হাসান আকবর

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ডিনার পর্ব সাঙ্গ হলো। এত রাজকীয় আয়োজনের ডিনার যে শেষ হয়েও হতে চায়না। খাওয়া দাওয়ার পরও আরো বহু কিছু থেকে যায়। এক কাপ কফি কিংবা একটু আইসক্রীম! হা হা হা। আমাদের মতো মোটা মানুষের জন্য আইসক্রীম নৈব নৈব। কিন্তু কফি? সরি, আমি যে রীতিমতো আসক্ত! তবে এখন কফি খেলে আর ঘুম হবে না। বেশ ভোরেই পথে নামতে হবে। পথের খুঁজে পথে নামার এই কষ্ট আসলেই কষ্টকর। তাই আর কফির কাপে চুমুক দিয়ে কিংবা আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করার সাহস করলাম না। যদি একটু ঘুমানো যায়! তাড়াতাড়িই ঢেরাই ফেরা ভালো। আমরা সদলবলে হাঁটতে শুরু করলাম। বেশ কিছুদূর হাঁটতে হবে। বিশেষ করে আমার রিসোর্টটি দ্বীপের একেবারে শেষ মাথায়। গাছ গাছালী এবং বনবনানীর ভিতর দিয়ে বহু পথ মাড়িয়েই আমার দরোজার কড়া খুলতে হবে। ভরপেটে কিছুটা পথ হাঁটা নাকি ভালো। তাই কিছুটা সান্ত্বনা নিয়ে হাঁটছি। যদি কিছু ভালো হয়!

আমরা সকলেই একই রাস্তা ধরে একই সাথে হাঁটা শুরু করেছিলাম। একে একে পথ ফুরিয়ে গেল সকলের। ভোরে পরস্পরকে জাগিয়ে দেয়ার আশ্‌্বাস দিয়ে একে একে সকলেই নিজেদের রিসোর্টের দরোজা খুললেন। রাস্তায় কেবল আমি। অদ্ভুত এক শূণ্যতা চারদিকে। বনের বুনো গন্ধটি আমাকে মাতোয়ারা করে তুলছিল। কী মায়াবী এক পরিবেশ! কি যে নান্দনিক আয়োজন! দ্বীপের বিচে একটি সাপের খোলস পড়েছিল। এখন এখানে কোন সাপ নেইতো! অবশ্য, সাপ থাকলেও কিছু করার নেই। কার্বোলিক এসিডের বোতল হেথায় হোথায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। সাপ থাকলেও তার ফোঁসফুঁসানি থাকবে না। কেবল পালাবে, কেবলই পালাবে।

পথ ফুরোলো এক সময়। পৌঁছে গেলাম ঘরে। শূন্য ঘর। কেউ কোথাও নেই। ধবধবে সাদা বিছানা। বিকেলেই মনে হয় ফ্রেশ করে দিয়ে গেছে। রুম সার্ভিসের লোকগুলো খুবই এক্টিভ। বলার আগেই অনেক কিছু বুঝে যায় তারা। করে যায়। রুমটিকে দারুণভাবে গোছানো দেখে এই নিশুতি রাতেও মনটি ভালো হয়ে গেল। এমন সাজানো গোছানো বিছানা আগোছালো করতে কষ্ট লাগে। তবুও

শুয়ে পড়লাম। ভোর চারটায় ওয়েকআপ কল দিলাম। লাগেজ বলতে আমার তেমন কিছু থাকে না। শুধু ব্যবহারের কাপড়চোপড়। ল্যাপটপ। ওসব গুছিয়ে রেখেছি। অতএব সকালে ঘুম ভাঙার সাথে পথে নামতে আমার কোন অসুবিধা হবে না। এডিটর স্যার (দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক) বেশ সকালেই ঘুম থেকে উঠতে পারেন। ম্যাডামও। সুতরাং স্যার এবং ম্যাডামকে নিয়ে চিন্তা নেই। আমার ওয়েকআপ কল গোলমাল হয়ে গেলেও স্যার অবশ্যই ফোন করবেন। সুতরাং মন ভরে ঘুমানোর উদ্যোগ নিলাম আমি।

