লিটন কুমার চৌধুরী, সীতাকুণ্ড

সীতাকুণ্ড উপজেলার বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূল ঘেঁষা বসতি জলদাসপাড়া। এই পাড়ার এক জেলে হরিপদ জলদাস। তাঁর দুই মেয়েনদী(১১) এবং কুয়াশা জলদাস()। নদী পঞ্চম শ্রেণিতে এবং কুয়াশা প্রথম শ্রেনিতে পড়ে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী অলিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার ওমর ফারুক ওই বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান বেশ কিছুদিন ধরে নদী জলদাস বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। নদী জলদাসের বিষয়ে শ্রেণি শিক্ষক তসলিম উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জানান, নদীর বাড়িতে আগেও একবার গিয়ে তাকে বিদ্যালয়মুখী করা যায়নি। পরে শ্রেনি শিক্ষককে সাথে নিয়ে ওই সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার জলদাস পাড়ার নদীর বাড়িতে যান। নদীর বাবা হরিপদ জলদাসের জীবন যেন জালে আটকানো। অমাবস্যাপূর্ণিমা তিথি, ইলিশের সাইজ, মহাজন আর জাল মেরামত নিয়ে যেন তার কারবার। নদীর পড়ালেখা নিয়ে ভাববার সময় হরিপদের নেই। মেয়ে বড় হয়ে গেছে, স্কুলের ইউনিফরম ছোট হয়ে গেছে এই অজুহাতে নদীকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন না তিনি। বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে বুঝানোর পর মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে অবশেষে রাজি হয়েছেন নদীর বাবামা। এভাবেই উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা সীতাকুণ্ডে ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলমুখি করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিস সুত্রে জানা যায়, গত ৫বছর আগে ঝরে পড়া শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০শতাংশের মতো। বর্তমানে এই সংখ্যা ১২শতাংশে নেমে এসেছে। উপজেলায় ৯৮টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি স্কুলেরই শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। পর্যাপ্ত বেঞ্চ না থাকায় শিক্ষার্থীরা ৯/১০জন এক সাথে বসে। এছাড়া শিক্ষার্থীর অনুসারে শিক্ষকের সংখ্যা অপ্রতুল। প্রতিদিনই স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভাল মন্দের খবর নিচ্ছেন শিক্ষা কর্মকর্তারা। অভিভাবকরাও তাদের সন্তানদের স্কুলমুখি করতে আগ্রহ বাড়ছে। উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার ওমর ফারুক জানান, স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে প্রথমেই কারা স্কুলে আসেনা তাদের বিষয়ে খবর নিচ্ছি। জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন মনে করে তাদের সন্তানেরা স্কুলে গিয়ে কি করবে? বড় হয়ে মাছ ধরার জন্য নদীতেই তাদের যেতে হবে। তাদের এই পুরোনো মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। অভিভাবকদের কাউন্সিলিং করা হচ্ছে। এতে আমরা সফল হচ্ছি। সীতাকুণ্ডের জেলে সম্প্রদায়ের শিশুরা এখন নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, পরিদর্শনে গিয়ে শিশুদের সাথে কথা বলতে ভাল লাগে। দৈনিক সমাবেশে শিশুরা হাত প্রসারিত করে শপথ নেয় শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলার। প্রতিদিন শিশুদের বিভিন্ন দেশীয় জাতের শাকসবজি খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেই। নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসার , মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা , দেশের ইতিহাস, কৃষ্টিসংস্কৃতির কথা বলি। বাথরুম ব্যবহারের পর এবং খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেই। শিশুরা উৎকর্ণ হয়ে শুনে। শিশুদের কার কি স্বপ্ন জানতে চাই। তাদের নানা রকম স্বপ্নের গল্প শুনি। সাধ্যমত শিশুদের স্বপ্ন পূরণের তরিকা বলে দেই। স্বপ্ন দেখি শিশুদের স্বপ্ন গুলো একদিন বাস্তবতার নাগাল পাবে। আজকের শিশুদের স্বপ্নের ডানা ধরে পাল্টে যাবে দেশ, আসবে সমৃদ্ধি এবং সুখ।উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরচ্ছোফা জানান, সীতাকুণ্ডে ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলমুখি করার জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা নিয়মিত পরিদর্শন করছেন। একজন শিশুই যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় তার জন্য স্কুলগুলো পরির্দশন করে শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। পারিবারিক ভাবে উদ্বুদ্ধকরণ সভা করছে। কেন তাদের সন্তানরা স্কুলমুখি হচ্ছেনা সে বিষয়ে অভিভাবকদের বুঝানো হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের স্কুলগামী করতে শিক্ষকদেরও বিশেষ ভুমিকা পালন করতে হবে। তিনি জানান, মানসম্মত শিক্ষা দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা বদলে দিতে পারে শিক্ষকরাই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম ভুইয়া বলেন, দারিদ্রতার কারণে অভিভাবকরা শিশুদের বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত করে দেয়। যার ফলে শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা যায়না। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অতীতের তুলনায় ঝরে পড়া শিশুদের সংখ্যা কমে আসছে।

LEAVE A REPLY