সাখাওয়াত হোসেন মজনু

শিশু সাহিত্য চর্চায় অগ্রগামী চট্টগ্রাম। গত ২০ থেকে ২২ জুলাই ২০১৭ এই তিনদিন চট্টগ্রামে হয়ে গেলো ছোটদের বই মেলা, ছোটদের বইয়ের লেখক মেলা। ভাবা যায়। এই কঠিন কাজটি করেছে চট্টগ্রামের শিশু সাহিত্যের কর্মীসংগঠকরা। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিশু সাহিত্যকর্মীরা যখন বিষয়টি নিয়ে ভাবতেই পারছিলেন না তখন চট্টগ্রামের শিশু সাহিত্য একাডেমি ও স্বকাল শিশু সাহিত্য সংসদ এমন ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানটি করেই ফেললো। প্রমাণ হলো আবারো অগ্রগামী চট্টগ্রাম। এমন করেইতো ইতিহাস রচিত হয়। ছোটদের বইমেলা, ছোটদের বইয়ের লেখক মেলা এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলো। উল্লেখিত ৩টি দিনের সাথে স্থান হিসেবে শিল্পকলা একাডেমি চট্টগ্রামও ইতিহাসের স্থান হিসেবে চিহ্নিত। শিশুদের নিয়ে কথা বলা, শিশুদের নিয়ে লেখা খুব সহজ নয়। শিশুদের মনের সাথে লেখকের মনের ঐক্য সৃষ্টি না হলে শিশু সাহিত্য লেখা যায় না। শিশুদের জন্য কবিতা, গল্প, ছড়া এবং অন্যান্য বিষয় যারা লেখক তারা শিশু মনের কথা ভেবেই কিন্তু লেখেন। এজন্য তাদের প্রচুর লিখতে হয়, পড়তে হয়, শিশুদের মনের বাসনা জানতে হয়। এটা খুবই কঠিন কাজ। সব লেখকই কিন্তু শিশুকিশোরদের জন্য লিখতে পারেন না। তবে চর্চা ছাড়া শিশু সাহিত্য রচনা সম্ভব নয়।

: প্রসঙ্গটি নিয়ে শিশু সংগঠক, শিশু সাহিত্যিক রোকুনজ্জামান খান দাদা ভাইয়ের কিছু কথা বলতে চাই।

: এই বিখ্যাত মানুষটির সাথে আমাদের পরিবারের সখ্য সম্পর্ক ছিলো। তিনি ছিলেন আমার বড় মামা বিখ্যাত সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা চৌধুরীর বন্ধু। কচিকাঁচা করতেন। আমাদের বেপারিপাড়ার বাড়িতে আসতেন, স্থানীয় কচিকাঁচার আসরের সভ্যদের নিয়ে বসতেন, কথা বলতেন, মজার মজার ছড়া শেখাতেন, শোনাতেন। আমাদের বাসায় ছিলেন আবদুল মান্নান নামে একজন মানুষ। তিনি ছিলেন গৃহকাজের সহযোগী। তিনি কথা বলতেন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণে। দাদা ভাইকে দেখতাম সেই মান্নান ভাইয়ের সাথে চুটিয়ে আড্ডা দিতেন। তার মুখ থেকে যে ব্যতিক্রমী শব্দগুলো বেরিয়ে আসতো সেগুলো দাদা ভাই তাঁর ডাইরিতে লিখে নিতেন। সেগুলো দিয়ে দাদা ভাই মজার মজার ছড়া তৈরি করে আমাদের ঘরের শিশুকিশোরদের শোনাতেন। পরে শব্দগুলো আলাদা আলাদা করে আমাদের বলতেন আবদুল মান্নানের কথা থেকে এই শব্দগুলো তিনি সংগ্রহ করেছেন। আমরা যেমন মজা পেতাম তেমনি মান্নান ভাইয়া লজ্জা পেতেন। এই মজা এবং লজ্জাই ছিলো সাহিত্যের একটি উপপাদ্য বিষয় শিশু সাহিত্যের জন্য। আমরা যারা লিখি সবাই কিন্তু শিশু সাহিত্য লিখতে পারেন না, এটা কিন্তু ভিন্ন মাত্রার সৃজনশীলতা এবং বেশ জটিল। শিশুকিশোর উপযোগী শব্দ সংগ্রহ করা কি খুব সহজ? মোটেই না। প্রচুর পড়ালেখা, প্রচুর শব্দ ভাণ্ডার না থাকলে শিশুকিশোর উপযোগী সাহিত্য সৃষ্টি করা যায় না। ২০ থেকে ২২ জুলাই এই তিনদিন শিশু সাহিত্যিকদের কথা শুনে, তাদের লেখা পড়ে মনে হয়েছে তারা সবাই সঠিক কাজটির চর্চা করেই চলেছেন। নতুন নতুন শব্দ সংগ্রহ করে শিশুকিশোর পাঠকদের জন্য লিখে যাওয়া যেনতেনো বিষয় নয়। এমন কঠিন কাজের জন্য ছোটদের বইয়ের লেখকরা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন। চট্টগ্রাম শিশুসাহিত্য একাডেমি এবং স্বকাল শিশু সাহিত্য সংসদ এমন আয়োজন করে বাংলাদেশের মধ্যে চট্টগ্রামকে উচ্চ মর্যাদায় স্থাপন করেছেন।

