আমাদের বব ডিলান

0
76
Bobdelan

সঙ্গীত জগতে কাব্যিক উন্মাদনা সৃষ্টিকারী বব ডিলান। অস্কারজয়ী সঙ্গীত পরিচালক এ আর রেহমান বলেছেনগানের মাধ্যমে ডিলান তিন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করে চলেছেন। তিনি মানুষকে নিজের গান দিয়ে ভিন্ন এক জগতে নিয়ে গেছেন। ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের মতে, তিনি (ডিলান) মানুষকে অনেক প্রশান্তি দিয়েছেন,দারুণ গানও উপহার দিয়েছেন। প্রত্যেক দেশের গায়ক একে অন্যের সাথে যুক্ত,কারণ আমরা একই কাজ করি, এটাই সঙ্গীতের সৌন্দর্য। গীতিকার জাভেদ আখতারের বন্তব্য এই রকমব্যাপারটা দারুণ এই কারণে যেমানুষ এখন নির্দিষ্ট একটা ঘরানাকে বেছে নিচ্ছে না। আমরা গানকে সাহিত্য হিসেবে মানতে নারাজ। গজল এবং নাসাম কিন্তু এক ধরনের সাহিত্যই। বব দারুণ একজন মানুষ, যিনি ইতিহাস তৈরি করেছেন।

২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল জিতেছেন গায়ক, গীতিকার, সুরকার, ডিস্ক জকি বব ডিলান। যিনি একজন কবি, লেখক ও চিত্রকর। ১৯৬০ এর দশক থেকে পাঁচ দশকেরও অধিক সময় ধরে জনপ্রিয় ধারার মার্কিন সঙ্গীতের প্রাণ পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ডিলানের শ্রেষ্ঠ কাজের মধ্যে অনেকগুলো ১৯৬০ দশকে রচিত হয়েছে। এসময় তিনি আমেরিকান অস্থিরতার প্রতীক বিবেচিত হতেন। তাঁর কিছু গান, যেমনব্লোইন ইন দ্য উইন্ড, দ্য টাইমস অ্যা আর দ্যা চ্যাঞ্জিং, যুদ্ধবিরোধী জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ১৯৫৫১৯৬৮ সালের আমেরিকান নাগরিক অধিকার আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তাঁর সর্বশেষ অ্যালবাম ক্রিস্টমাস ইন দ্যা হার্ট (২০০৯) কে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিন পরবর্তীকালে বর্ষসেরা অ্যালবাম হিসেবে সম্মানিত করেছে। তিনি খুব সম্ভব প্রথম গীতিকার যিনি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন।

ডিলানের প্রথম দিককার গানের কথা ছিল মূলত রাজনীতি, সমাজ, দর্শন ও সাহিত্যিক প্রভাব সম্বলিত। এগুলো তখনকার জনপ্রিয় ধারার কথিত নিয়ম বহির্ভূত ছিল এবং এই ধারার বিপরীত হিসেবে ধরা হতো। নিজস্ব সঙ্গীত ধারা প্রসারের পাশাপাশি তিনি আমেরিকার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেছেন। তিনি লোকগীতি ও কান্ট্রি/ ব্লুজ থেকে রক অ্যান্ড রোল, ইংরেজ, স্কটিশ,আইরিশ, লোকগীতি, এমনকি জ্যাজ সঙ্গীত, সুইং, ব্রডওয়ে, হাউরক এবং গমবোলও গেয়েছেন। ডিলান সাধারণ গিটার, কিবোর্ড এবং হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করেন। ১৯৮০ দশক থেকে কিছু সঙ্গীতজ্ঞকে সাথে নিয়ে তিনি নিয়মিত বিভিন্ন সঙ্গীত ভ্রমণ করে থাকেন, যা তাঁর ভাষায় নেভার এন্ডিং ট্যুর। তিনি অনেক শিল্পীর সাথে কাজ করেছেন। যেমন দ্য ব্যান্ড , টম পেটি, জোয়ান বায়েজ, জর্জ হ্যারিসন, দ্য গ্রেটফুল ডেড, উইলি নেলসন, পল সিমন, এরিক ক্ল্যাপটন, প্যাটি স্মিথ, ইউ ২, দ্য রোলিং স্টোনস, জনি সিচেল, জ্যাক হোয়াইট, মার্লে হ্যাগার্ড, নেইল ইয়ং, ভ্যান মরিসন,রিঙ্কো স্টার এবং স্টিভি নিকস। যদিও তাঁর ক্যারিয়ারের গায়ক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত এবং সফল হয়েছেন, তবে গীতিকার হিসেবেই তাঁর অবদানকে বেশি মূল্য দেয়া হয়।

বব ডিলানের সাথে বাংলাদেশের রয়েছে আত্মার সম্পর্ক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন তিনি। ম্যাডিসন স্কয়ারে ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। জর্জ হ্যারিসন গেয়েছিলেন আটটি গান, আর ডিলান পাঁচটি, . আ হার্ড রেইনস গনা ফল, . ইট টেকস আ লট টু নাফ/ হট টেকস আ ট্রেন টু ক্রাই ৩. ব্লোইন ইন দ্যা উইণ্ড ৪. মি টাঙ্কুরিন ম্যান এবং ৫. হাস্ট লাইফ আ ওম্যান। তাঁর ব্লোইন ইন দ্য উইন্ড অবলম্বনে কবীর সুমনের লেখা গান হচ্ছেকতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়?/ কতটা পথ পেরোলে পাখি জিরোবে তার ডানায়?/ কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়?/প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা/ কত বছর পাহাড় বাঁচে ভেঙে যাবার আগে?/কত বছর মানুষ বাঁচে পায়ে শেকল পরে/ কবার তুমি অন্ধ সেজে থাকার অনুরাগে?/বলবে তুমি দেখেছিলে না তেমন ভালো করে/ কত হাজার যারের পর আকাশ দেখা যাবে?/ কতটা কান পাতলে কান্না শোনা যাবে?/ কত হাজার মরলে তবে মানবে তুমি শেষে?/ বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের জলে ভেসে। এদেশের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশের জন্য, যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের জন্য।

রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান অর্থাৎ যিনি আজকের বব ডিলান ১৯৪১ সালের ২৪ মে সিনেসোটার ডুলুথে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বেড়ে উঠেন ডুলুথ এবং হিবিং এলাকায়। ১৯০৫ সালের দিকে তাঁর দাদাদাদী আমেরিকায় বসতি স্থাপন করেন। কনসার্ট ফর বাংলাদেশের অন্যতম উদ্যোক্তা পণ্ডিত রবিশঙ্কর পড়ে এবং অভাবনীয় সাফল্য সম্পর্কে বলেছিলেনএকদিনের মধ্যেই গোটা বিশ্ব বাংলাদেশের নাম জেনেছিল। এটা ছিল এক অসাধারণ আয়োজন। যার ফলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে আরো গতি পায়। ডিলান মিশে আছেন বাংলার হৃদয়ে।

LEAVE A REPLY