আজাদী প্রতিবেদন

চট্টগ্রাম বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষার (এইএসসি) ফলাফলে এবারো খারাপ করেছেন মফস্বলের শিক্ষার্থীরা। যা বোর্ডের গড় ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন পাঁচটি জেলার (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) এইএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, এই পাঁচটি জেলার মধ্যে সবচেয়ে ভাল করেছেন চট্টগ্রাম মহানগরীর শিক্ষার্থীরা। পাসের গড় হার এবং জিপিএ৫ প্রাপ্তি; দুটোতেই এগিয়ে ছিল মহানগরীর শিক্ষার্থীরা। অবশ্য উচ্চ মাধ্যমিকে এবার ছাড়াও গত ছয় বছর ধরেই এই চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বোর্ডের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, এবার চট্টগ্রাম মহানগরীর আওতাভুক্ত বিভিন্ন কলেজ থেকে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের গড় পাসের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। যা চট্টগ্রাম বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলের চেয়ে ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। এবার চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার হচ্ছে ৬১ দশমিক ০৯ শতাংশ। মহানগরীর বাইরে চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলায় এবার গড় পাসের হার হচ্ছে ৫৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। যা গতবারের তুলনায় ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ এবং এবারের বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলের চেয়ে ৫ দশমিক ২১ শতাংশ কম। চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার সবচেয়ে খারাপ করেছে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। এই জেলায় এবার পাসের হার ৪৪ শমমিক ৬৩ শতাংশ। যা বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলের চেয়ে ১৬ দশমিক ৪৬ শতাংশ কম। এছাড়া বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলের চেয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ কমে রাঙামাটি জেলায় পাসের হার ছিল ৪৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বোর্ডের সমগ্রিক ফলাফলের চেয়ে ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ কমে বান্দরবান জেলায় পাসের হার হচ্ছে ৫৫ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে কক্সবাজার জেলায় পাশের হার হচ্ছে ৫৫ দশমিক ৩২ শতাংশ।

উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় তুলনামূলকভাবে মফস্বলের শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ করার কারণ হিসেবে শিক্ষাবিদ এবং চট্টগাম বোর্ডের দায়িত্বশীলরা বলছেন, এবার শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানে বেশি খারাপ করেছেন। ফিজিক্স প্রথম পত্র এবং আইসিটি’তে তুলনামূলক ফলাফল খারাপ হয়েছে। মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অপেক্ষাকৃতভাবে বিজ্ঞানের দক্ষ শিক্ষকের সংকট রয়েছে। আইসিটি’র অভিজ্ঞ শিক্ষকও নেই। অনেক কলেজে আইসিটির শিক্ষকও নেই। এর প্রভাবে পড়েছে পরীক্ষায়।

অভিযোগ আছে, মফস্বলের অধিকাংশ কলেজের শিক্ষকদের সৃজনশীলপদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। ফলে শিক্ষার্থীরাও সৃজনশীল পদ্ধতির বিষয়টি শ্রেণিকক্ষে রপ্ত করতে পারেন না। অথচ তাদের পরীক্ষা দিতে হয় সৃজনশীল পদ্ধতিতেই। এটাও ফলাফলে প্রভাব ফেলে।

অবশ্য শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ বলছেন, মফস্বলের কলেজগুলোতে বহুমুখী সমস্যা বিদ্যমান। যেমন শহরের কলেজগুলোতে অপেক্ষাকৃত মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হয়ে যায়। শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান বা নিত্যনতুন সুযোগসুবিধাগুলোরও বেশিরভাগ নগরকেন্দ্রিক চিন্তাথেকে করা হয় বেশিরভাগ সময়। পক্ষান্তরে মফস্বলের কলেজগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা ভর্তি হয়ে থাকেন। সুযোগ সুবিধাও কম। দক্ষ শিক্ষকরাও শহরমুখী। কোন কোন ক্ষেত্রে এমন অভিযোগও আছে, নির্বাচনী পরীক্ষায় (টেস্ট) অকৃতকার্যদেরও বোর্ডের চূড়ান্ত পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। মফস্বলের কলেজগুলোতে নির্বাচনী পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সুযোগ না দিলেই পাসের হার অনেক বেড়ে যাবে বলেও মনে করেন অনেকে।

