সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

একটি দুর্ঘটনায় বদলে যাচ্ছে দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষার চিত্র। ১৩টি পাহাড়ি পাড়ার এলাকাবসীর শ্রমে গড়ে উঠছে ক্ষেত্রপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ১৩ গ্রামে ৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও ৩০ কি. মি. পাহাড়ি জনপদে নেই কোন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কখনো যাত্রীবাহী বাসের ছাদ, কখনো চাঁদের গাড়িতে বাদুড় ঝোলা হয়ে দূরবর্তী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা। এসব দুর্গম গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা কিছু পথ পায়ে হেঁটে মুল সড়কে পৌছানোর পর যাত্রীবাহী বাসের ছাদে উঠে বিদ্যালয়ে পৌছায়। সময়মতো বাস না পেলে স্কুলে যাওয়া সেদিনের জন্য বন্ধ থাকে। এভাবে ঝূঁকিপূর্ণ যাতায়াতে কয়েকবার দুর্ঘটনার শিকার হলেও সর্বশেষ গত শনিবার দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে করুন মৃত্যু হয় জোড়াব্রীজ স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র অমর জীবন চাকমার। এ ঘটনা নাড়া দেয় পুরো এলাকায়।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রানের জন্য নিজেদের শ্রমে এবার এলাকাবাসী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। সামনের বছরের শুরুতে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করার প্রস্ততি নিয়ে এগুচ্ছেন স্থানীয়রা। বিদ্যালয়টির নাম দেওয়া হয়েছে ক্ষেত্রপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

গত শুক্রবার খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা সদর থেকে ৩২ কি. মি. দূরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাবাসী বিদ্যালয় নির্মানে স্বেচ্ছায় কাজ করছেন। বাঁশের বেড়া তৈরি, কাঠের খূটি ও মাটি কাটার কাজ করছেন এলাকাবাসী মিলে। ইতিমধ্যে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ অর্ধেক শেষ হয়েছে। স্থানীয় কার্বারী (পাড়া প্রধান) বিপ্রকান্তি চাকমা নিজেও কাজ করছেন। তিনি জানান, এ এলাকায় অনেক আগেই বিদ্যালয় নির্মাণ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা হয়ে উঠেনি। এবার অমরজীবন চাকমার মৃত্যুর পরে স্কুল নির্মাণে এগিয়ে আসে এলাকাবাসী।

জানা যায়, খাগড়াছড়ির দীঘিনালার কবাখালি ইউনিয়নের ক্ষেত্রপুর গ্রাম। যার অবস্থান দীঘিনালাবাঘাইছড়ি সড়কের মধ্যবর্তী এলাকায়। এ গ্রামের আশপাশে রয়েছে আরো ১২টি গ্রাম। এর মধ্যে ৭টি সরকারি ও ২টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ক্ষেত্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বটতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রদীপ কার্বারি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অনেন্দ্র পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পনছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রশিক্ষণটিলা বর্ডারগার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রান্যাবনছড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতাগীছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মারিশ্যাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

ক্ষেত্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উজ্বল কান্তি চাকমা ওরফে উদয়ন চাকমা জানান, এসব দুর্গম গ্রামের শিক্ষার্থীরা একদেড় ঘণ্টা পথ পায়ে হেঁটে পাঁকা সড়কে পৌছায়। এর পর অপেক্ষায় থাকতে হয় যাত্রীবাহী গাড়ির জন্য। যাত্রীবাহী গাড়িতে যায়গা না হওয়ায় শিক্ষার্থীও অধিকাংশই ছাদের উপরে ওঠে যাতায়াত করে। ছাদে ওঠানামার সময় প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীরা। তিনি আরো জানান, গত শনিবার পরীক্ষা শেষে জোড়া ব্রিজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বাসের ছাদে উঠে বাড়ি ফিরছিল ৬ষ্ঠ শ্রেণির অমর জীবন চাকমা। বাস থেকে নামার সময় নামার আগেই গাড়ি ছেড়ে দেয়। এসময় পা পিছলে পড়ে সে মারাত্মক আহত হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে সে মারা যায়। হত দরিদ্র পরিবারের মেধাবী ছাত্র অমর জীবনের মৃত্যু এলাকাবাসীর মনে গভীর দাগ কাটে। তখন থেকেই সবাই আলোচনা করে এলাকায় একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপনে সবাই একমত হয়। বিলম্ব না করে স্বেচ্ছাশ্রমে পাহাড় থেকে গাছ, বাঁশ সংগ্রহ করে বিদ্যালয় ঘর নির্মাণের কাজ আগানো হচ্ছে। করা হয়েছে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিও। শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রমও চলছে। বিদ্যালয় নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা উজ্বল কান্তি আরো জানান, নিহত স্কুল ছাত্র অমরজীবন তাঁর বিদ্যালয় থেকেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেছে। হতদরিদ্র পরিবারের এ শিশুটির করুন মৃত্যুই মুলত চোখ খুলে দিয়েছে এলাকাবাসীর।

স্থাপনাধীন বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতি পরুনাময় চাকমা জানান, এ এলাকার তিনদিকে তিনটি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিটির দুরত্ব ১৬ কিলোমিটারের বেশি। এত দূরে গিয়ে ছেলেমেয়েরা পড়ালেখা করছে। বিদ্যালয় স্থাপন অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল কিন্তু হয়নি। অমরজীবনের মৃত্যুতে এলাকাবাসি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে। মনুচন্দ্র চাকমা জমিও দিয়েছেন। নিরলসভাবে সবাই কাজ করে যাচ্ছেন। এখন চলছে শুধু বাঁশ খুঁটির কাজ। ছাউনিতে লাগবে অনেক টিন, সব মিলিয়ে আসবাবপত্রসহ এখনো অনেক কাজ বাকি। কাজ সম্পন্ন করতে সরকারি বা বেসরকারি সহযোগিতা পেলে নির্মাণ কাজ অনেক দ্রুতগতিতে শেষ করা যেত।

দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নবকমল চাকমা জানান, দীর্ঘ সে এলাকায় একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই, যা সত্যিই দুঃখজনক। এলাকাবাসীর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতে হয়। আর কিভাবে তাদের সহযোগিতা করা যায় সে চেষ্টা করা হবে। তবে এসব দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়ের পাঠদানের স্বীকৃতির জন্য সংশিহ্মষ্ট বিভাগের সদয় বিবেচনা থাকলে এলাকাবাসী উপকৃত হবে।

LEAVE A REPLY