ঠিক চারটায় ক্রিং ক্রিং করে টেলিফোন বাজতে শুরু করলো। ওয়েকআপ কল। ‘হ্যালো’ বলতে রেকর্ড করা একটি সুললিত কণ্ঠ থেকে জেগে উঠার আহ্বান জানানো হলো। আমি লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরীর রুমে ফোন করলাম। দৈনিক আজাদীর নির্বাহী সম্পাদক সানজিদা মালেক (সোনালী আপা) ধরে বললেন, ওনারা সব তৈরি। এখনি বের হবেন। স্যারের রুমেও ফোন করলাম। স্যার বললেন, গাড়ি ডাকা হয়েছে। লাগেজ পৌঁছে দেবে। আমাকে বললেন, তুমি ব্যাগ টানাটানি করার দরকার নেই। দরোজায় রেখে দাও। ওরাই ঘাটে পৌঁছে দেবে। বাহ্‌, বেশ আরাম তো! আমি লাগেজটি ঘরের দরোজায় ফেলে রেখে কাঁধের ব্যাগটি নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। অন্ধকারের মধ্যে আমার লাগেজ পড়ে থাকলো ঘরের দরোজায়। কেউ নিয়ে জঙ্গলের ভিতরে হাঁটা শুরু করলে আমার কিছু করার থাকবে না। তবে আশার কথা এ দ্বীপে তেমন কেউ নেই। তেমন কিছু করার সুযোগ নেই। পুরো দ্বীপটিই বুঝি সিসিটিভি নিয়ন্ত্রিত।

রিসিপশনের পাশে রেস্টুরেন্টটিতে আসলাম। ছোট্ট রেস্টুরেন্টটি আসলে ছোট্ট নয়। মোটামুটি। কিন্তু নাস্তার আয়োজন বিশাল। থরে থরে সাজানো রকমারি নাস্তা দেখে চোখ কপালে উঠার উপক্রম। আমার ধারণা ছিল পাউরুটি বা জেলি টাইপের কিছু দিয়ে তথাকথিত এক নাস্তায় আমাদের বুঝ দেয়া হবে। কিন্তু এখন দেখা গেল, হরেক রকমের খাবার। জুস থেকে শুরু করে ডিম সেদ্ধ এবং অমলেট, নুডলস, পাস্তা, খিছুড়ি, নান রুটি, পরটা, সবজি, মাংস। মনে মনে রাতের সেই তরুণীকে ধন্যবাদ দিলাম। এগুলো সামান্য আয়োজন। মেয়েটির বিনয় আছে বলতে হবে।

প্যারাডাইজ নানা ভাবে ব্যবসা করছে। কিন্তু এত কিছুর পরও মনে হলো গ্রাহক সন্তুষ্টিই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। গ্রাহকদের মন জয় করার সব কৌশলই তারা ভালোভাবে রপ্ত করেছে। আজ আমরা প্যারাডাইজ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। জীবনে আর কোনদিন তার কাস্টমার হবো এমন গ্যারান্টি নেই। ভবিষ্যতে কখনো আবার মালদ্বীপে গেলেও হয়তো অন্য কোন দ্বীপ দেখবো। নয়া কোন দ্বীপ। কিন্তু প্যারাডাইজ কর্তৃপক্ষ তা নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নন। একজন কাস্টমারের প্রতি সর্বোচ্চ যত্ন তারা দেখাচ্ছেন। ভোর সাড়ে চারটায় তারা আমাদের জন্য নাস্তার আয়োজন করেছেন। দায় সারা গোছের নাস্তা নয়, বেশ ভালো রকমের আয়োজন। আমরা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ নেই। এই হাজার হাজার টাকা নাস্তার পেছনে খরচ না করেও তারা পারতেন। আমাদেরকে দুয়েক টুকরো পাউরুটি বা জেলি দিয়ে দিলেও আমরা কিছু মনে করতাম না। এত সাত সকালে নাস্তা না দিলেও আমাদের কিছু বলার ছিল না। পৃথিবীর বহু দেশেই সকাল সাতটার আগে হোটেলের রেস্টুরেন্ট খোলে না। খালি মুখে হোটেল ছেড়ে বিমানবন্দরে ছুটেছি বহুদিন। অথচ প্যারাডাইজ যেন সত্যিই আলাদা। সত্যিই একটু অন্যরকম। কিছুটা তাড়া নিয়ে নাস্তা করলাম। নাস্তা শেষে কফিও। এই ভোর রাতে ধুমায়িত কফি! সত্যিই, অসাধারণ লাগছিল।

