আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

গত ৫ এপ্রিল বুধবার ঢাকা গুলশানস্থ ইরান দূতাবাসে হযরত আলী (.) জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকাস্থ ইরান আল মোস্তফা বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানের আমন্ত্রণে এ অনুষ্ঠানে যোগদান করে দীর্ঘ সময় নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়। ঢাকা ইরান দূতাবাস এবং ঢাকাস্থ ইরান আল মোস্তফা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে মনে হচ্ছিল। আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী ()’র জন্ম বার্ষিকী আরও ক’দিন পরে হলেও ঢাকায় আইপিইউ সম্মেলনে যোগদান করতে আগত/আসা ইরানী পার্লামেন্ট প্রতিনিধি দলের সৌজন্যে এ অনুষ্ঠান ক’দিন আগে করা হয়।

গুলশানে মেয়ে বা ছেলের বাসায় উঠি বিধায় যথাসময়ে ঠিক ১০টার পর পর ইরান দূতাবাসে প্রবেশ করি। এতে অনেকের উপস্থিতি দেখে অবাক হই সময়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়ার কারণে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ইরানের রাষ্ট্রদূত ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) সম্মেলনে আগত ইরানী প্রতিনিধি দলকে নিয়ে দূতাবাসের ছোট হল রুমে প্রবেশ করেন। অবাক লাগল প্রতিনিধি দলের প্রধান ইরানের ঝানু পার্লামেন্টেরিয়ান জাফর জাদে হুইল চেয়ারে করে আসলেন। দেখে অনুমেয় তিনি ৭০ এর কম বেশি বয়সের একজন সক্ষম বৃদ্ধ। ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে যুদ্ধে তিনি দুই পা হারান। তারপরেও তার সাহসিকতার মধ্যে বলিষ্ঠ তৎপরতা ভাববার বিষয়।

প্রায় ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে অনুষ্ঠান শুরু হয়। উপস্থাপক ঢাকাস্থ ইরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাখার প্রধান মোহাম্মদ ইউনুচ আলী গাজী ফার্সি ভাষায় অনুষ্ঠান শুরু করলেন। প্রথমে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত স্বাভাবিক নিয়মে আরবিতে। অতঃপর ইরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাস্থ প্রধান ড. হাসান আমির আনসারী ১০/১৫ মিনিটের স্বাগত বক্তব্য রাখেন। এতে তিনি বাংলাদেশে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের উপর ব্যাখ্যা দেন। অতঃপর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশী শিক্ষক ও শিক্ষিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রতিবেদন পেশ করেন ফার্সি ভাষায়। প্রধান অতিথির বক্তব্যের আগে ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. আব্বাস বায়েজীও ফার্সি ভাষায় বক্তব্য দেন। এরই মধ্যে দু’বার করে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাস্থ ক্যাম্পাসের ছাত্র ও ছাত্রীরা ৫/৭ জন করে পৃথক পৃথকভাবে হযরত আলী (.) উপর ক্বচিদা পেশ করেন। আইপিইউ প্রতিনিধি দল থেকেও একজন বক্তব্য দেন। সবশেষে প্রধান অতিথি ইরানী পার্লামেন্টারিয়ান গ্রুপের প্রধান জাফর জাদে মঞ্চের উপর হুইল চেয়ারে বসে দীর্ঘ বক্তব্য দেন। এতে বলেন, আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে উৎসর্গ করতে গিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেও তিনি খুশি। তিনি ইসলামের কল্যাণে ত্যাগের গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

প্রায় দেড় থেকে দু’ঘন্টাব্যাপী এ অনুষ্ঠানের পুরোটাই ফার্সি ভাষার উপর। শুরুতে কুরআন তেলাওয়াত এবং বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে পবিত্র কুরআনের আয়াত বাদে বাংলা, ইংরেজি বা অন্য কোন ভাষা ব্যবহৃত হয়নি।

বস্তুতঃ ইরানের রাষ্ট্রীয় ভাষা ফার্সি। তবে দীর্ঘকাল ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয় ভাষা ফার্সি ছিল। এ দেশ থেকে ফার্সি ভাষা উঠে গেলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্সি বিভাগ চালু রয়েছে। এতদাঞ্চলে ১২০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফার্সি ভাষার প্রচলন শুরু হয় এবং তা দীর্ঘ ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অফিস আদালত, প্রশাসনিক কার্যক্রমে চালু ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে বাংলা বিহার উড়িষ্যায় ক্ষমতায় এলেও ইংরেজিতে লোকবলের অভাবে দীর্ঘ সময় তথা ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত ফার্সিকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ব্যবহারে রাখতে বাধ্য হয়। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ তথা সাদা চামড়ার কর্মকর্তাকর্মচারীদেরকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ফার্সি ভাষা শেখার জন্য উৎসাহিত করত। অতঃপর ১৮৩৭ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রীয় ঘোষণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফার্সি ভাষার স্থলে ইংরেজির প্রচলন হয়। তারপরেও ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত বড় বড় মাদরাসায় আরবির পাশাপাশি ফার্সি ভাষা শিক্ষা অব্যাহত ছিল। ফলে ভারতবর্ষে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের মধ্যে আরবির পাশাপাশি ফার্সির জ্ঞানে ভরপুর ছিল।

বর্তমানকালে আমাদের বাংলাদেশে সরকারিবেসরকারি বড় বড় মাদরাসাগুলোতে ফার্সি ভাষার উপর জ্ঞান অর্জন শূন্যের কোটায় নেমে আসছে। ধর্মীয় দিক দিয়ে আরবির পর ফার্সির গুরুত্ব স্বীকার করতে হবে। দেশে সামগ্রিকভাবে ফার্সির প্রচলন না থাকলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্সি বিভাগ চালু থাকায় ন্যূনতম হলেও আমাদের দেশে ফার্সি ভাষা জাগরুক থাকবে আশা করা যায়। এমনিতে আমাদের দেশ থেকে ফার্সি প্রচলন উঠে গেলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফার্সি শব্দের যে ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে তা সহজে উঠে যাবে মনে হয় না।

মাতৃভাষার পর আরবি, ইংরেজি, উর্দু কিছুটা জানা থাকলেও ফার্সির ব্যবহার থেকে দূরে থাকায় ইরান দূতাবাসে আয়োজিত এ দীর্ঘ অনুষ্ঠানটি উপভোগ করি। মনোযোগ দিয়ে ফার্সি ভাষার উপর বিভিন্ন বক্তব্য বুঝবার চেষ্টা করি।

ইরানীদের আতিথেয়তা প্রশংসার দাবিদার। এখানেও তাই দেখলাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে নাস্তা, পানি সরবরাহ, অনুষ্ঠান শেষে দুপুরের খাবার সরবরাহ তাদের আতিথেয়তার ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বস্তুত ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান প্রতিষ্ঠার পর থেকে সেদেশ দ্রুততার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের সভ্যতা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, অগ্রগতি নিয়ে তারা গর্ব করতে পারে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধেও ইরানকে থামিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

লেখক : গবেষক, কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক

LEAVE A REPLY