হাসান আকবর ।।

দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতে পণ্য পরিবহনে মারাত্মক সংকটের আশংকা করা হচ্ছে। লাইটারেজ জাহাজ শ্রমিক নেতাদের মাঝে বিরোধ এবং পরস্পর বিরোধী অবস্থান পুরো বিষয়টিকে ঘোলাটে করে তুলছে। জাহাজ মালিকদের কাছ থেকে সরকার ঘোষিত বেতনভাতা আদায়ের আন্দোলনের চেয়ে বর্তমানে শ্রমিক নেতাদের ‘ইগো’ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে এক পক্ষ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করলেও কার্যত গ্রুপটি গতকাল থেকে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। অপরপক্ষ জাহাজ মালিকদেরকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সহস্রাধিক জাহাজের কিছু চলাচল করবে, আবার কিছু জাহাজ বন্ধ থাকবে। অপরদিকে পরস্পর বিরোধী অবস্থানে শ্রমিকদের মাঝে সংঘাতসহ পুরো সেক্টরে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টিরও আশংকা প্রকাশ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর ও অভ্যন্তরে জেটির ওভার সাইড থেকে বছরে অন্তত চার কোটি টন পণ্য লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙরে এক হাজারেরও বেশি লাইটারেজ জাহাজ এ বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। লাইটারেজ জাহাজে পণ্য পরিবহন বন্ধ হলে দেশব্যাপী পণ্য প্রবাহের নেটওয়ার্ক মুখ থুবড়ে পড়ে। একইসাথে বিভিন্ন শিল্প কারখানাও কাঁচামাল সংকটে বন্ধ হয়ে যায়। মাস কয়েক আগে বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে লাইটারেজ জাহাজে টানা কয়েকদিন অচলাবস্থা বিরাজ করেছিল। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজটের সৃষ্টি হয়েছিল। বেড়ে গিয়েছিল জাহাজের অবস্থানকাল। আন্তর্জাতিক শিপিং সেক্টরে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্ধিত বেতন ভাতার দাবিতে খাতটি আবারো অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। লাইটারেজ শ্রমিকরা সরকার নির্ধারিত বেতনভাতা প্রদানের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ইতোমধ্যে লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়, ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার নির্ধারিত বেতন ভাতা পরিশোধ করা না হলে ১৩ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হবে। যেসব জাহাজের মালিক সরকার নির্ধারিত বেতন ভাতা পরিশোধ করবে সেসব জাহাজের তালিকা তৈরির পাশাপাশি তাদেরকে সাদা পতাকা উড়ানোরও নির্দেশনা দেয়া হয়। ১৩ তারিখ সকাল থেকে আন্দোলন শুরু করার কথা থাকলেও কার্যত গতকাল দুপুর থেকে শ্রমিকদের একাংশ জাহাজে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।

লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন কাজ বন্ধ করে দিলেও নৌযান ফেডারেশনের অন্তর্ভুক্ত শ্রমিকরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমরা কাজ করবো। আমরা মালিকদের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছিলাম। মালিকরা ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় চেয়েছেন। আমরা সময় দিয়েছি। ২০ তারিখের মধ্যে না হলে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবো।

লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) একজন কর্মকর্তা গতরাতে দৈনিক আজাদীকে জানান, আমাদের কাছে গতকাল ৪১টি জাহাজ ছিল। আমরা বরাদ্দ দিয়েছি। এসব জাহাজ কাজে যাবে কি যাবে না, শ্রমিকরা কাজ করবে কি করবে না তা আমরা বলতে পারছি না।

অপর একজন কর্মকর্তা বলেছেন, শ্রমিকরা এখন মালিকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন যতটুকু না করছে তার চেয়ে বেশি জড়িয়ে গেছে নিজেদের মধ্যে। একপক্ষ কাজ করবে বললে অন্যপক্ষ বিগড়ে যাচ্ছে। আবার একপক্ষ আন্দোলনে গেলে অপরপক্ষ কাজ করবে বলে ঘোষণা দিচ্ছে। বিষয়টি শ্রমিক নেতাদের ‘ইগো প্রবলেম’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জাহাজ মালিক বলেছেন, বেতন ভাতা নিয়ে অহেতুক সংকট তৈরি করা হচ্ছে। আমরা সরকার নির্ধারিত বেতন ভাতা পরিশোধ করছি। এখন সরকার যেই হারে এবং যেভাবে বেতন ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছে তাতে অনেকেরই বেতন কমে যাচ্ছে। কিন্তু তারা এই কমার বিষয়টি না মেনে আগের বেতনের পুরোটাই বেসিক হিসেবে প্রদান করার জন্য চাপ দিচ্ছে। লাইটার শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শাহাদাত হোসেন বলেনবর্ধিত বেতন ভাতা প্রদান না করলে আন্দোলন চলবে। তিনি বলেন, যেসব মালিক বর্ধিত বেতনের বিষয়টি কার্যকর করবে তারা সাদা পতাকা উড়িয়ে জাহাজ চালাতে পারবে।

অপরদিকে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী আশিকুল আলম বলেন, আমরা মালিক পক্ষকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছিলাম। তারা ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় চেয়েছে। আমরা সময় দিয়েছি। লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়ন সরকার দলীয় শ্রমিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত। অপরদিকে নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের সাথে কোন রাজনৈতিক দলের সংশ্রব নেই বলেও গতকাল সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। শ্রমিক নেতাদের বিরোধের জের ধরে লাইটারেজ জাহাজ চলাচলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে। যা দেশের সার্বিক বাণিজ্য, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের পণ্য খালাস ও জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বিষয়টির দ্রুত সুরাহা জরুরি। লাইটারেজ জাহাজ চলাচলে সংকট তৈরি হলে এর খেসারত দিতে হবে। তিনি বলেন, লাইটারেজ শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা থাকলে তা অবশ্যই দিয়ে দিতে হবে। কিন্তু কোন ধরনের আগাম নোটিশ ছাড়া জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টাকে হটকারি সিদ্ধান্ত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

LEAVE A REPLY