আলো ফুটার বহু আগে আমরা ঘাটে এসে পৌঁছলাম। সেখানে ইয়ট তৈরি। ইয়টের চালক এবং সহকারী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমরা একে একে ইয়টে চড়ে বসলাম। আমার স্যারের বড় মেয়ে ফাহমিদা মালেক, স্যারের শ্যালিকা গুলশান আকতার চৌধুরী রেহেনা, স্যারের ছোট মেয়ে সানজিদা মালেক, লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী এবং লায়ন নুরুল আবসারের পরিবার মিলে আমরা এগার জন। আর এই এগার জনকে নিয়েই ছুটলো ইয়ট। মহাসাগরের বুক জুড়ে আবছা একটি আলো। ছুটছিল আমাদের ইয়ট। গন্তব্য বিমানবন্দর।

তখনো সূর্য উঠেনি। তবে উঠি উঠি করছে। মহাসাগরের বুকে সূর্যোদয় দেখবো? মনটি নেচে উঠলো। পূর্ব আকাশ ক্রমে সাদা হচ্ছে। অন্ধকার বিদায় হচ্ছে। চারদিক ক্রমে আলোকিত হচ্ছে। প্রকৃতিতে চলছে নানা ধরনের রঙের খেলা। এগুলো আসলে বিরল সব দৃশ্য। ইচ্ছে করলেও দেখা যায় না। টাকা কড়ি খরচ করেও অনেক সময় সুযোগ হয়না। ভোর রাতে ভারত মহাসাগরের বুকে হাওয়া খাওয়ার সুযোগ আসলে সব সময় আসেনা। আবার কখনো এমনি এমনিতেই সুযোগ এসে দরোজায় কড়া নাড়ে। এই যেমন এখন নাড়ছে। ভারত মহাসাগরের বুকে ভাসছি আমরা। ঝিরঝিরে মাতাল করা এক হাওয়ায় ভরপুর চারপাশ। পূব আকাশে সূর্য উঠছে। ভারত মহাসাগরের বুকে সূর্যোদয়! ভাবা যায়!!

