কঠোর নজরদারি ও তদারকি সত্ত্বেও মাদকদ্রব্য পাচার রোধ করা যাচ্ছে না। বরং দিন দিন বড় রকমের চালান পাচার হচ্ছে। সেই চালানের কোনো কোনো অংশ কদাচিৎ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। পত্রপত্রিকায় ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তা ফলাও করে প্রচার করা হয়। অতি সম্প্রতি টেকনাফে প্রায় ৬ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯০৬ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে বিজিবি। এ সময় মিয়ানমারের এক নাগরিককে আটক করা হয়েছে।

দৈনিক আজাদীর ১৩ জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, টেকনাফকক্সবাজার প্রধান সড়কের দমদমিয়া বিজিবি চেকপোস্টের সদস্যরা নাফনদী সীমান্তের এলাকা দিয়ে ইয়াবার একটি চালান মিয়ানমার হতে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে এমন গোপন সংবাদ পায়। এ সংবাদের ভিত্তিতে দমদমিয়া বিওপির হাবিলদার মো. লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টহলদল উক্ত স্থানে ওঁৎ পেতে থাকে। এ সময় বিজিবি সদস্যরা এক ব্যক্তিকে বস্তা মাথায় নিয়ে আসতে দেখে সন্দেহ হওয়ায় চ্যালেঞ্জ করে। বিজিবি সদস্যদের দেখা মাত্রই ওই ব্যক্তি সাথে থাকা বস্তা ফেলে দ্রুত কেওড়া বাগানের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ধাওয়া করে বস্তাসহ ইয়াবা পাচারকারীকে আটক করতে সক্ষম হয়।

মানবসভ্যতার বিস্ময়কর সম্ভাবনা নিয়ে যখন পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সে সময় আমাদের দেশের কিছু লোক মাদক পাচার ও ব্যবসায় নিজেদের জায়গা পাকাপোক্ত করছে। তারা তাদের অপতৎপরতায় যুক্ত করছে আমাদের তরুণ সমাজের কিছু অংশকে। এ তরুণদের ভবিষ্যৎ অসাড়, পঙ্গু ও ধ্বংস করার গভীর চক্রান্তে ওরা জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে মাদকাসক্তির ভয়াবহতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। এক সময় আফিম, মদ, গাঁজা, ভাং, চরস ও তামাকের নেশার কথা শুনেছে মানুষ। সেই নেশার ফাঁদ এখন চলে এসেছে ইয়াবায়। এই ইয়াবার বাজার এখন দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিণত হয়েছে রমরমা অবস্থায়। সীমান্ত পথে কিংবা আকাশপথে চোরাচালানের মাধ্যমে ড্রাগ পাচারের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিক বেশ কিছু চোরাচালানি সিন্ডিকেট। কিছুকাল আগেও মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম নিয়ে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের স্বর্গভূমিস্বর্গ ত্রিভুজ। পরে এ ত্রিভুজটি ভেঙে গেলে চোরাচালানি চক্র আবাস গড়ে তোলে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানে। আমাদের বাংলাদেশ এদের নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার রোধের পূর্বশর্ত হলো মাদক চাষ ও উৎপাদন প্রতিহত করা। চাষাবাদ কিংবা বিপণনে নিয়োজিত সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা জাগিয়ে তোলা। মোড়কসহ মাদক চাষ ও উৎপাদনের বিষয়টি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে প্রতিটি দেশের সরকারকে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি নিরীহ চাষীদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টি দিতে জাতিসংঘ আহ্বানও জানায়। বলাবাহুল্য, মাদক ব্যবসায়ীরা পাচারের নিত্য নতুন কৌশল উদ্ভাবন করে বেড়ায়। কেবল চাষাবাদ নয়, সংশ্লেষণ পদ্ধতিতে মাদক উৎপন্ন করা হয়। এ ধরনের মাদকে ছেয়ে গেছে গোটা পৃথিবী। মাদকমুক্ত বিশ্ব গড়তে চাইলে উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পাচারের রুট, মাদক উৎপাদনের নতুন নতুন কৌশল, প্রবণতা এবং গতিধারা নির্ণয়ের প্রতি সজাগ থাকতে হবে।

মাদকবিরোধী আন্দোলনে সফলতা পেতে জাতিসংঘের পরামর্শ হলো, কেবল পাচারের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি আরোপ করেই দায়িত্ব শেষ হবে না, এর সাথে সব সময় আরো কতগুলো বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হবে, যেমন ড্রাগসের চাহিদা কমানোর উদ্যোগ নেয়া, উদ্যোগটি ড্রাগসের উৎপাদন এবং বিপণনের গতি প্রকৃতি পাল্টানোর ব্যাপারে কোনো ভূমিকা রাখছে কিনা যাচাই করা, প্রতিটি দেশে পর্যাপ্ত মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করা।

বিশ্বব্যাপী বিবেকবান মানুষ এখন মাদকবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। দেশে বিদেশে গড়ে উঠেছে মাদকবিরোধী সংগঠন। তারা মাদক বিরোধী গণসচেতনতা গড়ে তোলার কাজে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের দেশে সেই কর্মকাণ্ড বা মাদকবিরোধী আন্দোলন আরো জোরদার করতে হবে। মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেই সফলতা অবশ্যম্ভাবী। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তরুণ সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে মাদক নিয়ন্ত্রণে সফলতা নির্ভর করে সকলের আন্তরিক উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর।

LEAVE A REPLY