বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

বার্লিনের চিঠি অভিবাসন ও উন্নয়ন সম্মেলন থেকে ফিরে

ইস বিন আইন বের্লিনের’’ (আমি একজন বার্লিনার) ! আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডী আজ থেকে ৫৪ বছর আগে ১৯৬৩ সালের ২৬ জুন পশ্চিম জার্মানীর টাউন হলের সামনে প্রায় সাড়ে চার লক্ষ জনগণের সামনে এই বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থিত পূর্ব জার্মানী ’বার্লিন প্রাচীর’ (বার্লিন ওয়াল) গড়ে তোলার ২২ মাস পর কেনেডী এই স্থানে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, মূলতঃ পশ্চিম জার্মানীর জনগণের প্রতি যুক্তরাষ্টের সমর্থন ব্যক্ত করার জন্যে। কেনেডীর এই আশ্বাসবাণী পশ্চিম বার্লিনবাসীর মনোবল জুগিয়েছিল, কেননা তাদের সার্বক্ষণিক শংকা ছিল কখন না জানি পূর্ব জার্মানী তাদের দখলে নেয়। বার্লিন এলে প্রতিবারই কেনেডীর এই বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে। বার্লিন শহরে পৌঁছে মনের ভেতর যে আর এক মনের অবস্থান, সে আপনাতে বলে উঠে, ‘ইস বিন আইন বের্লিনের’। বিশাল এই ঐতিহাসিক নগরী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক ধকল সয়ে, যুদ্ধ শেষে দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে। জন্ম নেয় পূর্ব ও পশ্চিম বার্লিন। দুবার্লিনের মাঝে উঠে দেয়াল। কত রক্ত ঝরেছে এই দেয়াল পেরোতে, পুব থেকে পশ্চিমে পালিয়ে আসার প্রচেষ্টায়। কেবল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই নগরী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা নয়। ১৬১৮১৬৪৮ সালের বিখ্যাত ৩০ বছরের যুদ্ধে এই নগরীর এক তৃতীয়াংশ ঘরবাড়ী ধ্বংস হয়ে যায়, মারা যায় প্রায় অর্ধেক নগরবাসী। বার্লিনের চেহারা পাল্টাতে থাকে ফ্রেডেরিক উইলিয়ামের ১৬৪০ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর। ক্ষমতা গ্রহণ করে তিনি ’ উদার অভিবাসন ও ধর্মীয় সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেন। ১৭০০ সাল নাগাদ বার্লিনের শতকরা ৩০% ভাগ নাগরিক আসে ফ্রান্স থেকে, পোল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়া থেকেও অনেকেই পাড়ি জমায় বার্লিনে। ফ্রেডেরিক উইলিয়ামের উদারমাইগ্রেশন নীতির ফলেই তা সম্ভব হয়েছিল। প্রায় চার শত বছর পর আজও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইমিগ্রেশন, মাইগ্রেশন, ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়ে চলছে দ্বন্দ্ব, বিদ্বেষ, মারামারি, হত্যাযজ্ঞ। এই অভিবাসন, শরণার্থী ইস্যুকে ঘিরে গত চারদিন (২৮ জুন ১ জুলাই) মিলিত জার্মানীর রাজধানী বার্লিনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ১০ম ’গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন এন্ড ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন সরকারী, সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিরা। ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কী করে দুর্দশাগ্রস্ত শরণার্থী ও অভিবাসীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক অধিকার উন্নয়ন ও রক্ষা করা যায় এই নিয়ে তারা পৃথকভাবে ও একসাথে বসেছেন, কথা বলেছেন, মত বিনিময় করেছেন। ফি বছর এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন চলে এক একটি দেশে। গেল বছর ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়, ২০১৫ সালে তুরস্কের ইস্তানবুল নগরীতে এবং ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আয়োজন হবে মরোক্কোর মারাকেশ নগরীতে।

