শিক্ষা কৃষি ও শিল্পবাণিজ্যের মতো চলচ্চিত্র শিল্পেও সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ শিল্প মাধ্যমেও এগিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেছেন, ‘সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই ক্ষেত্রটাতে যেন আমরা পিছিয়ে না থাকি। এই ক্ষেত্রটায়ও যেন আমরা আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে পারি। এর জন্য, যা যা সহযোগিতা দরকারআমি কথা দিচ্ছি, আমি করব।’

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। বাংলাদেশের ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি সবকিছু ধারণ করে চলচ্চিত্র নির্মাণের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবেও যেন আমাদের এই শিল্পটা মর্যাদা অর্জন করতে পারে; সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।’ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে চলচ্চিত্রেও নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেন সরকার প্রধান।

আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অবদান চলচ্চিত্র। এটি চিত্ত বিনোদনের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম। চলচ্চিত্র সমাজ গঠনে, শিক্ষা বিস্তারে ও গণসচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বলা হয়ে থাকে, অসংখ্য গ্রন্থ যে শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারে না একটি চলচ্চিত্র তা সহজে পারে, যদি দক্ষতার বিষয়বস্তু ও নির্মাণ শৈলী উঁচু মাপের হয়। চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন মাধ্যম নয়, এর মাধ্যমে মানুষকে সৃজনশীল ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী করে তোলাও সম্ভব।

তবে দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বাংলা চলচ্চিত্রের সেই সোনালি যুগ আর নেই, এখন তা কেবলই অতীত। একটা দীর্ঘ সময় বাংলা চলচ্চিত্র চরম দুর্দিনে নিমজ্জিত ছিল। বর্তমানে সেই দুর্দিনের কালো খোলস থেকে উত্তরণের পথপরিক্রমায় রয়েছে আমাদের চিত্রজগত। উত্তরণ চেষ্টায় এখন পর্যন্ত যে অর্জন তা নিতান্তই নগণ্য। তাই রুচিশীল ও উচ্চ গুণগতমান সম্মত ছবি নির্মাণ জরুরি। অন্যথায় অবশিষ্ট সিনেমা হল বা প্রেক্ষাগৃহগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।

এক চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ বলেছেন, বাংলা চলচ্চিত্রকে হিংস্র বাঘের মত খামচে ধরেছে বিদেশি চলচ্চিত্র। এটার পিছনে কারণ আছে অনেক। এটা যে শুধু প্রতিবেশী একটি দেশের চলচ্চিত্রের হিংস্রতার পরিচয় বহন করে তা নয়। এটার জন্য আমাদের চলচ্চিত্রের হরিণী ভাবমূর্তিটাও কম দায়ী নয়। বাঘের চেহারা দেখলেই কিংবা শব্দ শুনলেই হরিণ যেখানেই থাকুক না কেন পৃথিবীর সব ভুলে যায়। চোখ বুজে দৌড়ে পালায়। বাঘ আসলে কী জিনিস, কী করে সেটা অনেক হরিণের বাচ্চা না জানলেও দেখা মাত্রই দিগ্বিদিকভাবে দৌড় আরম্ভ করে। কেননা সে এটা দেখে শিখেছে তার মায়ের কাছ থেকে। যুগের পর যুগ অবলা হরিণ এভাবেই বেচারি বাঘের হয়রানির শিকার হয়ে আসছে। বাঘের হাত থেকে বাঁচবার একমাত্র উপায় বলতে হরিণ দৌড়ে পালানো ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারে না। কখনও ভাবেনি পালানো ছাড়া বিকল্প কোনো রাস্তা আছে কিনা।

আমরা জানি, শিক্ষা বিস্তারে চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষাকে নিবিড়, যুগোপযোগী, সর্বজনীন, সহজবোধ্য, জীবনঘনিষ্ঠ এবং আনন্দময় করার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র অনবদ্য অবদান রাখতে পারে। সমাজের অশিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত মানুষদের কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা প্রদানের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম। চলচ্চিত্র একাধারে শিক্ষক, বন্ধু, জ্ঞানের ভাণ্ডার, বিনোদন ও সমাজ পরিবর্তনের মোক্ষম হাতিয়ার। চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা, কুরুচিপূর্ণ পোশাক, সন্ত্রাসী অভিনয় যেমন সমাজে প্রভাব ফেলে তেমনি প্রভাব ফেলে ইতিবাচক পরিবর্তনশীল রুচিশীল কর্মকাণ্ডের। ভালো চলচ্চিত্র একজন মানুষের পথ প্রদর্শক হতে পারে।

টেলিভিশন, সিনেমা, ভিডিও এসব যন্ত্রের পর্দায় যেসব ছবি দেখানো হচ্ছে, তার অধিকাংশই আমাদের মনমানসিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন। অপসংস্কৃতির কালো থাবা থেকে তরুণসমাজকে উদ্ধার করতে হলে, সমাজ দেহ থেকে অপসংস্কৃতির প্রভাব দূর করতে হবে। সবার আগে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। দেশের শিক্ষিত শ্রেণিকে সচেতন ও সোচ্চার হতে হবে এবং অনুকরণীয়দের আদর্শ ও স্বাধীন মতামতকে গ্রহণ করতে হবে। আমাদের জীবন গঠন ও উন্নয়নে সহায়ক নয়এমন সব বিদেশি কালচার বর্জন করতে হবে। চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের কাজ করতে হবে।

LEAVE A REPLY