বিমানবন্দরের পাশেই এসে ভিড়লো আমাদের ইয়ট। রাস্তা পার হলেই টার্মিনালের গেট। ঘাটেই ট্রলি পেয়ে গেলাম। লাগেজ নিয়ে ঢুকে গেলাম টার্মিনালে। তেমন বড় কোন বিমানবন্দর নয়। টার্মিনালও তেমন আহামরি নয়। দোতলা টার্মিনালের নিচতলায় চেক ইন লাইন। আমরা গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা কাউন্টারের তরুণীর সামনে পৌঁছে গেলাম। এতক্ষণ সব কিছু ভালোয় ভালোয় হলেও মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো কিছু বুঝে উঠার আগেই। মুখ কালো হয়ে গেল লায়ন নুরুল আবসারের। একই সাথে আমাদের সকলের। নুরুল আবসারের টিকেট নাকি কেউ একজন ক্যান্সেল করে দিয়েছে। এখন আমরা সাতজন যেতে পারলেও আবসার এবং তার পরিবারের তিন সদস্য আজ ফ্লাই করতে পারবেন না। তাদের সিট নেই। শ্রীলংকান এয়ার থেকে ইমরান সাহেবকে খোঁজা হচ্ছে। নিশাত ইমরানকেও। ইমরান সাহেব হচ্ছেন আমার এডিটর স্যারের ভায়রা। ইমতিয়াজ ইমরান। তিনি স্যারের ছোট শ্যালিকা নিশাত ইমরানের হাজব্যান্ড। লায়ন ইমতিয়াজ ইমরান এবং লায়ন নিশাত ইমরান আমাদের সাথেই শ্রীলংকায় লায়ন্স ক্লাবের ইসামি ফোরামে যোগ দিয়েছিলেন। সাথে উনাদের পুত্র। ওনারা আমাদের একদিন আগে মালদ্বীপ আসেন এবং দুইদিন বেড়িয়ে দেশে ফিরে যান। ব্যবসায়িক কাজে সিংগাপুর যাওয়ার একটি তাড়া ছিল তাদের। এতে করে ইচ্ছে থাকলেও উনারা আমাদের সাথে মালদ্বীপে দুইদিন বেশি থাকতে পারেন নি। আগেই বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু এখন উনাদের খোঁজা হচ্ছে। কেন? কিছু মাথায় ঢুকছিল না। তবে যতটুকু বুঝলাম তাতে মনে হলো একই এজেন্সি থেকে একই সাথে টিকেট করা হলেও ইমতিয়াজ ইমরান এবং নিশাত ইমরান যে চলে গেছেন সেই তথ্য তাদের কাছে নেই। তৃতীয় বিশ্বের এয়ারলাইন্স! তাহলে শুধু শুধু আর বাংলাদেশ বিমানকে দোষ দিয়ে লাভ কী! আমরা জানালাম যে উনারা দুইদিন আগেই চলে গেছেন। উনাদের জন্য রাখা সিট তিনটির সাথে আর একটি বাড়িয়ে নুরুল আবসার এবং তার পরিবারকে দেয়ার অনুরোধ করলাম। শ্রীলংকান এয়ারের স্টেশন ম্যানেজারের সাথেও কথা বললাম। কিন্তু চারটি সিট ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেল। নতুন করে টিকেট করে হলেও লায়ন নুরুল আবসার আমাদের সাথে চলে আসতে মরিয়া। কিন্তু বিমানের ছাদেতো আর যাত্রী নেয়া যায়না!

লায়ন নুরুল আবসারের স্ত্রী, পুত্র এবং কন্যা মিলে চারটি সিট লাগবে। কিন্তু ফ্লাইটে কোন সিট নেই। ফুল লোড। কিছুই করার নেই। যার সাথে কথা বলছিলাম তিনিই হাত উল্টে দিচ্ছিলেন। কিছুই করার নেই। যাত্রীর খুব চাপ। টিকেট নেই। সিট নেই। আগামীকালও কোন সিট হবে না। পরের দিন যেতে হবে। অর্থাৎ আরো দুইদিন থাকতে হবে মালদ্বীপে। কি এক মহাযন্ত্রণা। আমরা টেলিফোনে আমাদের ট্যুর অপারেটর লায়ন আজিমের সাথে যোগাযোগ করলাম। তিনি নানাভাবে চেষ্টা করেও কিছু করতে পারলেন না। তবে লায়ন আজিম নুরুল আবসারকে এয়ারপোর্ট থেকে উদ্ধার করে পরবর্তী ফ্লাইটের আগ পর্যন্ত হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করলেন। এয়ারপোর্ট থেকে উনার লোক এসে নুরুল আবসারকে হোটেলে নিয়ে যাবেন বলেও আশ্বস্ত করলেন। কিন্তু নুরুল আবসারের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। তার মনের উপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কারো যেনো কিছু করার ছিল না। লায়ন নুরুল আবসারের পুতুলের মতো মেয়েটি হঠাৎ তার বাপকে প্রশ্ন করলো, ‘আমাদের রেখে কী আকবর আংকেল চলে যাচ্ছে ?’ আমার বুকের ভিতরে হু হু করে উঠলো। কিন্তু কারো কিছু করার নেই। আমি টিকেট ক্যান্সেল করে তাদের সাথে থেকে যেতে চাইলাম। কিন্তু আবসার না করলেন। বললেন, এখন চারটি টিকেট পাওয়া যাচ্ছেনা। পরে একই ফ্লাইটে পাঁচটি টিকেট পাওয়া এত সহজ হবে না! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

LEAVE A REPLY