আরিফ রায়হান

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক ও মহাদার্শনিক। তাঁর বিস্ময়কর প্রতিভা ও নানামুখী চিন্তার অনন্যতায় বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পেয়েছে নতুন পথের সন্ধান। বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তাঁর জাদুকরি হাতের ছোঁয়া লাগেনি। বহুমাত্রিক জ্ঞানের বাতিঘর কবিগুরুকে অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত করা যায়। তিনি একাধারে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক, ছোটগল্পের স্রষ্টা, আধুনিক বাংলা নাটক ও নাট্যকলার জন্মদাতা, চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, অভিনেতা, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক ও সর্বযুগের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। এছাড়া তিনি গুরুদেব, কবিগুরু ও বিশ্বকবি হিসেবেও সমাদৃত। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলাআমি তোমায় ভালোবাসি’ এই হৃদয়স্পর্শী বাণীর রচয়িতা তিনি।

বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি বাঙালি জাতিকে শিখিয়েছেন আধুনিক বাংলা ভাষার ব্যবহার, ভাষাশিল্প, ছন্দ, সঙ্গীত, নাটক, মঞ্চ ভাবনা, সমাজ ভাবনা, রাজনৈতিক আদর্শ, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা বিষয়আশয়। সমাজ সংস্কারেও তাঁর ঋণ কখনও শোধ হওয়ার নয়। কবিগুরু আত্মনির্ভরশীলতা ও স্বাবলম্বনকেই ‘স্বদেশি সমাজ’এর মূল ভিত্তি হিসেবে মনে করেছেন। ১৯০৪ সালে জুলাই মাসে চৈতন্য লাইব্রেরীতে পঠিত কবিগুরু ‘স্বদেশি সমাজ’ প্রবন্ধে সরকারের পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা, শিক্ষা, সমাজ, ও শিল্পবাণিজ্য গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছিলেন। ওই সভায় বিপুল লোকসমাগম হয়েছিল। যা সামাল দিতে হিমশিম খেয়েছিল পুলিশ। মনীষী বিনয়কুমার সরকারের মতে, ‘যুবক বাংলা রবির মুখে স্বদেশি সমাজ শুনে নয়া দুনিয়ার সন্ধান পেয়েছিল। গৌরবময় বঙ্গবিপ্লবের অন্যতম সূত্রপাত এই বক্তৃতায়।’ স্বদেশি আন্দোলনের সূচনা থেকে কবিগুরু এ রকম বহু সভায় উপস্থিত হতেন।

১৯০৫ সালের ২৫ আগস্ট বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কলকাতার টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয় এক ঐতিহাসিক সভা। এই সভায় কবিগুরু ‘অবস্থা ও ব্যবস্থা’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। সভায় এতো লোকের ভিড় হয়েছিল যে, অনেকেই হলের ভেতর ঢুকতে পারেননি। যে কারণে এক সপ্তাহ পর আরো একটি সভার আয়োজন করা হয় এবং সেখানে কবিগুরু দ্বিতীয়বার প্রবন্ধটি পাঠ করে শোনান উপস্থিত সমাবেশকে। এই প্রবন্ধে কবিগুরু ইংরেজদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাদের মাসন বয়কট করার আহবান জানিয়ে লিখেন, ‘আর দ্বিধা না করিয়া আমাদের গ্রামের স্বকীয় শাসনকার্য আমাদিগকে নিজের হাতে লইতেই হইবে। চাষিকে আমরাই রক্ষা করিব, তাহার সন্তানদিগকে আমরাই শিক্ষা দিব, কৃষির উন্নতির আমরাই সাধন করিব, গ্রামের স্বাস্থ্য আমরাই বিধান করিব এবং সর্বশেষে মামলার হাত হইতে জমিদার ও প্রজাদিগকে আমরাই বাঁচাইব। এ সম্বন্ধে রাজার সাহায্য লইবার কল্পনাও যেন আমাদের মাথায় না আসেকারণ, এ স্থলে সাহায্য লইবার অর্থই দুর্বলের স্বাধীন অধিকারের মধ্যে প্রবলকে ডাকিয়া আনিয়া বসানো।’

এদিকে স্বদেশী আন্দোলনে কবিগুরু নারীদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন দেশের নারী সমাজের সহযোগিতা ছাড়া কোনো আন্দোলনই সফল হবে না। ১৩১২ বঙ্গাব্দে ‘ভাণ্ডার’ পত্রিকার ভাদ্র ও আশ্বিন সংখ্যায় প্রকাশিত ‘উদ্বোধন’ প্রবন্ধে নারী সমাজের সহযোগিতা কামনা করে লিখেন : ‘আমাদের মাতৃগণ, আমাদের ভগিনীগণ, আমাদের কল্যাণীয় কন্যাগণ, দেশ তোমাদের দিকে প্রসন্নতার জন্য চাহিয়া আছে। তোমরা প্রস্তুত হও। তোমরা প্রীত হও। তবেই দেশের নবজাগরণ সুন্দর হইবে। সম্পূর্ণ হইবে। পরম দুঃখের দিনে ঈশ্বর যে কল্যাণকে আমাদের দেশে প্রেরণ করিয়াছেন, তাহাকে তোমরা মাতৃরূপে, পত্নীরূপে গ্রহণ কর, বরণ করিয়া লও।’

দেশবাসীকে জাতীয়তার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার লক্ষে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বন্দেমাতরম্‌ সম্প্রদায়’। এর অন্যতম সহসভাপতি ছিলেন কবিগুরু। সপ্তাহের প্রতি রোববার প্রভাতে সম্প্রদায়ের সদস্যরা স্বদেশি সঙ্গীত গেয়ে গেয়ে পথ পরিক্রমায় বেরুতেন। তাদের সঙ্গে থাকতেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও অন্যরা। এছাড়া বাংলার বিপ্লব আন্দোলনের অন্যতম সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন কবিগুরু। তিনি এই সমিতির সদস্যদের শোনাতেন তাঁর রচিত গান : আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, ও আমার দেশের মাটি তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তোর আপনজনে ছাড়বে তোরে, আপনি অবশ হলি তবে বল দিবি তুই কারে, নিশিদিন ভরসা রাখিস ওরে মন হবেই হবে, আমি ভয় করবো না, ভয় করবো না, নাই নাই ভয় হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার, ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।

LEAVE A REPLY