চবি প্রতিনিধি

কিছু অসাধু শিক্ষক প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, শিক্ষকরা হলেন আমাদের আদর্শ। আমাদের সকল অর্জন তাদেরকে ঘিরেই। কিন্তু কিছু অসাধু শিক্ষক আছে যারা টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন ফাঁস করছে। তাদের নৈতিকতা বোধ নেই। তারা ক্লাসে ঠিকমত পড়ান না। বাসায় প্রাইভেট পড়ান। তারা টাকার বিনিময়ে পরীক্ষার হলে উত্তর বলে দেন। গতকাল রবিবার বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ অডিটোরিয়ামে রাষ্ট্রপতি পদকে ভূষিত ৩৩ শিক্ষার্থীকে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, যাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস না হয় সে জন্য রাত জেগে পাহারা দিয়েছি। কিন্তু সকালে যখন ঘুমাতে যাই, ঠিক ওই সময়ে প্রশ্ন ফাঁস করছে কিছু অসাধু শিক্ষক। এসকল অসাধু শিক্ষকদের আর রেহাই দেয়া হচ্ছেনা। তিন বছর গোপন রেখে এখন পুলিশকে ধরতে ১১ পৃষ্ঠার ৭ম কলাম

বলেছি। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি প্রতিশোধের জন্য জাতির জনককে হত্যা করেছিল উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মোশতাক, জিয়া, এরশাদ দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। হাজার বছরের মূল্যবোধ আর ঐতিহ্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। তারা স্থায়ীভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য মানুষকে কিনেছে। তারা ন্যায়নীতিবোধকে নষ্ট করে দিয়েছে। ইতিহাসকে চাপা দিয়ে রাখা যায়না। মানুষ তা উপলব্দি করেছে। তাই তারা শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছেন। ২০০৮ সালের দিন বদলের কর্মসূচি অনুযায়ী আমরা দেশকে পরিবর্তন করছি। দারিদ্রদুঃখদুর্দশা লাঘব করছি। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দারিদ্রতাকে বিদায় দেওয়ার সময় এসেছে। আমাদেরকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান আর প্রযুক্তিগত শিক্ষার মাধ্যমে মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে ধরতে হবে। জঙ্গিবাদের বিষয়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা তরুণদের বিভ্রান্ত করেছে। ইসলাম শান্তি, মানবতা ও কল্যাণের ধর্ম। তাই ধর্ম কখনো জঙ্গিবাদকে ঠাঁই দেয়না। তরুণদেরকে জঙ্গিবাদ থেকে মুক্ত করতে সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক ও রচনা প্রতিযোগিতা মুখী করতে হবে। এ জন্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিয়ে বেশ কয়েকবার মিটিং করেছি। দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের জন্য এ জঙ্গি হামলা। জঙ্গিদের লাশ ৩মাস ধরে মর্গে পড়ে ছিল। কেউ তাদের লাশ নিতে আসেনি। ধ্বংসাত্মকরা তরুণদের বিপথে নিয়েছে। এ জন্য আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদের দায়িত্বশীল হতে হবে।

কারিগরি শিক্ষায় মনোযোগের তাগিদ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমাদেরকে কারিগরি শিক্ষায় ব্যাপক মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমানে এ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। উন্নত বিশ্বে এ ব্যবস্থায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী রয়েছে, এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুবই নগন্য। এসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলোকে জ্ঞান চর্চা, গবেষণা, আবিষ্কার এবং দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন বাড়ানোর আহ্বান জানান। তরুণদের গড়ে তুলতে মূল শক্তি হলেন শিক্ষকরা। এর জন্য তাদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। তাই তাদের নিবেদিত প্রাণ হয়ে ছেলেমেয়েদের গড়ে তুলতে হবে।’

কৃষি বিজ্ঞানের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘনবসতি আর মানুষ আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং বড় সম্পদ। দেশে বন্যা হয়েছে, আমাদের কারো সহোযোগিতার প্রয়োজন হয়নি। সরকার দায়িত্ব নিয়ে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছে। কৃষকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশে পরিণত করেছে। সরকার মানুষকে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ট্রেনিং দিয়েছে। আর মিঠা পানির মাছ চাষে আমরা বিশ্বে ৪র্থ স্থানে পৌঁছে গেছি। তিনি বলেন, ‘ভিশন ২০২১ ও ৪১’ এর জন্য আমাদেরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন প্রজন্মকে আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশের নির্মাতা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন বাস্তাবায়নে তরুণ প্রজন্মকে বিশ্ব মানের প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আধুনিক গুণগত শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শুধু আধুনিক জ্ঞান সম্পন্ন নয় পাশাপাশি দেশপ্রেমিক, সৎ ও নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষ গড়তে হবে।

আয়োজক ও প্রতিযোগীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিযোগিতা পুরস্কার টাটকা হওয়া উচিত। এত দেরিতে হলে অনুপ্রেরণা হারাবে। আর সার্বিক জীবনের বিকাশের অংশ এই রচনা প্রতিযোগিতা। শুধুমাত্র ক্লাস, শ্রেণী ক , সিলেবাস দিয়েই জীবন পরিপূর্ণ হবে না। বাহিরের জগত থেকে আমাদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। চারপাশের জগত থেকে জীবনমুখী শিক্ষা অর্জন করতে হবে। এসকল প্রতিযোগিতা তা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ছেলেমেয়ে সমান তাই উভয়ের জন্য দুইটি হল প্রয়োজন। এছাড়া একটি বিএনসিসি ভবনও প্রয়োজন। শতবর্ষ সামনে রেখে এবং প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা করতে হবে। এসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ কে এসকল প্রকল্প পাঠানোর পরামর্শ দেন। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল মুক্তির জন্য। আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু আমরা এখনো মুক্তি পাইনি। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির প্রয়োজন। মুক্তিযোদ্ধারা উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ দেশ পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই আমাদের লক্ষ্য।

উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার (তথ্য) মো. ফরহাদ হোসেন খানের সঞ্চালণায় অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. কামরুল হুদা, চবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মিহির কুমার রায়, ডিনস কমিটির আহ্বায়ক ও কলা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. সেকান্দর চৌধুরী, অফিসার্স সমিতির সভাপতি এ কে এম মাহফুজুল হক। এছাড়া পদক প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের পক্ষে অনুভূতি প্রকাশ করেন হুমায়ুন কবির ও রেজওয়ানা ইসলাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করেন সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা। কোরআন তেলাওয়াত করেন চবি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব হাফেজ আবু দাউদ মোহাম্মদ মামুন, গীতা পাঠ করেন রসায়ন বিভাগের প্রফেসর তাপসী ঘোষ রায়, ত্রিপিটক পাঠ করেন ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনন্দ বিকাশ ও বাইবেল পাঠ করেন ইংরেজী তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এঞ্জেলা ত্রিবেদি।

উল্লেখ্য, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজী রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ৩৩ শিক্ষার্থীকে এ পদক দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ১৭ জনকে স্বর্ণপদক এবং ১৬ জনকে টাকা ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

LEAVE A REPLY