চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছর পূর্ণ হলো গতকাল ২৫ জুলাই মঙ্গলবার। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। একই দিনে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকার দুই মেয়র নির্বাচনের অল্প ক’দিন পরই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারলেও চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে দায়িত্ব গ্রহণে প্রায় তিনমাস অপেক্ষা করতে হয়। পূর্ববর্তী মেয়র ও তার পরিষদের মেয়াদ শেষ না হওয়ায় এই অপেক্ষা।

দুই বছরে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সফলতা আর ব্যর্থতা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে নানা প্রতিবেদন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই দুই বছরের সফলতা বা ব্যর্থতার বিচার করবেন নগরবাসী। তবে অর্পিত দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পালনের চেষ্টা করেছি।

জলাবদ্ধতা, বিধ্বস্ত সড়ক ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ওয়াসাসহ সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহের উদাসীনতা, গাফিলতি ও সমন্বয়হীনতায় চট্টগ্রামে নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান সংস্থা দুই সংস্থা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মতৎপরতা নিয়ে নগরবাসী যতটা আশান্বিত, ততটা আশাহত।

চট্টগ্রাম মহানগরীতে জলাবদ্ধতা বর্তমানে ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। প্রায় ২০ বছর আগে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান করা হলেও সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাসমূহের কেউ তার যথাযথ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নে নগরীতে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও প্রত্যেকের দায়দায়িত্বের বিষয়গুলোও উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে আবাসনসহ অবকাঠামো উন্নয়নেও ২০ বছর আগে তৈরি মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে অপরিকল্পিতভাবে নগরীর বিকাশ ঘটেছে বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।

জানা গেছে, নগরীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ১৪ বছরে ব্যয় হয়েছে ৩০৪ কোটি টাকা। তারপরও প্রতি বর্ষায় পানিতে ডুবে যায় নগর। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের আগে জলাবদ্ধতা দূর করার প্রতিশ্রুতি মেলে। তবু জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মেলেনি নগরবাসীর। জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পও নেননি কোনো মেয়র। রুটিনওয়ার্ক করে সময় পার করেছেন তারা।

বর্তমান মেয়র দুই বছর আগে তার ৩৬ দফার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেও জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্বে দুই বছর থাকার পর তিনি বলছেন সেটি ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া’। তিনি বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া, পাহাড়ি ঢল, কাপ্তাই লেকের পানি ছেড়ে দেয়াসহ নানা কারণে বর্ষা মৌসুমে নগরবাসী জলাবদ্ধতার কবলে পড়ছেন। এজন্য এককভাবে তার ওপর দোষ চাপানো অবিচার হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বলা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনিও নতুন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেন নি। ২০১৪ সালে পাস হওয়া খাল খনন প্রকল্পও আলোর মুখ দেখেনি। এ বছর খনন কাজ শুষ্ক মৌসুমের পরিবর্তে বৃষ্টির মৌসুমে শুরু করায় জলাবদ্ধতা নগরবাসীর কাছে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে নগরীর পরিচ্ছন্নতায় মেয়র আ জ ম নাছির অনেকটা সফল বলে অনেকে মনে করেন। তাঁরা বলেন, পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতার দিকে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে নগরী ভালো অবস্থানে। বিলবোর্ড মুক্ত করে নগরীর সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। বিলবোর্ডের আড়ালে ঢাকা পড়েছিল নগরীর সৌন্দর্য। একটি মহল বিলবোর্ড নিয়ে বাণিজ্য করলেও কেউ এর বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করেননি। পুরো শহর এলইডি লাইটে আলোকিত করা হয়েছে। রাতে বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ‘ডোর টু ডোর’ বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচি চলছে। এ জন্য ৮ লাখ বিন দেয়া হয়েছে। ডাস্টবিনে কিংবা যত্রতত্র এখন ময়লা পড়ে থাকে না। নগরবাসী ঘরে বসেই বর্জ্য অপসারণের সুযোগ পাচ্ছে। ফুটপাত হকারমুক্ত করার পদক্ষেপ বাস্তবায়ন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। নগরবাসী যাতে নির্বিঘ্নে ফুটপাত ব্যবহার করতে পারে সে ব্যবস্থা হচ্ছে অচিরেই। হকারদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা বিকাল ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত ব্যবসা করতে রাজি হয়েছেন। বাকি সময় ফুটপাত হকারমুক্ত থাকবে।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের দায়িত্ব গ্রহণের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে আমরা তাঁর প্রতিশ্রুত অঙ্গীকারসমূহের বাস্তবায়ন চাইবো। নগরীতে ন্যূনতম ৩২টি সরকারি সংস্থা কাজ করে থাকে। তাদের প্রত্যেককে মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের আওতায় আসতে বাধ্য করতে হবে। একই সঙ্গে এদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।

LEAVE A REPLY