মাসহুদা ইয়াসমিন

আকাশের নীলের মধ্যে একটা অদ্ভুত সারল্য আছে। অনেকটা ছোট শিশুদের চোখের মতো স্বচ্ছ, ঝকঝকে, কিন্তু নিবিড় মায়াময়। মনে হয় যেন, পুরো জগতটাকে সে ধারণ করে রেখেছে তার চোখ দুটিতে। অবলীলায় নিষ্পলক তাকিয়ে থাকা যায়। শিশুরা একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। আকাশ ঘুমায় না। অষ্টপ্রহর জেগে থাকে। ষড়ঋতুর এই দেশে একেক সময় একক রূপ ধারণ করে।

বিশাল আকাশ সবচেয়ে বিচিত্র রূপে ধরা দেয় বর্ষায়। এ সময় মাঝে মাঝেই তার রঙ পাল্টায়। যখন মেঘের দল অধিকার নেয় আকাশের। সাদা মেঘ, কালো মেঘ, ধূসর মেঘ, লালচে মেঘ, সোনালি মেঘ বর্ণালী মেঘেরা আপন মনে আকাশের নীলে বিচরণ করে। ওরা ভেসে ভেসে বেড়ায়। কখনো ধীরে ধীরে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে থাকে, যেন সখাসখি, পাশাপাশি চলছে আর গল্প করছে। কখনো তাদের চলার গতি খুব দ্রুত। এই ধাবমান মেঘের দিকে তাকালে মনে হয়, ওরা যেন কোথাও কথা দিয়ে রেখেছে, সময়মতো পৌঁছুতে না পারলে হুলুস্থূল কাণ্ড বেঁধে যাবে। কখনো বা তারা নিপাট ভালোমানুষের মতো সারা আকাশ ছেয়ে থাকে, স্থির, অঞ্চল।

মাঝে মাঝে আকাশের পরতে পরতে মেঘ জমে থাকে। মেঘের পরে মেঘ। হারিয়ে যায় আকাশের নীল। স্তরে স্তরে মেঘ ছুটে চলে পুব থেকে পশ্চিমে, কখনো পশ্চিম থেকে পুবে। এই আশ্চর্য চলিষ্ণু মেঘ দেখে অপার বিস্ময় জাগে। এই চলিষ্ণু মেঘই বুঝি বিরহী যক্ষের দূত হয়ে তার প্রিয়ার কাছে বার্তা নিয়ে গিয়েছিল সুদূর অলকা থেকে রামগিরিতে। ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার এমন মেঘ দেখেই হয়তো কবিতা লিখেছেন: ‘বলো মানুষ তুমি কী ভালোবাসো…/ আমি ভালোবাসি মেঘচলিষ্ণু মেঘ ঐ উঁচুতে ঐ উঁচুতে/ আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল!’

আষাঢ় আর শ্রাবণে মেঘ, বৃষ্টি, রোদ আর হঠাৎ হাওয়ার লুটোপুটিতে প্রকৃতি চঞ্চল হয়। আকাশের জমে থাকা মেঘ বাঁধ ভাঙা কান্নার মতো বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। হঠাৎ করেই চরাচরে নেমে আসে গাঢ় অন্ধকার। যেন দিনদুপুরে ঘনিয়ে আসে সন্ধ্যা। থেমে থেমে বৃষ্টি, বিরামহীন বৃষ্টি, অঝোর ধারায় বৃষ্টি। আহা! বৃষ্টির কতই না রূপ। গাছপালার রঙ টিয়ার পালকের মতো সবুজ। ছাদের কার্নিশে আশ্রয় নেয় জবুথবু চড়ুই, শালিক। আর কবিমন আনমনা। বিষণ্ন সুন্দরের ছোঁয়ায় শিহরিত। এমন ব্যাকুল বৃষ্টি, তুলনাহীন বৃষ্টিতে কার না মন বিষণ্ন হয়!

বর্ষা কবিমনে নতুন ভাবের সঞ্চার করে। সিক্ত হয় নিত্য নতুন ভাবরসে। প্রাচীন কবি জয়দেব থেকে শুরু করে আধুনিক কবিসাহিত্যিকরাও বিভিন্নভাবে বর্ষাকে এঁকেছেন তাঁদের রচনায়। মঙ্গলকাব্যের কবিরা বর্ষার দুঃখের চিত্র এঁকেছেন। মহাকবি কালিদাস মেঘের আবির্ভাব দেখেছিলেন ‘আষাঢ়ষ্য প্রথম দিবস’এ। কবি বর্ষায় প্রত্যক্ষ করেছেন অনন্ত বিরহ।

বাংলার কবিদের কাছে বর্ষা স্মৃতি জাগানিয়া ঋতু, বিরহের ঋতু। বর্ষার নির্জনতা, শান্ত বেদনাভারাতুর ভাবপরিবেশে কবিমন আচ্ছন্ন হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বর্ষায় কখনো উদাস, কখনো বিষণ্ন, কখনো বেদনা ভারাক্রান্ত। কবির আকুলতা: ‘মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে।/ আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে ’ … ‘দূরের পানে মেলে আঁখি কেবল আমি চেয়ে থাকি,/পরাণ আমার কেঁদে বেড়ায় দুরন্ত বাতাসে।’ আবার মেঘে ঢাকা আকাশ কবিমনে বিষন্নতার ছায়া ফেলে : ‘আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার,/ দিনের আকাশ মেঘে অন্ধকার হায় রে।’

মাঝে মাঝে গোমড়ামুখো আকাশে ঊর্ধ্বপানে তাকালে দেখা যায় দুচারটে ভুবন চিল। ওরা চক্রাকারে ওড়ে। ওড়বার সময় পাখা দুটো থাকে বিস্তৃত অথচ স্থির। মেঘভরা আকাশে ওরা ভেসে থাকে। কখনো ছাদের পিলার থেকে বেরিয়ে থাকা আধখানা লোহার শিকের মাথার ওপর একলা কোনো পাখি বসে থাকে চুপচাপ। কেন যে একা বসে থাকে?

এমনিভাবে কোনো কোনো দিন সারাটা সময় জুড়ে থেমে থেমে অথবা অবিরাম বৃষ্টি ঝরে। কোনোদিন সারা আকাশ মেঘের অধিকারে। সন্ধ্যের অনেক আগেই সন্ধ্যা নেমে আসে। নাগরিক বাতি জ্বলে শহুরে রাজপথে, অলিতে গলিতে। নিয়ন সাইন, দোকানপাট সবকিছু আলো ঝলমল। পাখিদের মধ্যে বাড়ি ফেরার তাড়া। ওরা সবাই পশ্চিম থেকে পুবে যায়। তবে কি ওদের সবার বাড়ি পুবে? একটা সময় কিছুই আর চোখে পড়ে না। শুধু মেঘলা আকাশ নিঃসঙ্গ। রাতে হয়তো ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামবে। শ্রাবণের মাস।

লেখক : প্রাবন্ধিক

LEAVE A REPLY