বাংলাদেশের মহান জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তির সোনার ফসল ফলিয়েছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতা তথা মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত করতে জীবনযৌবন, ভোগআহলাদ কোরবানি দিয়েছেন। প্রতিজন বাঙালির ভেতরে তিনি দেশপ্রেম, দ্রোহের বারুদ গুঁজে দিয়েছেন। বাঙালির ইতিহাসে দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের সম্মিলনের একমাত্র সফল কারিগর তিনি। তাই জাতীয় ইতিহাসের পাশাপাশি বিশ্ব ইতিহাসেও বাঙালির রক্তাক্ত বিজয়গাঁথা সোনার অক্ষরে খোদাই হয়ে থাকবে অনন্তকাল।

বন্দর নগরী তথা চট্টগ্রামবাসীর দুর্দশা স্থায়ীভাবে মুছে দিতে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম থেকে নতুন করে পাঠ নেয়ার সময় এসেছে। বিশ্ব ইতিহাস কাঁপিয়ে দেয়া রাষ্ট্রনেতার সংখ্যা হাতেগোনা। এদের অন্যতম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামকে শুধু ভালবাসতেন না আত্মার সাথে একীভূত করেও নিয়েছিলেন। প্রমাণ, স্বাধীনতার বীজতলা তৈরির মহান কর্মযজ্ঞের উদ্বোধন হয় চট্টগ্রাম থেকে। স্বাধিকারের সড়ক ধরে স্বাধীনতার গন্তব্যে পৌঁছার মূলমন্ত্র ৬ দফা কর্মসূচি, প্রথম ঘোষিত হয় চট্টগ্রামেরলালদিঘি ময়দান থেকে। ছয় দফার মহাসড়ক বেয়ে ’৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে সামরিক জান্তার আরোপিত কঠোর নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের কাঁটাতার উপড়ে ফেলে ৯৮ শতাংশ ভোটে বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর নৌকা প্রতীককে অবিশ্বাস্য বিজয় এনে দেয়। ফলাফল ৭১ এর মার্চে ইয়াহিয়া জান্তার গণহত্যার রক্ত পিচ্ছিল পথ ধরে বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য অভ্যুদয়। দুর্ভাগ্য, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর বাঙালির দুর্জয় দেশপ্রেম, ঐক্য, মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে মাটি চাপা দেয়া হয়। পাকিস্তানকে নিশানা করে উল্টো হাঁটতে থাকে দেশ। অন্ধকারের দীর্ঘ অমানিশা পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নসমৃদ্ধির মহাসড়কে উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার হাত ধরে। অতীতের জরা ক্লেদ বিভ্রান্তির চাদর ছুঁড়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ইতিবাচক অবস্থান সুসংহত। কিন্তু উন্নয়নসমৃদ্ধির নবতর অভিযাত্রায় চট্টগ্রামের মত দেশের সবচেয়ে দামি সোনার চাবিটাকে ঠিকভাবে ব্যবহার করছেনা জাতীয় নেতৃত্ব। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চট্টগ্রামের সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছেন বলেই, চট্টগ্রামের নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম. . আজিজ, এম. . হান্নানদের আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতেন। চট্টগ্রাম বন্দর ও নগর উন্নয়নে ছিল তার বিশেষ মনোযোগ। তিনি জানতেন চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধি উন্নয়নের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে যাবে। কিন্তু ঘাতকের বুলেট চুরমার করে দেয় দেশবাসীর স্বপ্নের প্রাসাদ। বাংলাদেশকে জাপানসুইজারল্যান্ডের আদলে গড়তে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। চট্টগ্রামকে সিঙ্গাপুরের মত ব্যস্ততম আধুনিক বন্দর। কিন্তু হয়নি। বিশ্ব সমুদ্র বাণিজ্য রুটের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকেও চট্টগ্রাম বন্দর এবং নগরী অব্যবস্থাপনার গ্যাড়াকলে আটকে আছে। চট্টগ্রামের নাগরিকদের স্মরণকালের কঠিন দুর্ভোগ পাড়ি দিতে হচ্ছে। একদিকে অপরিকল্পিত মেগা প্রকল্পে খরচ হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে উন্নয়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জলযট, যানজট সঙ্কটে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে। মানব উন্নয়নের বহু সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশি ভারতের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু নাগরিক দুর্ভোগ তথা জলযট, যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আমরা ভারতের তুলনায় হাজার যোজন পিছিয়ে। এর জন্য নাগরিক তথা জনগণের জন্য নিবেদিত জননেতার অভাব যেমন দায়ী। তেমনি দায়ী কর্পোরেট ভোগবাদের নিষ্ঠুর ছোবল। দেশে জনগণের কল্যাণে নিবেদিত দেশপ্রেমিক জননেতার তীব্র আকাল চলছে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থের সুরক্ষাই হচ্ছে জননেতা এমনকী সুশীল বুদ্ধিজীবীদের প্রধান টার্গেট। নিজেদের স্বার্থ আড়াল করতে এরা ঠোটে জনসেবার জপশালা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন সর্বক্ষণ। প্রতিশ্রুতি এবং মুখরোচক কথামালার মোহজাল বিছিয়ে এঁটোকাঁটা লোভি পরিষদ নিয়ে গণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাই এদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। না হলে ভারতের ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাইয়ে আকস্মিক প্লাবনে জানমালের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির পর কীভাবে নগর দু’টো স্বল্প সময়ের মধ্যে নগরবাসীকে সংকট মুক্ত করেছে, নজির তো হাতের কাছেই আছে। চেন্নাই, ব্যাঙ্গালোরে নতুন নতুন খাল খননের পাশাপাশি বেদখলকৃত সকল খালনালা পুনরুদ্ধার করেছে নগর ও রাজ্য কর্তৃপক্ষ। আমরা কেন পারিনা। পারিনা এ’কারণে সাধারণ মানুষ বা নাগরিক দুর্ভোগের আঁচ আমাদের স্পর্শ করে না বলেই। সাধারণ মানুষ বা নাগরিক কল্যাণে নেতা, বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবীরা জনগণকে পরামর্শ দেন, দিক নির্দেশনা দেন। মিডিয়ায় প্রতিদিন তোলপাড় তোলেন। কিন্তু নিজেরা কখনো পায়ে কাদা লাগান না। বাতানুকূল কনভেনশান সেন্টারে বসে পরামর্শ বিলানো যত সহজ, ততটাই কঠিন নিজের বিলাসী অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভুক্তভোগী জনগণের দুঃখের সাথী হওয়া।

