ফারজানা রহমান শিমু

ন্যায়অন্যায় আর মন মস্তিষ্কের এক অদ্ভুত টানাপোড়ন! স্বাভাবিকত্বের মুখোশ আঁটা মানুষের ভেতরে অন্যরকম অস্তিত্বের ডুব সাঁতার। প্রাত্যহিক খাওয়াপরা, হাসিকান্না আর চালচলনে অভ্যস্ত অতি সাধারণ মেয়েটিও যে এমন করে হোঁচট খেতে পারে, এমন করে চুপসে দিতে পারে স্বপ্ন সাধের বেলুনটিকে, কে ভাবতে পারে! মধ্যবিত্তের স্বপ্ন দেখা যে পাপ, কিন্তু প্রাণের চাওয়াকে অস্বীকার করাও তো পুণ্য নয়। তাই রোরুদ্যমান আকাশের পানে চেয়ে বুকের তুফান ঢাকতে চাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলে সাবিহার। রাতভর যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় হার মেনে অবশেষে অসহায় কান্নায় গোপনে ভেঙে পড়ে সে।

মাবাবার চোখের মণি, স্বপ্ন রাণী সাবিহা বরাবরই মন জয় করেছে সবার। ভালো রেজাল্ট, নম্র চালচলন আর মিষ্টি ব্যবহার তাকে সকলের বেশ প্রিয়ভাজন করে তুলেছে। প্রতিবেশী আন্টিরা সব সময় ছেলেমেয়েদের সামনে সাবিহাকে একটা মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তাই কেউ কেউ পরোক্ষভাবে তাকে ঈর্ষাও করেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে দুষ্ট ছেলে রকিব প্রায়ই তার পিছনে লেগে থাকত। নানাভাবে তাকে হেয় করার কম চেষ্টা করে নি সে। কিন্তু কি অদ্ভুত, এই রকিবই এক সময় তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে গেল।

রকিবকে ছোট বেলা থেকে খানিকটা বেপরোয়া দেখতেই অভ্যস্ত সাবিহা। ওকে মনে মনে ভয় পেত বলেই ওর ক্ষেত্রে মিষ্টি ব্যবহারটুকু চরম মাত্রা পেয়ে যেত। সাবিহার সাথে লাগার কোন সুযোগই মিস্‌ করত না রকিব। কিন্তু সাবিহা মৌন পর্বতের ভূমিকায় সামলে নিত সব। ওকে তাতানোর জন্য প্রায় সময় এটা ওটা গিফ্‌ট করা রকিবের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এ যেন সাবিহার ব্যক্তিত্বকে হেয় করার প্রয়াস। যদি কখনো সে তর্ক করার চেষ্টা করত, না জানি কি হতো! কিন্তু ভীরু মেয়েটি হাত বাড়িয়ে উপহার গ্রহণের মাধ্যমে শত্রুতার প্রচ্ছন্ন সুযোগটাকে এড়িয়ে যেত। সেসব অবশ্য অনেক বছর আগের কথা। এরই মধ্যে কত পথ কতদিকে বেঁকে গেছে!

শিক্ষা জীবনের নানা ধাপ পেরিয়ে সাবিহা একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি নিয়েছে। রিটায়ার্ড বাবা ও অসুস্থ মায়ের একমাত্র অবলম্বনের ভূমিকায় শক্তভাবে দাঁড়াতে গিয়ে জীবনের বাকি সবকিছুকে তুচ্ছ করেছে সে। সমবয়সি অনেকের বিয়েতে যোগদান করা হয়ে গেছে। এক বান্ধবী বাচ্চার মাও হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবের পাথুরে জমিনে দাঁড়িয়ে তারুণ্যের ঢেউয়ে পা ভেজানোর সাহস হয় নি তার। কি করে সম্ভব? মাবাবার অসহায়ত্বের ভিটায় দাঁড়িয়ে কেউ কি বাসর সাজাতে পারে?

রকিবের জীবন তখন ঊর্ধ্বমুখী রকেটের বেগে ধাবমান। বাবার ব্যবসার লাগাম তার হাতে। এই ট্যুরে যায় তো, ঐ ফেরে। জীবনের রূপ রস অনেক বেশি জড়িয়ে নিয়ে সে যেন তেজস্বী আর উদ্ধত। কিন্তু ততদিনে সাবিহার ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছে সে। কৌতুকমিশ্রিত দুষ্টুমির মধ্যেও সেই সূক্ষ্ম সম্মানবোধের ব্যাপারটি সাবিহা বেশ উপভোগ করত।

সেবার প্যারিস থেকে সাবিহার জন্য একটি পারফিউম নিয়ে এলো রকিব। এবার সাবিহা নীরবে শুধু উপহার গ্রহণ করল না। বিনিময়ে একটি প্যাকেট এগিয়ে দিল তার দিকে। মৃদু হাসির সাথে বলল ‘তোকে কোনদিন কিছু দিতে পারি নি। আমার প্রথম বেতনের টাকায় কিনলাম। পরিস কিন্তু’! প্যাকেট খুলতেই চমৎকার একটি পাঞ্জাবি উঁকি দিল। হালকা কাজের বেশ রুচিশীল কাপড়। হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই এক অন্য ধরনের অনুভূতি গ্রাস করল রকিবকে। মনে হল, এটা শুধু পাঞ্জাবি নয়, যেন অনেক কিছু জড়িয়ে রয়েছে এতে। আবার ভাবলো, ধুর ছাই, কি সব আবোল তাবোল ভাবনা!