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড চট্টগ্রামের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাহবুব হাসান বলেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগর এবং আশপাশের এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল করেছে। কিন্তু জেলার মফস্বলের ফলাফলের অবস্থা খারাপ। মফস্বলের বিভিন্ন কলেজের খারাপ ফলাফল চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সার্বিক ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এবার বিজ্ঞানে ফলাফল খারাপ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন কোন ক্ষেত্রে মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিজ্ঞানের দক্ষ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব রয়েছে।

জিপিএ৫ পাওয়াতেও এগিয়ে নগর :

চট্টগ্রাম বোর্ডে এবার জিপিএ৫ পেয়েছেন ১৩৯১ শিক্ষার্থী। এরমধ্যে শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীর শিক্ষার্থী রয়েছেন ১২২৫ জন। এর বাইরে চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলায় ১১০ জন, কক্সবাজারে ৩৮ জন, খাগড়াছড়িতে ৪ জন, বান্দরবানে ১০ জন এবং রাঙামাটিতে পেয়েছেন ৪ জন।

গত ৬ বছরের চিত্র :

২০১০ থেকে ২০১৬। এই ছয় বছরেও চট্টগ্রাম বোর্ডে উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে পিছিয়ে ছিল মফস্বল। এর মধ্যে গতবার অর্থাৎ ২০১৬ সালে বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগের পাসের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় (চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলা) পাসের হার ছিল ৬০ দশমিক ২৩ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে ৪৭ দশমিক ১৪, খাগড়াছড়িতে ৫১ দশমিক ৭০ এবং বান্দরবানে ৬১ দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল। কক্সবাজার জেলায় পাসের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

২০১৫ সালে বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে শুধু মহানগরে পাসের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।কক্সবাজার জেলায় ছিল ৬৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটি জেলায় পাসের হার ছিল মাত্র ৪৩ দশমিক ৯১ শতাংশ। এছাড়া খাগড়াছড়িতে ৫০ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং বান্দরবানে ছিল ৫৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

২০১৪ সালে বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ০৬ শতাংশ। তবে বোর্ডের গড় পাশের তুলনায় বেশি ছিল মহানগরে পাসের হার। সেবার মহানগরে পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ছিল ৬৩ দশমিক ৯০ শতাংশ। কক্সবাজার জেলায় ছিল ৭২ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে ৫৯ দশমিক ৫২, খাগড়াছড়িতে ৬৩ দশমিক ২৮ ও বান্দরবানে ৬৫ দশমিক ২০ শতাংশ।

২০১৩ সালে বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৬১ দশমিক ২২ শতাংশ। শুধু মহানগরে পাসের হার ছিল ৭৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলার পাসের হার ছিল ৫২দশমিক ৭৯ শতাংশ। কক্সবাজার জেলার পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ৬১ শতাংশ। তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে ছিল ৪৯ দশমিক ০৪, খাগড়াছড়িতে ৪৬ দশমিক ৮৬ ও বান্দরবানে ৫৫ দশমিক ৪১ শতাংশ।

২০১২ সালে বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৭১ শতাংশ। কিন্তু শুধু মহানগরে পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ৬১ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ। কক্সবাজার জেলায় পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে রাঙামাটিতে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৭৮ এবং খাগড়াছড়িতে ৬২ দশমিক ৯৪ ও বান্দরবানে ৬৮ দশমিক ০৭ শতাংশ ছিল।

২০১১ সালে বোর্ডে গড় পাসের হার ছিল ৭১ দশমিক ০৩ শতাংশ। এরমধ্যে শুধু মহানগরে পাসের হার ছিল ৮১ দশমিক ১৫ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। কক্সবাজার জেলায় পাসের হার ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ। রাঙামাটিতে পাসের হার ৫০ দশমিক ৮২, খাগড়াছড়িতে ৫৫ দশমিক ৯৮ ও বান্দরবানে ৫৯ দশমিক ০২ শতাংশ।

২০১০ সালে বোর্ডের গড় পাসের হার ছিল ৭২ দশমিক ৬২ শতাংশ। তবে শুধু মহানগরে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ৮২ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলার পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। সেবছর পার্বত্য তিন জেলায়ও পাসের হার তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এরমধ্যে রাঙামাটিতে পাসের হার ৬২ দশমিক ১৯, খাগড়াছড়িতে ৫৩ দশমিক ৭৬ ও বান্দরবানে ৬০ দশমিক ২০ শতাংশ।

LEAVE A REPLY