এবার আমরা আশা করতে পারি যে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। উদ্যোগ নেয়া হবে সম্মিলিতভাবে। হাই কোর্টের রুল জারির পর সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় প্রত্যাশা করতে পারে নগরবাসী। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত রোববার বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাই কোর্ট বেঞ্চ এই রুল দেয়। স্থানীয় সরকার সচিব, গণপূর্ত সচিব, চট্টগ্রামের মেয়র ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যানকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরে দুই কারণে জলাবদ্ধতা হয়। এক. বৃষ্টি. দুই. জোয়ারের পানি। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য পর্যাপ্ত নালানর্দমা না থাকা, কিছু খালের কালভার্ট প্রয়োজনের তুলনায় ছোট, অনেক নালানর্দমা ভরাট ও দখল থাকার কারণে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। অন্যদিকে থাকে ওয়াসা, বিদ্যুৎ, টিঅ্যান্ডটি, গ্যাসের পাইপলাইনগুলোর অপরিকল্পিত সঞ্চালন। এগুলোও বর্জ্য আটকে পানির গতিপথে বাধা সৃষ্টি করে। আবার বৃষ্টির সময় জোয়ার থাকলে বৃষ্টির পানি উল্টো নগরে প্রবেশ করে।

তবু নগর পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জরিপে মহানগরে জলাবদ্ধতার জন্য বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। নগরীর মধ্য দিয়ে যে সব খালনালা নর্দমা রয়েছে সেগুলো বেদখল হয়ে গেছে। অতিবৃষ্টিতে কর্ণফুলী নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানি চাক্তাই খাল, ডোম খাল, হিজড়া খাল, নয়া মির্জা খাল, শীতল ঝর্ণা খাল, বামুননয়া হাট খাল, গুলজার খাল, বীর্জা খাল, ইছান্যা খাল, মাইট্টা খাল, লালদিয়ার চর খাল, ত্রিপুরা খাল, নাছির খাল, গয়না ছড়া খাল, কাট্টলী খাল, চশমা খাল দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করে থাকে। নগরীর মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৭টি খাল একশ্রেণির খালখেকোর কবলে পড়ে এখন নালায় পরিণত হয়েছে। এসব খালের আশপাশে বসবাসকারী লোকজন শুধু খাল ভরাট করে ভবন, দোকান তৈরি করে ক্ষান্ত হয়নি, খালগুলোকে আবর্জনা ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি দুর্যোগেদুর্ভোগ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মনুষ্যসৃষ্ট নানা অপতৎপরতাও। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ও সমন্বয়হীন উন্নয়ন, প্রকৃত সমস্যার দিকে নজর না দেওয়া এবং অপরিকল্পিত ও অপর্যাপ্ত উন্নয়ন বরাদ্দসহ নানা কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম মহানগর জুড়ে জলাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, আসলে নগর উন্নয়নে সত্যিকারের জনহিতকর পদক্ষেপ নেই। পূর্বসূরিদের মতো বর্তমান মেয়রও নগরীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত নেওয়া সকল উদ্যোগ তেমন জোরালো নয় এবং অবৈজ্ঞানিক।

যদিও জলাবদ্ধতা নিরসনে ইতোমধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত প্রকল্পের প্রস্তাবনা দিয়েছে চায়না পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সম্মেলন কক্ষে এই প্রস্তাবনার সার সংক্ষেপ উপস্থাপন করেছিলেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। এ সময় সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছিলেন, এক যুগেরও বেশি সময়ের এই সমস্যা নিরসনে আরো কিছু সময়ের প্রয়োজন হবে। চায়না পাওয়ার লিমিটেডের এই প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর হবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে, সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই অর্থ বরাদ্দ করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। আবার চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা স্থায়ী নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ছয় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ‘নান্দনিক চট্টগ্রামের নন্দিত নাগরিক’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেছেন, চট্টগ্রামের দুঃখ জলাবদ্ধতার সহসা স্থায়ী সমাধান হবে। এজন্য বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে এ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এ প্রকল্পে রিভার ড্রাইভ নির্মাণ করে কর্ণফুলী নদীর খালগুলোর মুখে স্লুইস গেট বসিয়ে পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্প হাউজ বসানো হবে। অতিদ্রুতই এ প্রকল্প একনেকে যাচ্ছে। টাকার অংকে এটি ৬ হাজার কোটি টাকার কম নয়। চট্টগ্রামে পানি যেন আর না ওঠে সেজন্য এ বড় প্রকল্প। এখানে টাকা নয়, চট্টগ্রামের মানুষের সমস্যা নিরসনই মুখ্য। কিন্তু এতো সম্ভাবনা ও পদক্ষেপের পরও সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বন্দর, টিএন্ডটি, বিদ্যুৎ, রেলওয়েসহ অভ্যন্তরীণ সংস্থাগুলোর মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় নেই। এ কারণেই জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের সকল সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে গত ১ অগাস্ট হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন মো. হানিফ। সেই রিট আবেদনটির শুনানি নিয়েই আদালত যে আদেশ দিয়েছে, আশা করি তা বাস্তবায়িত হবে।

LEAVE A REPLY