার ৮২৪ হেক্টর ও নিমজ্জিত ৯ হাজার ১২১ হেক্টর। অন্যদিকে চার জেলায় মোট ৯ হাজার ৬৩১ হেক্টর জমিতে আমন বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫ হাজার হেক্টর। পানিতে দন্ডায়মান আমন বীজতলা ৪ হাজার ৫৪৬ ও নিমজ্জিত ৪৯৫ হেক্টর। চট্টগ্রাম জেলায় পানিতে দণ্ডায়মান আউশের পরিমাণ ৩২ হাজার ৩০০ ও পানিতে নিমজ্জিত ৩ হাজার ৬৯৫ হেক্টর। এছাড়া পানিতে দণ্ডায়মান আমন বীজতলা ২ হাজার ৩২৬ এবং পানিতে নিমজ্জিত আমন বীজতলা ৪৫০ হেক্টর।

দেশের বিভিন্নস্থানে বন্যার কারণে ফসলহানির খবর এখন প্রায় প্রতিদিনই প্রকাশিত হচ্ছে দৈনিক আজাদীসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে। অনেক বিশেষজ্ঞ অতিবৃষ্টির কারণে আগাম বন্যার কথাও বলছেন। উজানের ঢল ও ভারী বর্ষণে প্রতিদিনই বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। নদনদীতে পানি বাড়ছে। বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে লোকালয়ে। প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন এলাকা, তলিয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়াই খাদ্য, পানি ও জ্বালানি সংকট প্রকট হওয়ার খবরও রয়েছে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, জরুরি ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রমসহ বহুবিধ পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক। বন্যার্ত মানুষ যাতে কোন অবস্থায় দুর্ভোগে না পড়ে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে এবারও বন্যা পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত খারাপ হবে। নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার সতর্কতাও রয়েছে। দুর্গত এলাকায় স্বাভাবিকভাবে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে শত শত একর ফসলি জমি। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় অনেক এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পানি বন্দী হয়ে পড়ায় অনেক এলাকায় শ্রমিকদের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসাবাণিজ্যও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফসল হানির কারণে কৃষকরা দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলায় বন্যা দুর্গতদের সহায়তায় সরকারিবেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। বন্যা আমাদের দেশে নতুন নয়। আঞ্চলিক ও স্থানীয় অতি বৃষ্টি এবং ভৌত অনেক কারণ বাংলাদেশে বন্যা হওয়ার জন্য প্রধানত দায়ী। নদীউপনদী ও খালগুলোর পানি নির্গমন ক্ষমতা বিভিন্ন কারণে হ্রাস পাওয়া, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও নির্বিচারে বন উজাড় হওয়ার কারণেও বন্যা হয়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার একটি বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান। এ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশকে বছরের পর বছর বন্যায় আক্রান্ত হতে হচ্ছে। কখনো কখনো এ বন্যা সহনীয় মাত্রায় থাকছে, আবার অনেক সময় তা ভয়াল আকার ধারণ করছে। পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে বর্ষা মৌসুমের অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না, ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে দেশের অধিকাংশ নদনদী। ফলে ভারি বর্ষণে কিংবা পাহাড়ি ঢলে বন্যা দেখা দেয়। অথচ প্রতি বছর নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার জন্য ড্রেজিং করা হয়। এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয় বিপুল অর্থ। কিন্তু সুফল মেলে না। হাওরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের কারণে এবার তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ফসল। দুদক ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম সাজাতে হবে। দেশের নদনদীগুলোর করুণ অবস্থা না হলে বন্যার হাত থেকে আমরা বাঁচতে পারতাম। নদনদীগুলোর পানি ধরে রাখার সক্ষমতা থাকলে দুই কূলের জনপদ ভেসে যেত না, মানুষকে দুর্ভোগে পড়তে হতো না। প্রতিবছর বন্যায় যে ক্ষতি হয় তা কাটিয়ে ওঠা কঠিন ব্যাপার। ফসলহানি, অবকাঠামোসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, গবাদি পশুর মৃত্যু, রোগব্যাধির বিস্তার ইত্যাদি সমস্যায় পড়তে হয়। অথচ সদিচ্ছা ও দায়িত্বশীলতা থাকলে এসব থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেত। বন্যা মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতিও অনেক প্রাণহানি ও সম্পদ বিনাশ থেকে রক্ষা করতে পারে। বন্যার সময় খাদ্য সংকট দেখা দেয় এজন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ রাখতে হবে। সময়মতো ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সরবরাহ করাও জরুরি। এছাড়া বন্যার পানি সরে যাওয়ার পরও দেখা দেয় ডায়রিয়াসহ নানা রোগ ব্যাধি। এজন্য খাওয়ার স্যালাইনসহ অন্যান্য ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পরিস্থিতি খুব খারাপ হতে থাকলে বন্যার্তদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এ দেশের মানুষ বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছে। চলমান বন্যায় আমরা সতর্ক হতে চাই। বন্যার্তদের কাছে জরুরি ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে যাতে বিলম্ব হতে না পারে সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে বড় ধরনের বন্যা হলে যাতে আমরা সফলভাবে তা মোকাবেলা করতে পারি তার প্রস্তুতিও গ্রহণ করতে হবে।

LEAVE A REPLY