কাপ্তাই,লামা ও উখিয়া প্রতিনিধি

প্রবল বর্ষণ ও পাহাড় ধসে পড়ায় সড়ক যোগাযোগে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে। এর ফলে কাপ্তাইঘাঘড়া, লামাফাঁসিয়াখালী ও কক্সবাজারটেকনাফ সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পানি উঠায় এবং মাটি জমে থাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এই কারণে ওই এলাকার যাত্রী সাধারণকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গত রোববার থেকে কাপ্তাইঘাঘড়া সড়ক ও সোমবার রাত থেকে অন্য দুটি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় বলে জানা যায়।

আমাদের কাপ্তাই প্রতিনিধি জানায়, গত তিন দিনের টানা বর্ষণে কাপ্তাইঘাঘড়া সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় একাধিক পাহাড় ধস হয়। পাহাড়ের বিশাল মাটি রাস্তার উপর জমা হয়। এর ফলে গত রোববার থেকে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কে যান চলাচল না করায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠে। স্থানীয় অংসুই প্রু মারমা বলেন মাটি সড়কের উপর এমন ভাবে জমে আছে গাড়ি চলাচল করাতো দূরের কথা পায়ে হেঁটেও যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছেনা। এই অবস্থায় কাপ্তাইরাঙ্গামাটিবান্দরবানরাজস্থলীর সাথে সড়ক যোগাযোগ স্থবির হয়ে পড়ে।

মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে এগিয়ে আসে কাপ্তাইয়ে অবস্থিত ১৯ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়ন। গতকাল (২৫ জুলাই) সড়ক থেকে মাটি সরাতে উদ্যোগ নেয় বিজিবির সদস্যরা। ১৯ বিজিবির উপঅধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান জানান, বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্ণেল মোহাম্মদ শহীদুল ইসলামের নির্দেশনায় বিজিবির সদস্যরা সড়কে জমে থাকা মাটি সরানোর কাজে নেমে পড়ে। মাটি অপসারণ করতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি ট্রাক্টরের সহযোগিতাও নেওয়া হয়। এদিকে ভারী বৃষ্টিতে কাপ্তাই চট্টগ্রাম সড়কের বিভিন্ন অংশেও ধস নামে। ধস যাতে বিস্তার লাভ করতে না পারে এবং নতুন কোন স্থানে যাতে ধসের সৃষ্টি না হয় সে জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের প থেকে সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছের বল্লি লাগিয়ে ধস ঠেকানোর চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। কোন কোন স্থানে বালুর বস্তা ফেলে ধস ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাপ্তাইয়ে অবস্থিত বেসরকারী পর্যটন কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রুবায়েত আক্তার আহমেদ বলেন এবার যেভাবে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে গত কয়েক বছর এরকম পরিস্থিতি আর হয়নি। এবার যে হারে পাহাড় ধস এবং সড়কে ধস হয় কাপ্তাইয়ের ইতিহাসে এরকম আর কখনো দেখা যায়নি। তিনি বলেন মাত্র ৬ মাস আগে কাপ্তাই থেকে লিচুবাগান পর্যন্ত ২০ কিলো মিটার সড়কের পুরোটাই কার্পেটিং করা হয়েছিল। সমগ্র রাঙ্গামাটি জেলার মধ্যে কাপ্তাইলিচুবাগান পর্যন্ত সড়ক ছিল সবচেয়ে উন্নত ও চলাচলে আরাম দায়ক। কিন্তু টানা বৃষ্টি এবং ভয়াবহ ধসের ফলে এই সড়ক এখন সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। সড়কটিকে এখন ঝুঁকিপূর্ণ বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এই সড়ক কবে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে পাবে তা সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা সম্ভব হয় নাই।

আমাদের লামা প্রতিনিধি জানান,

প্রবল বর্ষণের ফলে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে আবারো লামা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অব্যাহত বর্ষণের ফলে পাহাড় ধস ও বন্যার আশংকায় শংকিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। এদিকে, পাহাড় ধসে লামাফাঁসিয়াখালী সড়কে দিনভর সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় লামা ও আলীকদম উপজেলার যাত্রী সাধারণকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসে ২০টির অধিক কাঁচা ঘর বাড়ি বিধস্ত হয়েছে। তবে কোথাও কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায় নাই।

সূত্র জানায়, গত শুক্রবার থেকে টানা বর্ষণের ফলে উপর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মঙ্গলবার ভোর থেকে উপজেলার নিম্নাঞ্চল সমূহ প্লাবিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে লামা পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয়ে পড়ে। প্লাবিত এলাকা গুলোর মধ্যে রয়েছে লামা পৌরসভার নয়া পাড়া, লামা বাজারের একাংশ, নুনারবিল, লামা বাস স্ট্যান্ড, লামা থানা এলাকা, লাইনঝিরি, ছাগলখাইয়া ও শিলেরতুয়া। অপরদিকে, গজালিয়া, রুপসী পাড়া ও ফাসিয়াখালী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল সমূহ প্লাবিত হয়েছে। এসকল এলাকায় নদী তীরবর্তী ও ঝিরি সংলগ্ন এলাকায় ৫ থেকে ৮ হাজার মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। বন্যার আশংকায় শংকিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ লামা বাজারের ব্যবসায়ীরা। লামা বাজার ব্যবাসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাপান বড়ুয়া জানান, চলতি মৌসুমে তিন বার লামা বাজার প্লাবিত হয়েছে। এতে করে ব্যবসায়ীরা চরম তির সম্মুখীণ হয়েছেন। এবারো বন্যার আশংকায় সকলে শংকিত হয়ে পড়েছেন।