এবার বার্লিন আসা এই সম্মেলনকে ঘিরে। বার্লিনে এর আগেও আসা হয়েছে বার তিনেক। বেড়াতে নয়, কাজে। তবে রাতে কখনো কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলে বেড়ানোর চেষ্টা করেছি ঐতিহাসিক এই নগরীকে কাছ থেকে দেখার। যেখানে দেয়াল ছিল, যেখানে বাতাসে কান পাতলে এখনো কান্না, গভীর দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, সেখানে গেছি। মনে মনে কল্পনা করে ছবি আঁকার চেষ্টা করেছি পূবের কঠিন শাসন থেকে পালাতে প্রথম দিকে দেয়াল দেয়ার আগে কাঁটাতারের বেড়া ডিঙ্গাতে গিয়ে গুলির আঘাতে ঝরে পড়া নিরীহ প্রাণ। এবার চার দিন ছিলাম বার্লিন। কিন্তু ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ হয়নি। কেবল এক সন্ধ্যেয় বাংলাদেশ দূতাবাসের ইকোনমিক কাউন্সলির, বন্ধুসম ড. সৈয়দ মাসুম আহমদ চৌধুরীর সাথে প্রকৃতির সাথে মিশে থাকা তার সুন্দর গোছানো বাসায় গিয়েছিলাম। জার্মান প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনের কাছাকাছি তার বাসা। যাবার পথে গাড়ী থামিয়ে জার্মান প্রেসিডেন্টের বাসাটি দেখিয়ে বললেন, ‘কী সাদামাটা, কোন বাহ্যবাড়ম্বরতা নেই।’ বাস্তবিক তাই, সাদামাটা দোতলা বাড়ি, গেইটের সামনে ছোট একটি ঘর, তাতে বোধকরি কেবল একজন পাহাড়াদার। বাড়ির বাইরে, রাস্তার পাশে পুলিশের একটি গাড়ি। বোঝার কোন উপায় নেই এটি বিশাল জার্মানীর প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন। আমাদের দেশের প্রেসিডেন্টের কথা বাদই দিলাম, মন্ত্রীদের বাসভবনের কী রাজকীয় হাল। মাসুম সাহেবকে বলি, ’আপনি তো তাহলে জার্মান প্রেসিডেন্টের প্রতিবেশী।’ স্বল্পভাষী মাসুম সাহেব মৃদু হেসে, কিছু না বলে স্ক্যালিটরে চাপ দেন, গাড়ী গতি পায়, এগিয়ে চলে তার বাসার দিকে। ফিরে আসি শুরুতে।

নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট পঁচিশেক পর কে এল এমর উড়োজাহাজ উড়াল দিলে স্বস্তি ফিরে পাই। হল্যান্ড থেকে দেড় ঘন্টারও কম সময়ের এই ফ্লাইট। কিন্তু বিরক্তির ব্যাপার যা তা হলো এই দেড় ঘন্টার আকাশ পথ পাড়ি দিতে বাসা থেকে ট্রেনে বিমানবন্দর, তার উপর ঘন্টা দুয়েক আগে এয়ারপোর্ট আসা সব মিলিয়ে মোট সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়। ট্রেনেও বার্লিন যাওয়া যায়, তবে তাতে কম করে হলেও তিনটা স্টেশনে গাড়ি বদলসেটি আরো বিরক্তিকর। বার্লিনে আছে কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, বন্ধু নমি, পুরো নাম খালেদ নোমান নমি, সেখানে সবার নমিদা। বার্লিনে তার আছে চমৎকার একটি বার। যারা ওই বারে আসে তাদের বেশির ভাগই তার মত রাজনীতি সচেতন, বাম ধাঁচের। নমি কলেজবিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল তুখোড় ছাত্র নেতা, জাসদ ছাত্রলীগের প্রথম সারির যাকে বলে। এক সময় কবিতাটবিতাও লিখতো। এখন ওসবে নেই, তবে ফেইস বুকে বাম রাজনীতি নিয়ে তার বেশ কিছু পোস্ট চোখে পড়ে মাঝে মধ্যে। জার্মান ভাষায় বলে কেবল হেড লাইন পড়ে চেষ্টা করি বুঝতে কী বলছে সে লেখা। একরোখা নমি, সে কলেজ জীবন থেকেই। তাকে নিষেধ করেছিলাম এয়ারপোর্টে না আসতে। কিন্তু ওই যে বললাম ক্ষেপাটে টাইপের, যা বুঝে তাই। আগের রাতে ফোনে বলে, ’আমি তোকে নিতে আসবো।’ মানা করেছিলাম এই কারণে বার্লিন যখন পৌঁছাবো তখন রাত দশটা হয়ে যাবে, অত রাতে বিমানবন্দরে কাউকে নিতে আসার কোন মানে হয় না। বিশেষ করে যখন শহরটিতে আগে কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। প্লেন দেরি ছাড়ার কারণে দেরিতেই বার্লিনের ‘টেগেল’ এয়ারপোর্টে দেরীতে নামা। বার্লিনে আরো একটি এয়ারপোর্ট থাকলেও বেশির ভাগ প্লেন নামে এই এয়ারপোর্টে। আর যে একটি এয়ারপোর্ট আছে তার সম্প্রসারণ কাজ ২০১৩ সালে শেষ হবার কথা থাকলেও এখনও শেষ হয়নি। (কেবল বাংলাদেশেরই সব দোষ, যেন যত দোষ নন্দ ঘোষ)। অবশ্য এ সবই বাসের দিকে হেঁটে যেতে যেতে নমির মুখ থেকে শোনা। তাকে যত বলি ট্যাক্সি নিয়ে নেই, সে কেবলি বলে, সেখানে দীর্ঘ লাইন, আমরা বাসে তার আগেই হোটেল পৌঁছে যাব। দেখলাম তাই, টেক্সির জন্যে ওই রাতেও দীর্ঘ লাইন। আমার জন্যে আগে বাড়িয়ে বাসের টিকেট কেটে রেখেছিল আমার এই ক্ষেপাটে ও অতি আন্তরিক, পরোপকারী বন্ধু। কলেজবিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন থাকতো লালখানবাজার। মাথায় হুলিয়া নিয়ে সত্তর দশকের শেষের দিকে দেশ ছাড়া এবং সেই থেকে এই জার্মানীতে স্থায়ী আবাসগড়া। বছর দুয়েক পর নমির দেখা। দুবন্ধু বাসে চড়ে পুরানো দিনের জাবর কাটতে কাটতে এক সময় নেমে পড়ি হোটেলের কাছাকাছি একটি স্টপেজে। নেমে মনে হলো ’নাইট ইজ স্টিল ইয়ং’। এদিকওদিক পথচারীর ছুটে চলা। কেউ কারো দিকে তাকানোর ফুসরত নেই যেন, সবাই যেন আপনারে লয়ে ব্যস্ত। একটু এগোতেই নমি হাত দেখিয়ে বলে, ’ওই তোর হোটেল’, বুদাপেস্টের স্ট্রিটে। পাঁচ তারকা ‘হোটেল প্যালেসে’। সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে জি এফ এম ডির সিভিল সোসাইটি সম্মেলন, সেখানেই আমাদের থাকার ব্যবস্থা। চেক ইন করে লিফটের দিকে এগিয়ে যাই। যে কেউ চাইলেই লিফট ব্যবহার করতে পারবে না। লিফটে উঠে রুমে ঢোকার যে কার্ড সেটি স্ক্যান করলেই কেবল লিফট কাজ করবে। নিরাপত্তার কারণে যে এই ব্যবস্থা তা বলা বাহুল্য। বিশাল কামরা। ডাবল বেড, তাতে চারজন শোয়া যাবে। একদিকে সোফা, আলাদা চেয়ার টেবিল, টেবিলের একটু উপরে দেয়ালে মাঝারি সাইজের টিভি স্ক্রীন, টেবিলের উপর টেলিফোন, বেডের দুপাশে আরো দুটি এবং ওয়াশ রুমে আর একটি, একজনের আরাম আয়েশের জন্যে চারটা টেলিফোনের কী যৌক্তিকতা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না। দিনে দুবার রুম গোছগাছ করতে আসা, আপনি যদি তা না চান তাহলে দরোজায় টাঙানোর জন্য নির্দিষ্ট বোর্ড আছে তা ঝুলিয়ে দেবেন। তাহলে দ্বিতীয়বার আর গোছগাছ করতে আসবে না। আলমারী থেকে শুরু করে, দুজোড়া স্যান্ডেল, এমন কী কয়েকটি বোতাম সহ সুইসুতা, সুসাইনার, মিনি বারহেন জিনিষ নেই যা একজনের প্রয়োজন হতে পারে। বাথটাব, কাঁচের ঘেরা শাওয়ারসবই আছে এই রুমে। ভালো লাগে, কষ্টও লাগে, মনে হয় অপচয়, হোক না আমার অর্থে না, তবুও তো অপচয়। এগিয়ে যাই জানালার দিকে। বাইরে যখনই যাই, হোটেল রুমে ঢুকে প্রথমে যে কাজটা আপনাতেই করি, তা হলো জানালার দিকে গিয়ে দাঁড়ানো। বিশাল কাঁচের দেয়াল, জানালা। পর্দা সরিয়ে বাইরে দৃষ্টি মেলে ধরি। রাতের আলোকোজ্জ্বল বার্লিনকে মোহনীয় মনে হয়, ভালো লাগে। (চলবে) – ২০১৭

LEAVE A REPLY