মো. আবুল হাসান ও খন রঞ্জন রায়

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ধসের বীভৎস চেহারা স্পষ্ট হচ্ছে। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারের পাহাড়েপাহাড়ে ছড়িয়ে আছে বিপর্যয়ের ক্ষতচিহ্ন। এবার একদিনেই পাহাড়ধসে নিহতের সংখ্যা ১৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। রাঙামাটিতে চার সেনা সদস্যসহ ১০৬ জন, চট্টগ্রামে ৩৫ জন ও বান্দরবানে ছয়জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রামে নিহতদের মধ্যে রাঙ্গুনিয়ায় ২৬জন, চন্দনাইশে ৪ জন, রাউজানে ২ জন, বাঁশখালীতে ১ জন ও চট্টগ্রাম নগরে ২ জন রয়েছে। পাহাড়ধসের পাশাপাশি গাছচাপা, দেয়ালচাপা ও পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে তাদের। পাহাড়ের জনজীবন, বসতি, জীববৈচিত্র্য ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পরিবেশবান্ধব ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি বলেই এই ঘটনা। এটা লক্ষ্যণীয় যে মৃত্যুর মিছিলে এবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাহাড়িও রয়েছেন।

কেউ হারিয়েছেন স্ত্রীসন্তান, কেউ হারিয়েছেন মা ও ভাইবোন। আবার কয়েকটি পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। স্বজনের কান্না আর অবিরাম বারিধারা যেন মিলেমিশে একাকার। স্বজন হারানো মানুষের আহাজারিতে পাহাড়ের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কোনো পরিবারের একজন, কোনো পরিবারে দুজন বেঁচে আছে। আবার কোনো পরিবারে কেউ বেঁচে নেই। সবাই পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে। তাদের গলিত, বিকৃত লাশ তোলা হয়েছে মাটির নিচ থেকে। পাহাড়ে ভূমিধসের ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০০৭ সালে কেবল চট্টগ্রামেই পাহাড়ধসে ১২৭ জন মারা গিয়েছিল। এরপর ২০১৬ ছাড়া প্রতিবছরই কমবেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। এর বাইরে কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে। যখনই বিপর্যয় ঘটে, রাজনৈতিক মানুষ মারা যায়, নেতানেত্রীরা গরম বক্তৃতা দেন। একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনেন।

২০০৭ সালে সরকার পাহাড়ধসের কারণ নির্ণয় ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ তৈরির জন্য একটি আন্তসংস্থা কমিটি গঠন করেছিল। বিস্তারিত কাজ করার পর ওই কমিটি পাহাড়ধস প্রতিরোধে করণীয় হিসেবে ৩৬টি সুপারিশ করেছিল। এর প্রথম সুপারিশটিই ছিলভূতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে পাহাড়ের মাটির ধারণক্ষমতা এবং পাহাড়ের ঢালের কোণ ও শক্তি নির্ণয় করে তার ভিত্তিতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা করা।

পাহাড়ধসের মতো বিয়োগান্ত ঘটনা রোধে একটি সমন্বিত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। এটা দুঃখজনক যে বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের পাহাড়ে বসতি স্থাপনের জন্য সরকারিভাবে নেওয়া হলেও তাদের কখনোই পাবর্ত্যবান্ধব উপায়ে বসতি স্থাপন ও চাষাবাদের মতো কলাকৌশল শেখানো হয়নি। জুমচাষ প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না, তাও খতিয়ে দেখা জরুরি। তেমন কিছু হলে বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনজীবিকার কী হবে, তার ব্যবস্থা করার দায়িত্ব সরকারের। আরও বিপর্যয় এড়াতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক শৃঙ্খলার পুনরুজ্জীবন বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে আজই শুরু করতে হবে।

তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসের সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার কোনো তালিকা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। শুধু বর্ষা মৌসুমের আগে আগে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। তবে কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তালিকা করা হয় না। ভূতত্ত্ববিদ এবং স্থপতিদের পরামর্শে ভৌগোলিক দিক থেকে বিশেষ এই অঞ্চলে বসতি স্থাপনের জায়গা নির্বাচন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যত্রতত্র বসতবাড়ি করা হলে তা বিপর্যয়ের কারণ হতে বাধ্য। প্রতিটি গ্রামের সমতল ভূমিতে ১০ তালা বিশিষ্ট ৪ ইউনিটে ১০ টি বিল্ডিং নির্মাণ করে উত্তর দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিমে ৪টি সেন্টাল সেফটি ট্যাঙ্ক নির্মাণ করতে হবে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জৈব সার উৎপাদনে ব্যবস্থা করলে একদিকে মূল্যবান ভূমি উদ্ধার হবে অন্যদিকে পাহাড়ি জনপদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মৃত্যু হার শূন্য কোটায় নেমে আসবে।

পাহাড় ও বনভূমি সব শ্রেণির মানুষের কাছে নিরাপদ নয়। পাহাড়বনভূমি রক্ষা করতে পারে তারাই, যারা পাহাড় ও বনভূমির মর্ম বোঝে তারাই বোঝে, হাজার বছর ধরে যাদের জীবন পাহাড়ের প্রাকৃতিক জীবনধারার সঙ্গে যুক্ত। যারা পাহাড় চেনে, পাহাড় তাদের চেনে। পাহাড়ী তরুণদের বন ও ভূতত্ত্ব বিদ্যায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধু সরকারি নীতি নৈতিকতা আর সহায়তার দিকে তাকালে হবে না। দেশের ধনবানরা পাহাড়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণ এগিয়ে আসলে পাহাড়ের ক্ষত নিরাময়ে ভূমিকা রাখবে।

