আজাদী প্রতিবেদন

দীর্ঘ এক যুগ পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি পেতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি। ২৭৫ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির চূড়ান্ত তালিকা গত রাত ১২ টায় দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছেন ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাজাহান। দাপ্তরিক নিয়ম মেনে যে কোন মুহূর্তে তিনি কমিটির অনুমোদন দিতে পারেন। চুড়ান্ত অনুমোদন পেলে এক যুগ পর নগর বিএনপিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে। এর আগে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’তে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। সেই কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল ২০০৫ সালে। এদিকে গতরাতে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে হস্তান্তরকৃত ২৭৫ সদস্য বিশিষ্ট নগর বিএনপি’র পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ৩১ জন সহ সভাপতি, ১১ জন যুগ্ম সম্পাদক, ১০ জন সহসম্পাদক, ৩ জনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে।

গতরাতে কমিটি হস্তান্তরের সময় সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবুর রহমান শামীম, নগর বিএনপি’র সভাপতি ডা. শাহাদত হোসেন, সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান, সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর উপস্থিত ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনকে কমিটি হস্তান্তরের বিষয়টি দৈনিক আজাদীকে নিশ্চিত করে কেন্দ্রীয় বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম গত রাত সোয়া ১২ টায় বলেন, ‘একটু আগে ২৭৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে।’

কমিটি গঠনের উদ্যোগ যেভাবে : সর্বশেষ গতকাল বিকেল সাড়ে চারটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাজাহানের বাসায় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে বৈঠক হয়। সেখানে কমিটি চূড়ান্ত করা হয়। মো. শাজাহানের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে মো. শাজাহজান ছাড়াও নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, সহসভাপতি আবু সুফিয়ান এবং চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে গত ১৮ এপ্রিল রাজধানীর গুলশান কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন থানার ১৪ জন নেতা দেখা করেন। সেখানে নগর বিএনপি’র কমিটি পূর্ণাঙ্গ না করায় সভাপতি ডা. শাহাদাত ও সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন চট্টগ্রামের নেতারা। পরবর্তীতে গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামে সাংগঠনিক সফরে আসেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশররফ হোসেন। তিনিও ঢাকায় গিয়ে নগর বিএনপি’র কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশার বিষয়টি কেন্দ্রকে অবহিত করেন। সর্বশেষ বিএনপি’র ভাইসচেয়ারম্যান মো. শাজাহানকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার জন্য দায়িত্ব দেন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এর প্রে িতে তিনি বিভিন্ন সময়ে নগর বিএনপি’র সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে বৈঠক করেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর মো. শাজাহান গত ৬ জুলাই রাজধানীতে চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন থানা বিএনপির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কদের সমন্বয়ে গঠিত ১৭ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন।

পরবর্তীতে ৭ জুলাই মো. শাজাহান নগর বিএনপি’র সভাপতিসাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদককে সাথে নিয়ে নিজ বাসায় পূর্ণাঙ্গ কমিটির একটি তালিকা করেন। পরে এই তালিকা সংযোজনবিয়োজনের পর ৮ জুলাই দিনভর আবারো বৈঠকে বসেন মাহবুবুর রহমান শামীম, ডা. শাহাদাত হোসেন ও আবুল হাশেম বক্কর। পরে ওইদিন রাত ১১ টার দিকে ২৫১ সদস্য বিশিষ্ট সেই তালিকা চট্টগ্রামের এই তিন নেতা হস্তান্তর করেন মো. শাজাহানকে।

পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় বিএনপিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন চট্টগ্রামের এমন কয়েকজন নেতা হগস্তান্তরকৃত তালিকা আবারো সংযোজনবিয়োজনের পরামর্শ দেন। এরপ্রেক্ষিতে গতকাল আবারো সংযোজনবিয়োজন শেষে তালিকাটি ২৭৫ সদস্যে উন্নীত করা হয়।

বিএনপি নেতারা যা বললেন :

এর আগে নগর বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর গত রাত পৌনে আটটায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আশা করছি কালপরশুর মধ্যে কমিটি ঘোষণা করা হবে। ‘কত সদস্যের কমিটি চূড়ান্ত করা হয়েছে’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘২৫১ সদস্যের কমিটি চূড়ান্ত করেছি’।

দায়িত্ব নেয়ার ১১ মাসেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না করার কারণ জানতে চাইলে আবুল হাশেম বক্কর বলেন, আসলে আমরা প্রথমে ওয়ার্ড কমিটি গঠন করতে চেয়েছিলাম। এগুলো সেরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের দিকে মনোযোগ দিতাম। মাঝখানে রমজান চলে এল। সবমিলিয়ে হয়ে উঠেনি। ‘কিন্তু সবগুলো ওয়ার্ড কমিটিও তো এখনো গঠন করতে পারেন নি?’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ওয়ার্ড কমিটির কাঠামো মোটামুটি গঠন করা আছে।’

গত রাত সোয়া আটটায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘কমিটি চূড়ান্ত। একটু পর তা চেয়ারপার্সনকে জমা দিব।’ কমিটির আকার জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘২৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি।’ বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানের তত্ত্বাবধানে নগর কমিটির সভাপতিসাধারণ সম্পাদক ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বসে কমিটি চূড়ান্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

