মীরসরাই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পাহাড়ে ঝুকিপূর্ণ বসতি সরানোর কার্যকর কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। ফলে পাহাড় ধসের আশঙ্কার সাথে সাথে প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। দৈনিক আজাদীতে গত ২৪শে জুলাই প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছরা, তালবাড়িয়া, পূর্ব দুর্গাপুর, রায়পুর, ওয়াহেদপুর, করেরহাট এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে যেসব ঝুকিপূর্ণ বসতি রয়েছে কেউ অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয়নি। ঝুকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে এখনো বসবাস করছে। উপরন্তু মীরসরাই সদর আমবাড়িয়া পাহাড়ে চরম ঝুঁকি নিয়েই পাঠদান চলছে একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। উপজেলার ১২ নং খৈয়াছড়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের গোভনীয়া বিটের পাহাড়ের পাদদেশে এই স্কুলটির অবস্থান।

শুধু মীরসরাই নয়, উপজেলা পর্যায়ে যে সব পাহাড় রয়েছে, সেগুলো থেকে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া জরুরি। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই কয়েকদিনের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও কক্সবাজারে পাহাড় ধসে অনেকগুলো প্রাণ ঝরে গেছে। বর্ষার দিন যেহেতু এখনো শেষ হয়নি, তাই সামনের দিনগুলোতে আরো বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, সেটাই স্বাভাবিক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাহাড় ধসে মৃতের সংখ্যা দুই শতাধিক। এর মধ্যে ২০০৭ সালের ১১ জুনে চট্টগ্রামের লেবু বাগানে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। আর ৮ বছরে বাকি প্রায় ৭০জনের প্রাণহানি হয়। গত ১১ জুন ১২৭ জনের মৃত্যুর এক দশক পূর্ণ হওয়ার দিনে পাহাড়ে ব্যাপক ধসের আশঙ্কা করেছিলেন পরিবেশবাদীরা। কারণ, গত ২৫ বছরে শুধু চট্টগ্রাম আর এর আশপাশেই কাটা হয়েছে প্রায় ২৮ হাজার পাহাড়। তাই পরিবেশবাদীদের এ আশঙ্কা সত্যে পরিণত হলো তার দুই দিন পরেই, পাহাড় ধসে ১৫৬ জনের প্রাণহানির মধ্য দিয়ে।

২০০৭ সালে ১২৭ জনের প্রাণহানির পর তৎকালীন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি পাহাড় ধসের ২৮টি কারণ চিহ্নিত করেছিল। পাহাড় রক্ষা এবং ধস ঠেকাতে প্রণয়ন করেছিল ৩৬ দফা সুপারিশ। দুঃখের বিষয় যে, গত এক দশকেও তার একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি।

বাংলাদেশে পাহাড় ধসে প্রাণহানিকে আর্থসামাজিক, পরিবেশগত এবং রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল এবং পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাতকারে তিনি পাহাড় ধসের কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়গুলো বালুময় পাহাড় এবং এসব পাহাড়ের ভেতরে অনেক ফাটল থাকায় অতিবৃষ্টির ফলে প্রাকৃতিকভাবেই ‘পাহাড়ের ফাটলে পানি ঢুকে ধস হতে পারে’। দ্বিতীয় কারণটি মানবসৃষ্ট, অবৈধভাবে প্রচুর পরিমাণ পাহাড় কাটার ফলে পাহাড় ধস হচ্ছে এবং পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী অনেকে মারা যাচ্ছেন। তিনি বলেন, পাহাড়ের বনে গাছ কেটে বন উজাড় করার কারণে এবং পাহাড়ের প্রচলিত কৃষি ব্যবস্থা জুম চাষের পরিবর্তে লাঙ্গলকোদালের চাষ করার ফলে ধস বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাহাড় কাটা, পাথর সংগ্রহ, গাছ কেটে রাস্তা করা, অপরিকল্পিত গৃহায়ণ ও আরো অনেক কারণে পাহাড়ে ধস নামে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে পাহাড়ের নিজস্ব বনভূমি বিলীন করে। তাছাড়া বিভিন্ন সময় সরকারিবেসরকারিভাবে দেওয়া হয় ইজারা। আর পরিবেশ অধিদপ্তর, বন অধিদপ্তর এবং অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য তো আছেই। সব মিলিয়ে পাহাড়ের এই প্রাণহানিকে কোনোভাবেই মৃত্যু বলা যাবে না। আর এ দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। সরকারের উচিত এখনি পাহাড় ধসের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। কারা কারা, কোন কোন অবস্থায় পাহাড় ধসের সঙ্গে জড়িত তা খতিয়ে দেখে নেওয়া। পাহাড় কাটা প্রতিরোধ সম্ভব হবে কেবল সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সজাগ দৃষ্টি আর সদিচ্ছা।

এ ছাড়া পাহাড়ের বাণিজ্যিক প্রকল্প বন্ধ করতে হবে। পাহাড় কেটে হাউজিং, শিল্প কারখানা স্থাপন বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে যে সকল অবশিষ্ট গাছপালা আছে তা রক্ষা করাসহ নতুন নতুন প্রচুর বৃক্ষরোপণ করে দ্রুত বনায়ন সৃষ্টি করতে হবে। পাহাড়ের পাদদেশে বসতি বা ঘর বাড়ি তৈরী বন্ধ করতে হবে। অবৈধভাবে পাহাড় কেটে কঠিন শিলা মাটির পরিমাণ হ্রাস করা বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় না দিয়ে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে সরকারকে।

LEAVE A REPLY