আজাদী প্রতিবেদন

সাত মাস পর চট্টগ্রামে এসে স্ত্রী হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক এসপি বাবুল আক্তার। মাহমুদা খানম মিতুর পিতা মোশাররফ হোসেনের মতো বাবুল আক্তারও হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট সকল ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার বেলা পৌনে ৪টার দিকে তিনি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (উত্তর) মো. কামরুজ্জামানের কক্ষে প্রবেশ করেন তিনি। বের হন রাত সোয়া আটটায়। বের হয়ে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। ইতোপূর্বে মিতুর পিতা মোশাররফ হোসেন মেয়ের জামাই বাবুল আক্তারকে দোষারোপ করে তাকে গ্রেফতার করার দাবি জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ড সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি দাবি করেছিলেন।

তদন্ত কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করতে দ্বিতীয়বারের মতো গতকাল চট্টগ্রাম আসেন বাবুল আক্তার । কালো রংয়ের একটি গাড়ি নিয়ে নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে আসেন তিনি বিকেল পৌনে চারটায়। ইতোপূর্বে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর স্ত্রী হত্যার মামলার বিষয়ে কথা বলতে সিএমপিতে এসেছিলেন বাবুল আক্তার। ঐদিন প্রায় আড়াই ঘণ্টা তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন তিনি। গতকাল গাড়ি থেকে নেমে সাংবাদিকদের সঙ্গে হাত মেলালেও কোনো ধরনের কথা বলেননি তিনি। মিতু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (উত্তর) মো. কামরুজ্জামান আজাদীকে জানান, মামলার বাদি হিসেবে কিছু তথ্য জানতে চাওয়ার জন্য উনাকে (বাবুল আক্তার) আমার কার্যালয়ে আসতে বলেছিলাম। তদন্তে সহযোগিতা করতে তিনি এসেছেন। তিনি বলেন, টোটাল ইনভেস্টিগেশনের প্রয়োজনে তার সাথে কথা বলাটা জরুরি ছিল। কী কী প্রসঙ্গে তিনি আলোকপাত করেছেন জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সামগ্রিক বিষয়ে কথা হয়েছে। নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। মামলার অভিযোগপত্র দেয়ার বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যথা শীঘ্রই সম্ভব তা দেয়া হবে।

তদন্ত কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে বের হয়ে বাবুল আক্তার সাংবাদিকদের জানান, মামলার তদন্তের বিষয়ে তিনি তদন্ত কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছেন। ‘মামলার কতটুকু কি অগ্রগতি হয়েছে এবং আমার কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে যা জানতে চেয়েছে সেগুলো সম্পর্কে আমি বলেছি। আমার বিভিন্ন বিষয়ে ‘ক্লারিফিকেশনের’ জন্য আমিও কথা বলেছি।

মিতু হত্যার সাথে স্বামী বাবুল আক্তার জড়িত বলে তার শ্বশুর মোশারফ হোসেনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বাবুল আক্তার বলেন, অভিযোগ যে কেউ যে কারো বিরুদ্ধে করতে পারে। আইনেই এটা করার অধিকার আছে। তদন্ত সাপেক্ষে, সাক্ষ্য প্রমাণে সেটা যদি প্রমাণিত হয় তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। অভিযোগের বিষয়ে নিজেকে ‘নির্দোষ’ মনে করেন কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ‘অবশ্যই’ বলে মন্তব্য করে গাড়িতে উঠে যান। পরে টেলিফোনে তদন্ত কর্মকর্তার সাথে কী কথা হলো জানতে চাইলে বাবুল আক্তার আজাদীকে বলেন, মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা হয়েছে। এক সময় যেহেতু পুলিশ কর্মকর্তা ছিলাম, তাই মামলা ও আসামিদের সম্পর্কে নিজস্ব কিছু পয়েন্ট শেয়ার করেছি তদন্ত কর্মকর্তার সাথে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে বাবুল আক্তার বলেন, সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট কোন ধরনের মন্তব্য করছি না। তদন্তাধীন একটি বিষয় নিয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না বলেও জানান তিনি। গতকাল সকালে তদন্ত কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাত করতে বিমানযোগে তিনি এসেছিলেন। রাতেই আবার বিমানযোগে ঢাকায় ফিরে যান।

গত বছর ৫ জুন ভোরে বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু সন্তানকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে ঘাতকচক্র। ঘটনার সময় ঘাতকদের একজন সন্তান মাহিরকে সরিয়ে ফুটপাতে তুলে দেয়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের তবি ক্ষত হওয়া প্রত্যক্ষ করতে হয় ছোট্ট শিশুটিকে। সে সময় পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে সদর দপ্তরে যোগ দিয়ে ঢাকায় থাকা বাবুল চট্টগ্রামে ফিরে হত্যাকান্ডের পরদিন নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এর বাইরে পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করে। অস্ত্র আইনের মামলাটি আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে থাকলেও কয়েকজন গ্রেপ্তার হওয়া ছাড়া হত্যা মামলায় তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি নেই। প্রথম থেকে মামলার নেপথ্যে একেক সময় একেকটি কারণ উঠে এসেছে। কখনো জঙ্গি, কখনো শিবির, কখনো চোরাচালান, মাদক ব্যবসা, আবার কখনো পরকীয়ার মুখরোচক কাহিনী আলোচনাসমালোচনার ঝড় তুলেছে। সাথে পুলিশের ঢাক ঢাক গুড় গুড় নীতি অবলম্বন তো ছিলই। মিতুর পিতা সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন সর্বশেষ গত ৩ জুন জানান, তিনি নিশ্চিত হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মিতুর স্বামী বাবুল আক্তারই। তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে বাবুল আক্তার যখন আমার বাড়িতে ছিল, আমরাও বুঝতে পারি নাই বা সেও বোঝার সুযোগ দেয় নাই। সে আমাদের ‘ম্যানেজ’ করার জন্য জঙ্গি তৎপরতা, জঙ্গিরা মারছে এসব বলছে।’ অন্যদিকে বাবুল আক্তার গত ৪ জুন শ্বশুরের অভিযোগ প্রসঙ্গে আজাদীকে বলেছিলেন শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তিনি তো ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করছেন, বক্তব্য দিচ্ছেন। শুরুতে ছিলেন এক অবস্থানে। বললেন আমার আর মিতুর ১২ বছরের সাংসারিক জীবন সুখের ছিল, শান্তির ছিল। এরপর তার বাসা থেকে চলে আসার পর থেকে একের পর এক নানা অভিযোগ তুলছেন।

LEAVE A REPLY