পাহাড়ের মানুষ প্রতিদিনই ম্যালেরিয়ার সাথে যুদ্ধ করে জীবন ধারণ করতে হয়। পাহাড়ের লোকদের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা তাবিজ, ঝাড়, ফুকুর। পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় চিকিৎসা সেবা পৌঁছাতে হলে পার্বত্য তিন জেলায় একাধিক, মেডিক্যাল স্কুল, নার্সিং ইনস্টিটিউট, মিডওয়াইফ ইনস্টিটিউট, হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তারা যে কোন দুর্যোগে এলাকাভিত্তিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের সহায়ক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হবে।

পাহাড়ি এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নে পরিকল্পনাবিদদের যে দূরদর্শিতা থাকা দরকার, তা লক্ষ্য করা যায়নি গত চার দশকে। আশির দশক থেকে পাহাড়ি এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মাণে ভূপ্রাকৃতির বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করা হয়নি। রাস্তাঘাট বানাতে গিয়ে পাহাড়ের কার্নিশ কাটা হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিনন্দন, নিশ্চয়ই পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের জেলাগুলো। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি আর একটু দূরে কক্সবাজার ও বঙ্গোপসাগরের সেন্টমার্টিন দ্বীপ। অপূর্ব সব জাগয়াগুলো। বৈচিত্র্যে, প্রাচুর্যে ও সৌন্দর্যে ভরা প্রকৃতির এ লীলাভূমি। এক মহাশিল্পী অতি সুন্দর করে রংতুলি হাতে নিয়ে খুশি মনে এঁকেছেন। অরণ্যরাজিতে ঢাকা, সবুজে সবুজ নীলিমায় নীল মনোমুগ্ধকর এ অঞ্চল। বিচিত্র এখানকার মানুষগুলো। এরা পাহাড়ের সন্তান পাহাড়ের আদিবাসী। মুক্ত প্রকৃতির মতোই মুক্ত মন তাদের। সহজ সরল স্বচ্ছ এরা। জটিলতা তাদের চরিত্রে এতটুকুও কালিমা লেপন করতে পারেনি। মুক্ত প্রকৃতির সন্তান তারা।

এই সব সন্তানদের প্রকৃতি ও পর্যটন বিদ্যায় প্রশিক্ষণ দিলে গোটা জাতি উপকৃত হবে। তিন পার্বত্য জেলা একাধিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ইনস্টিটিউট নির্মাণ করে দিলে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে জাতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভূমিকা রাখবে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ঠেকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, তবে আত্নরক্ষার চেষ্টা মানুষের সাধ্যের মধ্যে। আমাদের পাহাড়ধসকে ষোলো আনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা যায় না। এটা আমাদের পাপের শাস্তি। এবারের পাহাড়ধসে উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের যে প্রাণহানি ঘটেছে, তা নতুন বিপদ। সুতরাং বড় বিপর্যয় রোধ করতে হলে পাহাড়ের তিন পার্বত্য জেলায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ইনস্টিটিউট নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

পার্বত্য তিন জেলায় প্রচুর ফল বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, আনারস, লেবু, জাম্বুরা, জাম, তেঁতুল, আমলকি, জামরুল, কলা অন্যতম। প্রতিটি ফলের আলাদা আলাদা মৌসুম রয়েছে। সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রতি বছর ৩০ লক্ষ টন ফল পঁচে নষ্ট হয়। যার আনুমানিক মূল্য ১০ হাজার কোটি টাকা। ফল রক্ষণাবেক্ষণের শিক্ষা প্রশিক্ষণে ডিপ্লোমা কোর্স ব্যবস্থা চালু করলে ফরমালিন মিশ্রিত ফল আমদানি থেকে জাতি রক্ষা পেয়ে দেশজ ফলের দিকে ঝুঁকতে পারতো। পার্বত্য তিন জেলায় আছে প্রচুর বৈচিত্র্যময় ভূমি। উৎপন্ন হয় প্রচুর গৌ খাদ্য। এক বিংশ শতাব্দিতে এসেও ডিপ্লোমা ইন ভেটেরিনারি প্রযুক্তিবিদের অভাবে আধুনিক উপায়ে পশুপালন করা সম্ভব হচ্ছে না। মাংস ও দুধ প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তিবিদ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ পশু ও দুগ্ধ সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণতা হওয়া সময়ের ব্যাপার।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আমেরিকার সহযোগিতায় কাপ্তাইতে জল বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে বাঁধ নির্মাণ করে। আবদ্ধ পানি থেকে পরিকল্পিভাবে মৎস্য উৎপাদনে ডিপ্লোমা ইন ফিসারিজ নিয়োগে চিন্তা করেনি। ফলশ্রুতিতে লেকের পর্যাপ্ত সুফল এখনো পাওয়া যায়নি। পার্বত্যবাসীকে দুর্যোগ থেকে রক্ষায় চট্টগ্রাম বিভাগে একটি ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েক কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা অতীব জরুরি। আর তা সম্ভব হলেই সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ দুর্যোগে, সুযোগে আত্মবিশ্বাসী হবে। স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হবে পাহাড়ি এলাকায়। সমৃদ্ধ হবে পুরো জাতি। নির্ভার জীবন যাপনে অভ্যস্ত হবো আমরা।

লেখক : সভাপতি ও মহাসচিব, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

LEAVE A REPLY