আজাদী প্রতিবেদন

শ্রাবণের ভরা পূর্ণিমায় জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। আর এগুলো আকারেও বড়। তাই রুপালি ইলিশের হাসি জেলেদের চোখেমুখে। এ রকম আরো কয়েক দফা ধরা পড়বে বলে আশা করছেন মৎস্য কর্মকর্তারা।

পাথরঘাটা ফিশারিঘাটেও বেড়েছে ইলিশের সরবরাহ। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ায় ইলিশের বাজারও বর্তমানে পড়তির দিকে। গত তিন দিনের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে আকারভেদে ইলিশের দাম মণপ্রতি কমেছে ৩ থেকে ৬ হাজার টাকা। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশ ধরা নিয়ে মৎস্য অধিদপ্তর কড়াকড়ি আরোপের কারণে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে।

গতকাল ফিশারিঘাট ঘুরে দেখা গেছে, রূপালি ইলিশের পসরা সাজিয়ে বাজারজাত করছেন আড়তদাররা। এখান থেকে ইলিশ যাচ্ছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও দেশের নানা প্রান্তে। এছাড়া নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাজির দেউড়ি, চকবাজার, বহদ্দারহাট কাঁচাবাজার, কর্ণফুলী মার্কেট, ষোলশহর কাঁচাবাজারসহ নগরীর খুচরা মাছ ব্যবসায়ীরা ইলিশ কিনতে ভিড় করছেন। এতদিন দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ ইলিশ কিনতে পারেননি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

ফিশারিঘাটের আড়তদার শামসুল আলম বলেন, গত তিন দিন ধরে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। স্বাভাবিকভাবে তাই দাম কমেছে। বর্তমানে বড় সাইজের ইলিশ মণপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ২২ হাজার টাকায়। তিন দিন আগেও তা ছিল ২৮ হাজার টাকা। এছাড়া মাঝারি সাইজের ইলিশ মণপ্রতি ৫ হাজার কমে এখন বিক্রি হচ্ছে ১৭ হাজার টাকায়। অন্যদিকে ছোট সাইজের দাম কমেছে মণে ৩ হাজার টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ১২ হাজার দরে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দাম আরো কমতে পারে বলে জানান তিনি।

সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ১০ বছর আগে দেশের মাত্র ২১টি উপজেলার নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে ১২৫টি উপজেলার নদীতে। জাটকা নিধন প্রতিরোধ কর্মসূচির শুরুতে চট্টগ্রামে একটি জেলে পরিবারকে প্রতি মাসে দেওয়া হয়েছিল ১০ কেজি চাল। কিন্তু এখন চাল দেওয়া হচ্ছে ৪০ কেজি করে। জাটকাবিরোধী অভিযান আগে বিক্ষিপ্তভাবে অভিযান পরিচালিত হলেও এখন সমন্বিতভাবে বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্ব পালন করছে। জব্দ জাল পোড়ানো হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে। এতে ইলিশের ব্যাপারে জনসচেতনতা বেড়েছে।

গত ১১ জুলাই চট্টগ্রামে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক বলেন, বর্তমানে ৬৭ হাজার ফিশিংবোট মাছ ধরায় নিয়োজিত আছে। প্রজনন সময়ে আহরণ বন্ধ রাখলে সারা বছরই মাছ পাওয়া যাবে।

মীরসরাই প্রতিনিধি জানান, শ্রাবণের ভরা পূর্ণিমায় মীরসরাইয়ের জেলেদের জালে ধরা পড়ল ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ। অবশেষে তাদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো। সারা দেশের পাশাপাশি এখানকার বাজারেও দেখা মিলল বড় বড় সাইজের ইলিশ। তবে এখানে দাম চড়া।

মীরসরাইয়ের সাহেরখালী ইলিশঘাটের জেলে পরিমল জলদাস জানান, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাস ধরে আমরা হতাশ ছিলাম। পুরো মৌসুমে জালনৌকা নিয়ে নদীতে গেছি। নামমাত্র ইলিশ নিয়ে ফিরেছি। কিন্ত গত কয়েক দিন ধরে আমরা ঝাঁকে ঝাঁকে মাঝারি ও বড় ইলিশ পেয়েছি।

মীরসরাই বাজারের ক্রেতা সুদর্শন রায় বলেন, বড় সাইজের একটা ইলিশ হাজার টাকার নিচে মিলছে না। এক কেজি হলেই হাজার টাকা। একটু ছোট হলে ৬শ থেকে ৭শ টাকা। আর ছোট হলে ৪শ টাকা।

মীরসরাইয়ের মৎস্য সম্পদ কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, শ্রাবণের ভরা পূর্ণিমা থেকে আরো কয়েক দফা ভালো ইলিশ পাওয়া যাবে আশা করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, মা ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করায় এখন আগের চেয়ে বড় সাইজের ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।

এদিকে দেশে ইলিশের সবচেয়ে বড় হাট চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটের আড়তগুলোতে দেশের সমুদ্র এলাকাসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইলিশের আমদানি প্রতিদিনই বাড়ছে। প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ মণ ইলিশ আসছে এখানে। যা বিক্রি হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। তাজা ইলিশ কিনতে ক্রেতারাও ভিড় করছেন। তবে চাঁদপুর ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের পদ্মামেঘনা তথা মিষ্টি পানির মাছ কম আসছে বলে জানান মাছ ব্যবসায়ীরা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০২০৩ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ইলিশের পরিমাণ ছিল এক লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৫১৬ অর্থবছর ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ ভাগই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। দেশের নদনদীতে ধরা পড়া মাছের ১২ শতাংশই ইলিশ। জিডিপিতে এর অবদান এক শতাংশ। এক মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় নদীর পরিবেশ, জাটকা সংরক্ষণ ও অভয়াশ্রম নিশ্চিত করতে পারলে বছরে ইলিশের বাণিজ্য হত কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এবার সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা যায়।

LEAVE A REPLY