: কথা হলো আমরা পারি

: হ্যাঁ, আমাদের পারতেই হবে। এমন উচ্চারণ যদি সঠিকভাবে স্থাপন করা যায় তাহলে না পারার কোন কারণই নেই। এই শিশু সাহিত্য সম্মেলনে ১১১ জন কবি, লেখক, শিশু সাহিত্যিক নাম রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এটা কি খুবই সহজ ছিলো? না তাতো নয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন অনেকে। তাঁরা দেখেছেন, শুনেছেন, বলেছেন, প্রকাশ করেছেন অনুভূতি। তাঁদের কথায় এবং উচ্চারণে বলেছেন, অন্য জেলায় যা হয়নি, অন্য জেলা প্রথম যা পারেনি চট্টগ্রাম তা পেরেছে। চট্টগ্রাম তা করিয়ে প্রমাণ করেছে, চট্টগ্রাম বুঝিয়ে দিয়েছেন চট্টগ্রাম অন্য মাত্রার জেলা। খুব প্রাচীন তথ্যের গোড়ায় না গিয়েও অন্ততঃ দুইশত বছরের চট্টগ্রামকে বিশ্লেষণ করলে প্রথম অনেক কিছুই চট্টগ্রামে প্রথম শুরু হয়েছে, সম্পন্ন হয়েছে। ১৭৫৮র হাবিলদার রজব আলীর বিদ্রোহ, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ মাস্টারদা সূর্যসেনের চট্টগ্রাম বিদ্রোহ, মহাত্মা গান্ধীর Chittagong to the fore মাহবুবউল আলম চৌধুরীর একুশের প্রথম কবিতা, চট্টগ্রামে প্রথম মহিলা সমিতির জন্ম (১৯৪১) ১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার প্রথম প্রকাশে ঘোষণা (১৯৬৬), বঙ্গবন্ধু শব্দটির জনক চট্টগ্রামের রেজাউল হক চৌধুরী মোশতাক, স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রথম প্রস্তাবের জনক শহীদ স্বপন কুমার চৌধুরী চট্টগ্রামের ছেলে, মুক্তি বিপ্লবীর সূচনা পর্ব চট্টগ্রাম, ৬ দফার বিপরীতে এক দফার সংগ্রামের প্রবর্তক এম এ আজিজ, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ চট্টগ্রামের জনতা সোয়াত জাহাজ, শিল্পী সাহিত্যিকদের প্রথম প্রতিরোধ চট্টগ্রামে, চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ গঠন, স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র গঠন চট্টগ্রামে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা প্রথম চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে এম এ হান্নানের কণ্ঠে ২৬ মার্চে, ২৭ মার্চে সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমানের কণ্ঠে, স্বাধীন বাংলার প্রথম প্রকাশিত দৈনিক আজাদী এগুলো চট্টগ্রামকে মর্যাদাবান করেছে এবং এখন ইতিহাসের অংশ হলো ঐ তিনটি দিন।

: এখন দায়িত্ব হলো।

: এই মর্যাদাবান দিনগুলোকে সম্মান ও মর্যাদার সাথে রক্ষা করা, যারা এমন আয়োজন করে চট্টগ্রামকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছেন তারা কিন্তু হাল ছাড়লে চলবে কেন? তাদের মাথায় এখন আগামী মর্যাদা রক্ষার বিশাল দায়িত্ব বর্তেছে। এটা রক্ষা করার দায়িত্বও তাদের। চট্টগ্রামের বাইরের সাহিত্যকর্মীরা এখন বলছেন, চট্টগ্রাম পেরেছে এবং চট্টগ্রামের সংশ্লিষ্টরা বলছেন চট্টগ্রামকে আবারো এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। কারণ সৃষ্টি করা খুবই কঠিন এবং সেই সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখা আরো কঠিন। তাই সংশ্লিষ্টদের ওপর আরো দায়িত্ব বেড়েছে। শিশু সাহিত্যের এই অঙ্গনকে বাঁচিয়ে রাখার ঝুঁকি এখন তো সংগঠকদেরই নিতে হবে। তাদের পিছিয়ে যাওয়া, স্থবির হয়ে যাওয়া বা অলস হয়ে বসে থাকার তো আর সুযোগ নেই। এখন শুধুই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পালা। মনীষীরা বলেছিলেন বিপ্লব ধ্বংস হয়, সৃষ্টির প্রসব বেদনামাত্র। তাই এই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন সন্তান জন্ম দেয়ার আনন্দ। এখন প্রসব ঘটে গেছে। এখন শিশুকে পরিচর্যা করে পালন করে বড় করা। এটাই এখন মুখ্য কাজ। কাজের মধ্যে থাকলে, চর্চার মধ্যে থাকলে, পরিচর্যার মধ্যে থাকলে চট্টগ্রামের শিশু সাহিত্য দেশের মধ্যে আরো প্রতিভা তুলতে পারবে। কথায় বলে ‘ব্রেইন স্ট্রমিং’ মেধার ঝড় যখন শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম থেকে তাহলে এটা এখন অন্য ব্রেইনে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে ঝড়ের ফসল হিসেবে আসবে আরো নতুন সৃষ্টি। উর্বর হবে চট্টগ্রামের ক্ষেত্র। এটার অপেক্ষায় আগামীর শিশু সাহিত্যিকরা এবং নতুন প্রজন্ম। ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা বাংলাদেশ শিশু সাহিত্য একাডেমি ও স্বকাল শিশু সাহিত্য সংসদকে।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

LEAVE A REPLY