অপরদিকে, সোমবার গভীর রাতে লামাফাঁসিয়াখালী সড়কের বদুঝিরি এলাকায় সড়কের উপর বিশালাকারের পাহাড় ধসে পড়লে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল মঙ্গলবার দিনভর যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় লামা ও আলীকদমের সাথে চকরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার দু’পাশে শত শত বাসজিপ আটকা পড়ে। এসময় লামা ও আলীকদমের উদ্দেশ্যে দূরদূরান্ত থেকে আসা সাধারণ যাত্রী, শিশু ও মহিলাদের প্রবল বৃষ্টির মধ্যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। খবর পেয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার খিনওয়ান নু এবং লামা পৌরসভা মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে লামা পৌরসভার স্কেভেটর এর সাহায্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং ফায়র সার্ভিসের কর্মীদের সহায়তায় ধসে পড়া পাহাড়ের মাটি সরিয়ে বিকাল নাগাদ কিছুটা যানবাহন চলাচল উপযোগি করা হয়। এদিকে, মঙ্গলবার বিকালে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড় চূড়া ও পাদদেশে ঝুকিপূর্ণ বসবাসকারী নিরাপদে সরে যাওয়ার জন্য পৌর এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।

আমাদের উখিয়া প্রতিনিধি জানান, টানা বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলে সড়কের ওপর একাধিক স্থানে পানি উঠায় কক্সবাজারটেকনাফ সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে সোমবার রাত থেকে।

ঘূর্ণিঝড় মোরা পরবর্তী একাধিকবার অধিক বর্ষণ শেষ না হতেই গত ৫ দিন ধরে ফের ব্যাপকভাবে অতি বর্ষণ শুরু হয়েছে। এতে উখিয়ার নিদানিয়া, ঘাটঘর, সোনারপাড়া, সোনাইছড়ি, পাইন্যাশিয়া, জালিয়াপালং, চৌধুরীপাড়া, পশ্চিম মরিচ্যা, পাগলির বিল, পিনজিরকুল, তুতুরবিল, খয়রাতি, হরিণমারা, পশ্চিম রত্না, মালভিটা, হারাশিয়া, কুমারপাড়া, মাছকারিয়া, মধুরছড়া, টাইপালং, বালুখালী, রহমতেরবিল, থাইংখালী, পশ্চিম পালংখালী, আনজুমানপাড়া সহ অনন্ত ৩০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। উখিয়ার বিভিন্ন স্থানে গ্রামীণ সড়ক যাতায়াত ব্যবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। কক্সবাজারটেকনাফ সড়কের পানের ছড়া, ধেছুয়াপালং, চাইল্যাতলী, খুনিয়াপালং, উখিয়ার ঘাট, থাইংখালী, খারাংখালী সহ বিভিন্ন স্থানে সড়কের ওপর দিয়ে ঢলের পানি বয়ে যাওয়ায় সোমবার রাত থেকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উক্ত সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে জনদুর্ভোগ আরো চরম আকার ধারণ করেছে।

উখিয়ার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মোরা ও কয়েক দফায় অতি বর্ষণে এখানকার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক, রাস্তাঘাট ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের উখিয়ার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বা পিআইও মো. আহসান উল্লাহ জানান, উখিয়ার ৫ ইউনিয়নের কাঁচা সড়কগুলোর প্রায় স্থানে অকাল বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বিধ্বস্ত হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সড়কগুলোর অধিকাংশ স্থানে ঢলের পানির তোড়ে মাটি সরে গিয়ে ভেঙ্গে যায়। এতে গ্রামীণ এসব সড়ক দিয়ে জনচলাচল ব্যাহত হচ্ছে। গ্রামের কাঁচা সড়কে জরুরিভাবে মাটির কাজ করার মতো চলতি বর্ষাকালে সুযোগও নেই বলে জানান পিআইও।

গ্রামাঞ্চলের কাঁচা সড়কগুলো ইট বিছিয়ে, কার্পেটিং করে, ছোট ও মাঝারি কালভার্ট নির্মাণ পূর্বক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে এলজিইডি। উখিয়া এলজিইডি’র উপজেলা প্রকৌশলী মো. আব্দুল আলিম লিটন জানান, চলতি বর্ষার শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় ও একাধিকবার অতি বর্ষণে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ও জলাবদ্ধতায় এখানে গ্রামীণ রাস্তাঘাটের ব্যাপক তি হয়েছে। এসব গ্রামীণ রাস্তাঘাট জনচলাচল উপযোগী করে তোলার মত জরুরি মেরামত বা সংস্কার করার প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান না থাকায় কিছু করা যাচ্ছে না।

LEAVE A REPLY