না, রকিবের মতো বিলাসিতা সাবিহার সাজে না। তাই পরবর্তী মাসে রকিব যখন জানতে চাইলো, ‘এবার কিছু কিনলি না আমার জন্য?’ মদু হেসে গুটিয়ে গেল সাবিহা। পরক্ষণে রকিব প্রাণ খুলে হেসে বলল, ‘মজা করছি, আসলে তোর পাঞ্জাবিটা পেয়ে লোভ জন্মে গেছে’। সাবিহা বলল ‘কেন? তুই আমাকে এত কিছু দিস্‌, আমার তো কখনো লোভ হয় না’। রকিব বলল ‘জানি, তুই একদম অন্য রকম’। এইসব টুকটাক ঘটনার মধ্যে দিয়ে আরো কিছু সময় পেরিয়ে যায়। ব্যস্ততা বাড়ে রকিবের। সাবিহার মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ে। বাবার পর্যুদস্ত মুখে নৈরাশ্যের অন্ধকার দেখে দেখে মুষড়ে পড়ে সাবিহা। ক্যান্সারের রাক্ষুসে হা বন্ধ করার ক্ষমতা তার কোথায়? আজন্ম দাঁড় টেনে যাওয়া ক্লান্ত মাঝির মতো সে যখন বিষণ্নতায় ম্রিয়মান, ঠিক সে সময় এক বৃষ্টিস্নাত গোধূলিতে রকিব ঢুকলো তার রুমে। সে তখন চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। বৃষ্টি ভেজা রকিবকে ঝড়োকাকের মতো দেখাচ্ছিল। রুমালে হাত মাথা মুছতে মুছতে রকিব শুনতে পেল সাবিহার মৃদু কণ্ঠস্বর, ‘কিরে, কোত্থেকে এলি এ সময়? তুই যে কি! এ সময় কেউ বের হয়? যা বাজ পড়ছে বাইরে! তুই বোস্‌, আমি চা নিয়ে আসি।’

গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে ছোট্ট একটি প্যাকেট এগিয়ে দিল রকিব। বরাবরের মতোই নিষ্পৃহ সাবিহা। খানিকটা উস্‌খুস করে রকিব বলল ‘ দেখ তো, পছন্দ হয় কিনা’। প্যাকেট খুলে বাক্সটি বের করতেই সাবিহা চমকে উঠল। একি! চমৎকার একটি আংটি। তার চেহারায় বিস্ময় দেখে রকিব বলতে লাগলো– ‘অনেক ডিজাইন দেখে অর্ডার করেছিলাম। তুই তো কখনো কিছু বলিস না, বুঝতেই পারি না কেমন জিনিস তোর পছন্দ’। শরতের মেঘের মতো নানা রঙের পোঁচ তখন সাবিহার মুখে। ছোট্টবেলা থেকে এ পর্যন্ত রকিবই তার খুব কাছের মানুষ। তার ব্যক্তিত্বের কঠোর সীমানা পেরিয়ে আর কেউ পারে নি তার এত কাছে আসতে। ভালোমন্দ, সুখঅসুখে রকিবকেই সে জেনেছে, বুঝেছে। রকিবের বেপরোয়া ভাবভঙ্গিতে সে বড্ড অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু তার বাবামা, তাদের খাওয়াপরা, রোগব্যাধি . . . না, না, অসম্ভব। কিছুতেই পারবে না সাবিহা। দীর্ঘ একটি শ্বাস টেনে সাহস সঞ্চয় করল সে। এরপর ভীষণ তিক্ততার সাথে বলল ‘মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? আংটি দেয়ার মানে বুঝিস? পাগল হয়ে গেছিস’! এতদিনের চেনা সাবিহার এই প্রতিক্রিয়াতে বিমূঢ় রকিব কেমন হতভম্ব হয়ে পড়ল। সাবিহা বলেই চলেছে, ‘তোর কি ধারণা? টাকা আছে বলে যা খুশি তাই করবি’? রকিব মিন মিন করে বলল কি বলছিস এসব? তুই আমাকে ভালোবাসিস না? আচমকা প্রশ্নে থতমত সাবিহা কথা খুঁজে না পেয়ে বলল ‘বের হ তুই আমার বাড়ি থেকে। বেরিয়ে যা’। বাইরের তুমুল তুফান তখন তুঙ্গে। সেদিকে তাকিয়ে রকিব বলল ‘এখন?’ সাবিহা বলল ‘হ্যাঁ, এখন বেরিয়ে যা’। শেষ চেষ্টা হিসেবে রকিব দু’কদম এগিয়ে এসে বলল, ‘কিন্তু আমার একটা কথা শোন্‌’। সাবিহা পিছন ফিরে বলল ‘আমি কোন কথাই শুনতে চাই না। তুই চলে যা’। ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল রকিব। পিছন ফিরে তাকানোর প্রবল ইচ্ছাটুকু অতি কষ্টে দমন করল সাবিহা। টের পেল, ভেতরের সবটুকু নিয়ে ছুটে চলে গেল তার আকাশের একমাত্র নক্ষত্রটি।

মাবাবার স্বপ্ন বাণী, সকলের চোখের মণি সাবিহা দীর্ঘদিনের সঞ্চিত কিছুই জানাতে পারে নি রকিবকে। বলতে পারে নি একটু একটু রঙ লাগিয়ে আঁকতে থাকা তার সেই গোপন ছবিটির কথা। বলতে পারে নি সেই উচ্ছ্বল ঝর্ণার প্রচণ্ড আবেগের কথা। মধ্যবিত্তের বেঁচে থাকার কঠিন বেদিতে হৃদয়ের সবটুকু সমর্পণ করে একটানা কেঁদেই চলেছে সাবিহা। জীবনের নানা পথ পরিক্রমায় সে কান্নার জল যদি কখনো শুকায়!!

LEAVE A REPLY