মণিদীপা দাশ

দেখিতে গিয়েছি পর্বত মালা

দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু।

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শীষের উপর

একটি শিশির বিন্দু। ’

এই বিন্দুর খোঁজে পাড়ি দিতে চায় অনেক অনেক দূরে পিপাসু মন। হারিয়ে যেতে চায় ‘অন্য কোথা’, অন্য কোনও খানে’।

যেতে একদিন হবেই কোন একদিন কোন সুদূর পাড়ে।

জীবনের একঘেয়েমিতা, সেই সকালের চেনা মুখ, বাজারের থলি, হেঁসেল সামলানো, ছেলে, মেয়ের খোঁজ রাখা, কে কেমন আছে। সবই তো আমাদের নিত্যদিনের কাজ। আর কতক্ষণ!

কেবলই মনে হয় কোন এক গোধূলি লগনে বিকেলে চুপিচুপি চলে যাই মেঘের ভেলায় চেপে অলকাপুরীতে। সেই মেঘবতীকন্যা, সেই নীলনদের নদী, সেই সবুজঘেরা গ্রাম পেরিয়ে কেতকীর বেড়া ডিঙিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে দূরে আরও দূরে……. বহু দূরে কোন এক অজানার টানে।

যুগ সংকটের তীব্রতা আমাদের গ্রাস করছে প্রতিনিয়ত। ক্রমশ ঢেকে ফেলছে আমাদের জীবনকে, সমাজকে, কেবলি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সর্দারি চাবুক। অশুভ শক্তির দাপট আমাদের আবদ্ধ করে রাখতে চায় গৃহকোণে বা কর্মস্থলের ক্ষুদ্র পরিসরে।

মন তখন চায় মুক্তি। সেই অজানাকে জানা, অজানাকে দেখার অদম্য কৌতূহলে বেড়িয়ে পড়তে চায়। কোনও এক নতুন কিছুর সন্ধান করতে চায়। নিজের মন নিজের সঙ্গে বিদ্রোহ করে।

বলে, “থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎ টাকে।”

এই কারণেই জীবনের গড্ডলিকা প্রবাহ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন করার কী আকুল প্রয়াস চলে সর্বক্ষণ। চাই ছুটি। চাই জীবন থেকে জীবনের ছুটি। বাজুক ছুটির ঘন্টা। বেড়িয়ে পড়ি পায়ে পায়ে।

কবি বুদ্ধদেব বসু এক জায়গায় বলেছিলেন বাঙালি সন্তান মাত্রই কবি। সেই কবি মন উথালপাতাল হয় যখন রোদ্দুরে চাঁপা ফুলের রঙ লাগে, শিউলির গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়ায়, আকাশের কোণে কোণে সাদা মেঘের আলস্য চোখে পড়ে!

সত্যি তখন মন লাগেনা কোনও কাজে।

পাহাড় সমুদ্র এর কথা বলতেই সত্যি মনটা কেমন যেন নেচে উঠে। এই দেশ যার প্রতিটি শরীরের কোনায় কোনায় সমুদ্র, নদী, সবুজ, সোনালী রূপে রসে গন্ধে ভরে আছে।

বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে

বহু ব্যয় করি বহু দেশ ”।

হয়তো ঘোরা যায়, সেই চিরকালের চিরচেনা আমাদেরই দেশ।

যা একটি ধানের শীষের উপরে

একটি শিশির বিন্দুর মতো

যা সত্যি মনোরম।

এ যেন অজানা এক পথ, কী জানি কোথায় হবে শেষ। ’ পথ চলতে চলতে আপন মনের নিভৃতে নির্জনতায় মন যে গুন গুন স্বরে স্বপ্ন রচনা করে চলে। অপার মাঠের উপর একটি ছায়া। কখনও কোমল বিষাদ কখনওবা লাল নীল মেশা আবছায়া। নিত্যদিনের ঝামেলার ঘেরা টোপ থেকে বেরিয়ে একান্ত অনুভূতি এ সুখ অন্য সুখ, এ দুঃখ অন্য দুঃখ। ঠিক অশ্রুজল নয় একটি নির্নিমেষ চোখের বড় বড় পল্লবের নীচে গভীর ছলছলে ভাব। যেখানে একটু ফাঁকা, একটু নিস্তব্ধতা, একটু খোলা আকাশ, সেই খানেই যেন বিশাল হৃদয়ের অন্তর্নিহিত উদাস্য এবং বিষাদ ফুটে ওঠে। ভ্রমণ পিপাসু মন খুঁজে বেড়ায় সেই বিষাদের নিশানা।

তাই তো উদাসীন মনে কখনও বেজে ওঠে পিলু, ভৈরবীর সুর, কখনও বা পূরবীর।

যেন এক অদ্ভুত কোন অজানা নেশায় ছুটে বেড়ায় মানুষ দূর থেকে দূরান্তরে, অনন্ত অসীমের খোঁজে। মৃত্যুর হাত ছানিকে সঙ্গী করে। সুখের জীবন নয়। বেছে নেয় দুর্গম থেকে দুর্গমতর পথ।

কখনও মুগ্ধ করে পর্বতের নিঃসঙ্গতা, কখনও বা নদীর ছলাৎছল উচ্ছলতা। আবার কখনও সবুজ বনবিথীকা। মন খেলায় মেতে উঠতে চায় সোনালী রোদ মেঘে কিংবা বৃষ্টি ভেজা শালপিয়ালের বনে।

সব জানা পূর্ণ হলেই পাওয়া যাবে অনাবিল আনন্দ। স্মৃতির সরণি বেয়ে এগিয়ে যেতে হবে জীবনের আরও অনেক পথ।

পথ চলা এই দেখাশোনা

ছিল যাহা ক্ষণচর

চেতনার প্রত্যন্ত প্রদেশে,

চিত্তে আজ তাই জেগে ওঠে ;

এই সব উপেক্ষিত ছবি

জীবনের সর্বশেষ বিচ্ছেদ বেদনা,

দূরের ঘন্টার রবে এনে দেয় মনে।

LEAVE A REPLY