আমাদের অবস্থার সাথে ইংরেজি একটি প্রবাদের যথেষ্ট মিল আছে। তা হচ্ছে, ‘ওয়াটার ওয়াটার এভরিহয়্যার বাট নট এ ড্রপ টু ড্রিংক।’ আমাদের অসংখ্য নেতা, ভিআইপি বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ, পরিকল্পনাবিদ কিন্তু জনগণের প্রতি নিবেদিত ত্যাগী কোন দেশপ্রেমিক নেই। আত্মপ্রেমিক নেতাবিশেষজ্ঞের বহর যত বাড়ছে, ততই জাতির দেশপ্রেমিক খুদে অংশটা বিপন্ন প্রজাতির মত নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। বেশুমার বঙ্গবন্ধু প্রেমিকের কনুইর গুঁতোয় খাটি বঙ্গবন্ধু প্রেমিকেরা হাঁটুভাঙ্গা ‘দ’ হয়ে গেছেন। এ’অবস্থা আর চলতে দেয়া যায় না। চট্টগ্রামকে উঠে দাঁড়াতে হবে নিজস্ব শক্তির উপর ভর করে। চট্টগ্রামের সুপ্ত সম্ভাবনার কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধ ও নাগরিক বান্ধব নগর গড়তে চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিককে একাত্তুরের মত ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও জনকের মত চট্টগ্রামকে ভালবাসেন। কিন্তু তাঁর ভালবাসারআস্থার প্রতিটি ইট দিয়ে সুরম্য চট্টগ্রাম গড়তে চট্টগ্রামে জনদরদিদেশপ্রেমিক নেতার খরা ঘুচাতে হবে। এমন কাউকে উঠে আসতে হবে, যিনি কথায় নয়, কাজ দিয়ে প্রমাণ করবেন, জলযট, যানজটমুক্ত নাগরিকবান্ধব চট্টগ্রাম গড়তে তিনি সর্বস্ব ত্যাগে তৈরি। মাঠ এক্কেবারেই ফাঁকা। শুধু আত্মপ্রেমের বদলে দেশপ্রেমের কঠিন পরীক্ষায় যিনি উঠে আসবেন, নিশ্চিতভাবে তার পেছনে সকল নাগরিক কাতারবন্দি হবেন। নগরীর সকল খালনালা, পাহাড়, জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেবেন খাঁটি জননেতা। পার্থিব প্রাপ্তির চেয়ে বঙ্গবন্ধুর মতো জনগণের প্রাপ্তি ও চাহিদার প্রতি নিবেদিত নেতাকে জনগণ কখনো পিঠ দেখান না। তাই আমাদের এমন কোন নেতা যদি থাকেন, দয়া করে গতানুগতিক প্রটোকল ভেঙে কথামালার রঙিন বেলুন না উড়িয়ে সরাসরি আমজনতার কাতারে শরিক হোন। কর্মই নিশ্চিতভাবে আপনাকে স্থায়ীভাবে ইতিহাসের রেকর্ডবুকে লুফে নেবে।

LEAVE A REPLY