চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজজট প্রকট আকার ধারণ করেছে। পণ্যবোঝাই জাহাজকে খালাসের জন্য বন্দরে দিনের পরদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে কনটেইনার ভাড়া বাবদ বন্দর ও জাহাজ কোম্পানিকে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। সময়মতো রফতানি পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। গত আড়াই মাসের বেশি সময় ধরেই বন্দরে জাহাজজটের এ চিত্র বিদ্যমান। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাহাজীকরণ প্রক্রিয়ার জটিলতা। রফতানি পণ্যের কনটেইনার না নিয়েই জাহাজ বন্দর ছেড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অতি সম্প্রতি এসব তথ্য দেশের পোশাক শিল্পের মালিকরা জানিয়েছেন বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়। খবরে বলা হয়, বিজেএমইএ ভবনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে পোশাক শিল্প মালিকরা জানান, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রেতারাও সময়মতো পোশাক পাবেন না। এর মাশুল দিতে হবে রফতানিকারকদের। এভাবে চলতে থাকলে ক্রেতা ভারত ও মিয়ানমার ইত্যাদি অন্যান্য পোশাক রপ্তানিকারকদের দেশে তাদের কার্যাদেশ সরিয়ে নিতে পারেন। এভাবে ক্রয়াদেশ হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন দেশের রফতানিকারকরা। তারা এই পরিস্থিতির জন্য সার্বিকভাবে বন্দরের সক্ষমতা ঘাটতিকেই দায়ী করেছেন।

আমরা জানি, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন শুধু দেশেই নয়, রয়েছে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য অঙ্গনেও। এ বন্দরে জাহাজ ভিড়তে ও পণ্য খালাস করতে অত্যধিক সময় লাগে। কাস্টমসের ঝামেলাও অনেক এবং শ্লথগতি সম্পন্ন। ফলে বিশ্বের যে কোন বন্দরের চেয়ে এখানে পণ্য আমদানি রফতানিতে ব্যয় অনেক বেশি হয়। ফলে জাহাজ ভাড়া ও বেড়ে যায় অনিবার্যভাবে। এতে পণ্যের দামও বেড়ে যায়। সর্বোপরি নাব্য সংকটে বর্তমানে আরো সংকুচিত হয়ে পড়েছেবন্দরের প্রবেশমুখ। প্রবল জোয়ার ছাড়া বন্দরের সব জেটিতে জাহাজ ভিড়তে পারে না। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি জাহাজকে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে বহির্নোঙরে। ১২দিন পর্যন্ত সময় লাগছে জেটিতে জাহাজ ভিড়তে। ফলে প্রতিমাসে ৮০ কোটি টাকা গড়ে বাড়তি খরচ হচ্ছে পণ্য আমদানিকারকদের। রফতানিকারকদের অবস্থাও একই। তার ওপর রয়েছে গুদাম সংকট। অব্যাহত কনটেইনার জটে বন্দরের দশা প্রায় বেহাল। জাহাজে পণ্য খালাস ও বোঝাই করতে কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ দিন লেগে যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ব্যবস্থাগত ত্রুটি থেকে জাহাজ ও কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার বা পণ্যবাহী জাহাজজটের জন্য শুধু বন্দর দায়ী নয়, ব্যবহারকারী ও বন্দরের সঙ্গে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোও অনেকাংশে সম্পৃক্ত। প্রায় ২০টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বন্দরের পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিকভাবে যুক্ত। কারণ গার্মেন্টসহ নির্দিষ্ট পণ্য আমদানি ও রফতানিতে এসব ডিপো বড় ভূমিকা রাখে। ডিপো থেকে রফতানি পণ্য যথাসময়ে বন্দর তথা জাহাজ না পৌঁছলে অপেক্ষাকাল বেড়ে যায়। আবার আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার যথাসময়ে ডেলিভারী নেয়া না হলে বন্দরের ভিতর নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থান পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এতে কনটেইনার জট সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন অদক্ষতা ও আনুষাঙ্গিক নানা কারণে এমনিতেই বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে ১১ শতাংশ পিছিয়ে গেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ভারত ও ভিয়েতনাম ৪০ শতাংশ এগিয়ে গেছে, যা বাংলাদেশের জন্য কোন অবস্থায়ই শুভ সংকেত নয়। বন্দরের বর্তমান কনটেইনার জটসহ অচলাবস্থা নিরসন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবল নিয়োগ, বিশ্বমানের বন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ, ট্রাফিক ব্যবস্থা, কনটেইনার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, আধুনিক ও দক্ষ অপারেশনাল ম্যানেজমেন্ট, বার্থ অপারেটরদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সংস্থান, স্ক্যানিং মেশিন, সিটি এমএস্‌ ও অ্যাসাইকুড়া সিস্টেমের ত্রুটিমুক্ত অপারেশন, কাস্টমস, পোর্ট ও আইসিডিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ে জোর দিতে হবে।

চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির হৃদয় হিসেবে বিবেচিত। দেশ ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, বিনিয়োগ, শিল্পায়নসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের নিবিড় সম্পর্ক, যা হাজার বছর ধরে বিদ্যমান। দেশের আমদানিরফতানি চাহিদা মেটাতে গিয়ে অনেক সময়ই চট্টগ্রাম বন্দর কুলিয়ে উঠতে পারছে না। প্রায়ই সৃষ্টি হচ্ছে বেসামাল পরিস্থিতির। এ জন্য সঠিক পরিকল্পনার অভাব ও যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া অনেকাংশে দায়ী। বন্দরের অনেক কারিগরী স্থাপনা ও যান্ত্রিক অবকাঠামো পুরানো ও সেকেলে। এ অবস্থার পরিবর্তনে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু যথাসময়ে তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের ব্যবসাবাণিজ্য, যা দ্রুত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। এ অবস্থার দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন দেশবাসীর কাম্য।

LEAVE A REPLY