আজাদী প্রতিবেদন

চট্টগ্রাম জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাসিক সভায় ওয়াসা ও রেলওয়ের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী। গতকাল সকালে নগরীর সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত সভায় সভাপতির বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ওয়াসা ও রেলওয়ে সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। প্রশাসনের সভাটিকে তারা অবজ্ঞা করেছে। সভায় আসলে তারা তোপের মুখে পড়বেন। তাই হয়তো তাদের কোনো প্রতিনিধি আসেননি।’

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে বিদ্যুৎ সংযোগ কারা দিয়েছে জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘বছরে পর বছর পাহাড় ধ্বংস করে অবৈধ বসবাসকারীদের বিদ্যুত সংযোগ কারা দিয়েছে? বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে হলে অবশ্যই জমির মালিক হতে হবে। নামজারি হয়েছে কিনা নিশ্চিত হয়েই বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হবে। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে আমি রুহুল আমীনকে (সীতাকুণ্ডের এসি ল্যান্ড) বলেছি। আমি যতদিন দায়িত্বে আছি এসব চলবে না।’ এসময় উপস্থিত কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘এসব ভূমিদস্যু খুব প্রভাবশালী।’ জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘রাষ্ট্রের চেয়ে সংস্থা কখনো বড় হতে পারে না। সরকার তো আমাদের সাথে আছে। আমি এর শেষ দেখতে চাই।’

এছাড়া সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরাপল্লীর অজ্ঞাত রোগে আক্রান্তদের সুচিকিৎসা ও সেই অঞ্চলের বাসিন্দাদের মূল ধারায় ফেরানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন জিল্লুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘সীতকুণ্ডের ত্রিপুরাপল্লীতে প্রতিদিন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এটা উদ্বেগজনক। যেভাবে হোক তাদের সমাজের মূল ধারার ফেরানোর চেষ্টা করতে হবে।’ ওই এলাকায় একটি গভীর নলকূপ, বিদ্যালয় স্থাপন ও পরিকল্পনা কার্যক্রম চালানোসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের সংশিহ্মষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক। এছাড়া জেলা সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সিদ্দিকীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘ত্রিপুরাপল্লীর লোকদের স্বাস্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। ফেসবুকে এসব বিষয়ে প্রচারণা চালাতে হবে। প্রয়োজনে ‘ফেসবুক লাইভে’ আসতে হবে।’ জবাবে সিভিল সার্জন বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের ত্রিপুরাপল্লীর পরিস্থিতি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর কোনো শিশু মারা যায়নি। সংকাপন্ন শিশুগুলো ধীরে ধীরে উন্নতির পথে রয়েছে। আজকে (গতকাল) রোগের প্রতিবেদন নিয়ে আমি ঢাকায় যাচ্ছি। আমার ৫ হাজার ফ্রেন্ডসহ ফেসবুকে প্রায় ৪০ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। আমি ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতার কাজগুলো করে যাবো।’

শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের প্রতি উদ্দেশ্য করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি বিশ্বের উন্নত দেশে গিয়েছি। তাদের অবকাঠামোর সাথে আমাদের যোজনযোজন দূরত্ব। ব্রিটিশরা আমাদের শোষণ করেছে বটে, কিন্তু তারা ভবন নির্মাণে কখনো দুই নাম্বারি করেনি। যেহেতু আপনাদের তৈরি করা ভবনে শিক্ষার্থীরা পড়বে, সুতরাং এখানে যাতে কোনো দুই নম্বর নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার না করা হয়।’ জবাবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আসিফুর রহমান বলেন, ‘আধুনিক নির্মাণশৈলী অনুসরণ করেই আমরা ভবনগুলো নির্মাণ করছি।’

চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিয়ে সরকার বিব্রত। এ জায়গা থেকে উন্নতি করতে হবে। একনেকের বৈঠকে সরকার চট্টগ্রামের উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।’ এসময় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে উপসচিব আশেক রসুল চৌধুরী বলেন, ‘জলবদ্ধতা নিরসনে আমরা করে যাচ্ছি। মহেশখাল বাঁধের ওই স্থানে ুইচ গেট স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

সভায় চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে গেছে। এছাড়া প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে অনেক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। এ বিষয় থেকে উত্তরণে আমরা ট্রাফিক ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেমে কিছু পরিবর্তন আনবো। এছাড়া বর্তমান সমাজে তরুণরা পর্নোগ্রাফিতে ঝুঁকছে। এটি সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে সবচেয়ে বড় বাধা। মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত আমাদের লড়াই চলছে।’

