আজাদী প্রতিবেদন

‘‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অবকাঠামোয় (রাস্তা, ড্রেন, কালভার্ট, সেতু) বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কর্তৃক নিজস্ব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে কর্পোরেশনকে অবগত না করে অসমন্বিতভাবে উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পাদন করছে। সংস্থাগুলোর সঙ্গে চসিকের কোনোরূপ সমন্বয় না থাকায় চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগসহ নানান সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সংস্থাগুলো চসিককে প্রকল্প বিষয়ে পূর্বে অবগত না করার ফলে অনেক সময় উন্নয়ন কার্যক্রমে ‘ওভারলেপিং’ হচ্ছে। চসিক এলাকায় সরকারের যেকোনো রূপ উন্নয়ন কার্যক্রম কর্পোরেশনকে অবগতকরণ পূর্বক সম্পাদন করলে চট্টগ্রামকে জনদুর্ভোগহীন পরিকল্পিত নগরে পরিণত করা সম্ভব হবে।’’

গত ৩ জুলাই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশারফ হোসেনের কাছে এক উপানুষ্ঠানিক পত্রে এভাবেই লিখেন চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এই উপানুষ্ঠানিক পত্র এটাই প্রমাণ করে, নগর উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয় নেই। নগরজুড়ে চলছে বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়নকাজ। নগরবাসীর সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম ওয়াসার পাইপ লাইন স্থাপনের কাজ চলছে। এতে খোঁড়াখুঁড়ি চলছে সড়কজুড়ে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টিঅ্যান্ডটির বিভিন্ন লাইন নিতেও সড়ক কাটা হচ্ছে। উন্নয়নের কাজের মধ্যে আছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ফ্লাইওভার নির্মাণকাজও। এসব উন্নয়নকাজের কারণে এই মুহূর্তে শহরের সড়কগুলোর অবস্থা খুব নাজুক হয়ে আছে। এদিকে সড়ক মেরামত না করায় নগরবাসী দায়ী করছে সিটি কর্পোরেশনকে। সংস্থাগুলোর পক্ষেও বলা হয়, সড়ক সংস্কারের দায়িত্ব চসিকের। আবার চসিক বলছে, অন্যান্য সেবা সংস্থাগুলোর চলমান উন্নয়ন কাজের জন্যই তাদের সংস্কার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। সেবা সংস্থাগুলোর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক দোষ চাপানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

শুধু চলমান উন্নয়ন কর্মকান্ডেই সমন্বয়ের অভাব, তা নয়। উন্নয়নকে ঘিরে যেসব প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে, সেখানেও সমন্বয়হীনতা লক্ষ্যণীয়। সম্প্রতি নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত তিনটি সংস্থার পৃথক প্রকল্পও সেই সমন্বয়হীনতার কারণে হয়েছে বলে মনে করেন নগরবাসী। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক দূরত্ব এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার কারণে উন্নয়নকাজ করার সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধাররা পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় না করেই নিজস্ব গতিতে উন্নয়নকাজ করে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ লোকজনই এর মাশুল গোনেন।

এদিকে নগর উন্নয়নে সমন্বয় করার জন্য ২০১৬ সালে একটি পরিপত্র জারি করেছিল সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক (প্রশাসন) . দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর স্বা রিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘সিটি কর্পোরেশনের অধি েতে্র সরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরের প্রধানগণ সিটি কর্পোরেশনের আমন্ত্রণে সভায় যোগদান করতঃ সভায় গৃহীত সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি সিটি কর্পোরেশনকে অবহিত করবেন।’ সিটি কর্পোরেশনের অধিক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন সেবাসংস্থার কাজে অধিকতর গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে সরকার এই সিদ্ধান্ত নেয় বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে এই প্রজ্ঞাপনের পর থেকে নগর ভবনের একাধিক সমন্বয় সভার আয়োজনও করেছিল চসিক। কিন্তু প্রতিটি সভায় পূর্বের সমস্যাগুলোই আবার চিহ্নিত করা হয়। অর্থাৎ সভা হলেও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। সেবাসংস্থাগুলোর সমন্বয়ে সর্বশেষ সভা হয়েছিল গত ২৩ মে। সভায় যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছিল, তার বেশিরভাগ ২০১৫ সালের ১২ আগস্ট অনুষ্ঠিত প্রথম সমন্বয় সভায়ও উত্থাপিত হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা সমন্বয় সভা করেছি। কিন্তু সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করলে তাদের (সেবা সংস্থাগুলো) বিরুদ্ধে তো আমি ব্যবস্থা নিতে পারব না। আমাকে সেই মতা দেয়া হয়নি। তবে এটা তো সত্য, শহরের বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে একমাত্র জনপ্রতিনিধি আছে সিটি কর্পোরেশনেই। তাই আমাদের প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও বেশি। আবার কোথাও কোনো হেরফের হলে মনে করে আমাদের ব্যর্থতা। তাই উচিত সিটি কর্পোরেশনের হাতকে শক্তিশালী করা। শক্তিশালী হলেই সমন্বয়টা ভালভাবে কার্যকর করা যাবে।