কমিটিতে কাদের রাখা হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যারা আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন তাদের রাখা হয়েছে। ত্যাগী নেতার পাশাপাশি সব ধর্মের এবং বিভিন্ন পেশাজীবীকে এ কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এবারের কমিটিকে ‘রেইনবো কমিটি’ বা রংধনুর মত বলতে পারবেন। কারণ এখানে সবার অন্তর্ভুক্তি আছে। ‘এক নেতার এক পদ’ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে থানা এবং ওয়ার্ড কমিটিতে যারা আছেন তাদেরকে মহানগর কমিটিতে রাখা হয় নি বলেও জানান তিনি। ডা. শাহাদাত বলেন, ‘চেয়ারপার্সনের নির্দেশনা অনুযায়ী খসরু ভাই, নোমান ভাই, মোর্শেদ খানসহ সবার সঙ্গে আলোচনা করেই এবং সবার মতামতের ভিত্তিতেই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

দায়িত্ব নেয়ার ১১ মাসেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না করার কারণ জানতে চাইলে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমাদের কর্মকাণ্ড কিন্তু থেমে থাকেনি। দায়িত্ব নেয়ার পর আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে ওয়ার্ড কমিটি ভেঙ্গে নতুন করে কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সাতআটটি ওয়ার্ড কমিটি গঠনও করেছি। সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ২০ হাজার সদস্যও সংগ্রহ করেছি। কেন্দ্রীয়ভাবে গত ১ জুলাই থেকে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেটা শেষ হলেই বাকি ওয়ার্ড কমিটিগুলো গঠন করা হবে।’

তিন সদস্যের কমিটির ১১ মাসের কর্মকাণ্ড : ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট গঠন করা হয়েছিল তিন সদস্য বিশিষ্ট নগর বিএনপি’র কমিটি। এতে তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ডা. শাহাদাতকে সভাপতি, সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করকে সাধারণ সম্পাদক এবং আবু সুফিয়ানকে সিনিয়র সহসভাপতি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর নগরীর একটি রেস্তোরায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নগরীর ৪১ ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৯টি ওয়ার্ড শাখার মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন নগর বিএনপি’র সভাপতিসাধারণ সম্পাদক। একইদিন ৩১টি ওয়ার্ডে নতুন করে আহ্বায়কের নাম ঘোষণা করা হয়। সর্বশেষ গত ১৪ জানুয়ারি চকবাজার ওয়ার্ডে সম্মেলনের মাধ্যমে ওর্য়াড পর্যায়ে কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

১২ বছর পর নগরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি : চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’তে সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। সেই কমিটি ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল ২০০৫ সালে। মাঝখানে আরো দুটি আহবায়ক কমিটি (বর্তমান কমিটি ছাড়া) গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু কোন আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদকালেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয় নি। অর্থাৎ ২০০৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১২ বছর বা এক যুগ নগর বিএনপিতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ছিল না।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে গঠিত নগর বিএনপি’র কমিটিতে সভাপতি ছিলেন মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দস্তগীর চৌধুরী। বর্তমান কমিটির আগে ২০১০ সালের জানুারিতে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট নগর কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় বিএনপি। এতে সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সভাপতি এবং ডা. শাহাদাত হেসেনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এ ছাড়া শামসুল আলম, দস্তগীর চৌধুরী এবং আবু সুফিয়ানকে ওই কমিটিতে সহসভাপতি করা হয়েছিল। এর মধ্যে দস্তগীর চৌধুরী মারা গেলে চার সদস্য দিয়েই চলে নগর বিএনপি’র কার্যক্রম।

২০১৫ সালের ৯ আগস্ট নগর বিএনপির কমিটি পুর্নগঠনের জন্য তৎকালীন সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক ডা. শাহাদাত হোসেনের কাছে কেন্দ্রীয় বিএনপি একটি দাপ্তরিক চিঠি পাঠায়। ওই চিঠিতে একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে থানা, ওয়ার্ড ও নগর পর্যায়ে কাউন্সিল করতে বলা হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন কেন্দ্রীয় বিএনপি’র তৎকালীন যুগ্মমহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান।

এর আগে ২০০৫ সালে সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমকে আহবায়ক এবং এম. মোরশেদ খান, আবদুলহ্মাহ আল নোমান ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে সদস্য করে চার সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর আবদুল্লাহ আল নোমানকে আহবায়ক করে আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ১৯৯৩ সালের শেষদিকে গঠিত আহবায়ক কমিটিতে আহবায়ক ছিলেন মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। ১৯৮৮ সালে সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত কমিটিতে সভাপতি ছিলেন আবদুলহ্মাহ আল নোমান। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি’র প্রথম আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। তিন সদস্যের ওই আহবায়ক কমিটিতে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আরিফ মঈনুদ্দীন আহবায়ক এবং এম. সলিমুল্লাহ ও জাহাঙ্গীর আলমকে যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন। ১৯৮৬ সালে গঠিত নগর বিএনপি’র দ্বিতীয় আহবায়ক কমিটিতেও আহবায়ক ছিলেন আরিফ মঈনুদ্দীন।

LEAVE A REPLY