কর্ণফুলী ও হালদাসহ সকল নদীর পানি দূষণের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে জানতে চান জেলা প্রশাসক। এসময় চট্টগ্রাম মহানগর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সংযুক্তা দাশগুপ্তা বলেন, ‘নগরীর বিভিন্ন নালা ও খালের দূষিত পানি কর্ণফুলী নদীতে মিশছে। ফলে নদীর পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া চলমান কলকারখানার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

বিদ্যুত বিভ্রাট নিয়ে জেলা প্রশাসকের প্রশ্নের জবাবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি১ পটিয়ার মহাব্যবস্থাপক এএইচএম মোবারক উল্লাহ বলেন, ‘রমজানে সামগ্রিকভাবে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ‘মোরা’ পরবর্তী টর্নেডোতো অনেক জায়গায় বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে গেছে। ফলে কয়েকটি স্থানে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে আমরা ৫০ মেগাওয়াটের আরেকটি সাবস্টেশন করার উদ্যোগ নিচ্ছি।’

সভায় বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সহকারী পরিচালক কেএম মাহাবুব কবির বলেন, ‘ফিটনেসবিহীন অবৈধ গাড়িগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের পরিচালনার মাধ্যমে জেল, জরিমাান ও যানবাহন ড্যাম্পিং কার্যক্রম অব্যাহত আছে।’ অপরদিকে ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য বিএসটিআইয়ের প্রতি অনুরোধ জানান জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী। জবাবে চট্টগ্রাম বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘ভেজাল খাবারের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘চট্টগ্রামে একটি বৃহৎ বাস টার্মিনাল গড়ে তোলা হবে। এছাড়া হাটহাজারীতে হিজড়াদের পুনর্বাসন কেন্দ্র করা হবে। চট্টগ্রামের সব হিজড়া এক জায়গায় থাকবে। অন্যদিকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের বাকলিয়ার দিকে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া চলছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পুরো চট্টগ্রামে ডিস্ট্রিক্ট ইনফরম্যাশন নেটওয়ার্ক (ডিআইএন) গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নের ওয়ার্ডকে কেন্দ্র করে এ কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেবো। তাদের মাধ্যমে এলাকার মানুষ বিভিন্ন তথ্য জানতে পারবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া সচেতনতামূলক যে কোনো ধরনের ক্যাম্পেইন এই সিস্টেমে করার চিন্তা রয়েছে আমাদের।’

সভার সদস্য সচিব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মাসুকুর রহমান সিকদারের সঞ্চালনায় এতে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সাহাব উদ্দিন, মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাফফর আহমদ, উপজেলা চেয়ারম্যান এহছানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল (রাউজান), মাহবুবুল আলম চৌধুরী (হাটহাজারী), মোজাফফর আহমদ (পটিয়া), মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম (বাঁশখালী), এম তৌহিদুল আলম (ফটিকছড়ি), জেলা ট্রাকমিনি ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবদুল মান্নান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাজী মো. চাহেল তস্তুরী (বাঁশখালী), জিয়া আহমেদ সুমন (মীরসরাই), দীপক কুমার রায় (ফটিকছড়ি), মোহাম্মদ উল্লাহ (সাতকানিয়া), গৌতম বাড়ৈ (আনোয়ারা), মোহাম্মদ কামাল হোসেন (রাঙ্গুনিয়া), আক্তারউননেছা শিউলী (হাটহাজারী), বোয়ালখালী পৌর মেয়র হাজী আবুল কালাম আবু, বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুরাইয়া আক্তার সুইটি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল হক চৌধুরী, জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রেয়াজুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলমগীর, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমাম হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খ.. জুলফিকার তারেক, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহির উদ্দিন দেওয়ান, বিটিসিএল’র বিভাগীয় প্রকৌশলী (বহি🙂 সমিত চাকমা, বিআরডিবি’র উপপরিচালক মোরশেদ আলম, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম, ওষুধ তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুর রহমান, বিএডিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বন্দনা দাশ, জেলা শিক্ষা অফিসার হোসনে আরা বেগম, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাসরিন সুলতানা, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মো. কামাল উদ্দিন, ইসলামি ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক ফাহমিদা বেগম, বিএসটিআই’র সহকারী পরিচালক মো. মোস্তাক আহমদ, জেলা সমবায় অফিসার মো. মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া, বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক কে এম মাহবুব কবির, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক রিংকু কুমার শর্মা প্রমুখ।

LEAVE A REPLY