নগর উন্নয়ন কর্মকান্ডে সমন্বয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বন্দর ও জাহাজিকরণ বিষয়ক উপকমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ দৈনিক আজাদীকে বলেন, পরিকল্পনা ও উন্নয়নকাজ এগোনোর জন্য সমন্বয় অপরিহার্য। চট্টগ্রামে যেসব সেবা সংস্থা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সবার কোঅপারেশন দরকার।

সমন্বয় সভা হলেও সমন্বয় না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন তো সংস্থাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে না। তারা আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে। কিন্তু সৃষ্ট নাগরিকের দুর্ভোগের দায় অটোমেটিক সিটি কর্পোরেশনের ওপর চলে আসে।

চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চট্টগ্রামের মন্ত্রীদের সমন্বয় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইনগতভাবে তাদের কিছু করার নেই। কিন্তু তারা চাইলে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারেন। চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়নকাজ সিডিএ এবং সিটি কর্পোরেশন দুটো সংস্থা করে থাকে। দুটো আলাদা সংস্থা এবং পৃথক মন্ত্রণালয়ের। এ দুটো সংস্থার মধ্যেও সমন্বয় জরুরি।

এর আগে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ সমন্বয় সভায় তিনি বলেছিলেন, সমন্বয় ছাড়া কিছুই সম্ভব হবে না। প্রতিটি সরকারি সংস্থাকে একজন করে প্রতিনিধি করতে হবে, যিনি চসিকের সাথে সমন্বয় করবেন। শহরের ৮০ ভাগ সমস্যা অন্যান্য সংস্থার দ্বারা সৃষ্ট, মাত্র ২০ শতাংশ চসিকের দ্বারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২৯ জুলাই চসিক মেয়র বিভাগীয় প্রধানগণের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকে কর্মকর্তারা মেয়রকে জানান, সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় না থাকার কারণে অনেক সময় উন্নয়ন কর্মকান্ড বাধাগ্রস্ত হয়। এসময় মেয়র সংস্থাগুলোর চট্টগ্রামের প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করার নির্দেশ দেন। এরই প্রেক্ষিতে চসিকের সংস্থাপন শাখা সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ করে একই বছরের ১২ আগস্ট প্রথম বৈঠক করেন এবং ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ২৮ সংস্থার প্রধানগণ। বৈঠকে সেবা সংস্থাগুলোর কাছে ১২৪টি সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেছিলেন মেয়র, যার বেশিরভাগই এখনো পূরণ হয়নি।

সমন্বয়হীনতায় সৃষ্ট সমস্যাগুলো : চসিকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং নগরবাসীর সাথে আলাপকালে জানা গেছে, নগরীর বিভিন্ন খাল ও নালার উপর স্থাপিত ব্রিজ ও কালভার্টের তলদেশ দিয়ে ওয়াসার পানির পাইপ লাইন নেয়া হয়েছে। খাল ও নালাগুলো বার বার পরিষ্কার করার পরেও ভাসমান ময়লাআবর্জনা ওসব পাইপে আটকে গিয়ে খাল ও নালাগুলো পুনরায় ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে জলাবদ্ধতা নিরসনে চসিকের বিভিন্ন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় বলে বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছেন চসিকের প্রকৌশলীরা। তাদের দাবি, ওয়াসা পাইপ লাইনগুলো স্থাপনের সময় চসিকের সাথে সমন্বয় করে করলে এই সমস্যা হত না।

চসিকের কয়েকজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্র্তে দৈনিক আজাদীকে বলেন, নগরীর প্রবর্তক মোড় প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির পেছনের নালা, চকবাজার কাপাসগোলা জামতলা মসজিদ সংলগ্ন কালভার্ট, পশ্চিম ষোলশহর রেললাইন এলাকা, লালদীঘি আজিম ব্যারিস্টার বাড়ির পাশেসহ বিভিন্ন নালা ও খালের উপর স্থাপিত কালভার্টসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য কালভার্টের তলদেশে ওয়াসার পাইপ লাইন রয়েছে।

এদিকে জোয়ারের পনিতে শহরে নিচু এলাকাকে তলিয়ে যাওয়া যেতে রক্ষা করতে নগরীর বিভিন্ন খালের মুখে ুইস গেট নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। জলাবদ্ধতা নিরসনের ক্ষেত্রে চসিক কাজ করলেও ুইস গেট নির্মাণের এখতিয়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডের। কিন্তু সংস্থা দুটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে সমন্বয় না থাকায় স্লুইস গেট নির্মাণের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

একই সাথে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সাবেক মেয়রদের অভিযোগ ছিল, নির্দিষ্ট সময়ে কর্ণফুলী নদী ড্রেজিং করতে সংস্থাটি ব্যর্থ হয়েছে। ড্রেজিং না হওয়ায় কর্ণফুলী নদীতে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে গেছে। যা জলাবদ্ধতার জন্য অন্যতম দায়ী।

LEAVE A REPLY