মোঃ জয়নাল আবেদীন

(২২,৪৩৪)

ঘুটঘুটে অন্ধকারে মতিন চোরা বসে আছে। লুঙ্গি গুঁজে উদোম গায়ে সরিষার তেল মেখে তেলতেলে পিচ্ছিল হয়ে আছে। ধরা পড়লেও যেন ছাড়া পায় সহজে। মাথায় কোঁকড়া চুলের বাহার, চোখ দুটো সবুজ বর্ণের, নাকটা সুঁচালো, একতাড়া গোঁফ। আর খানিক বাদে বাদে তাতে আঙ্গুল চালিয়ে তা দেয়। তা দিতে দিতে গোঁফের অবস্থা হয়েছে দুই চোঙ্গাওয়ালা নৌকার মতো। হাতে চটের ব্যাগ। কিছু জোগাড় করলে এতেই রাখা হবে। মাথার ওপর গোলাকার চাঁদ। পূর্ণিমার আলোয় পথ ঘাট বাড়িঘর সুন্দর দেখা যাচ্ছে। মতিন চোরা বসে বসে এমন অবস্থার কথা কল্পনা করছে। একবার তো পূর্ণিমাতে চুরি করতে গিয়ে ধরাতো খেলো, সাথে চুল কামিয়ে রং লাগিয়েও দিয়েছিল। শঙ্কু আর বঙ্কু ভূত কড়ই গাছের আগায় বসে গল্প করছে। মাবাবা দুজনকে বাসায় রেখে খাবার আনতে গেছে। শঙ্কু ভূত চালাক আর বঙ্কু ভূত বোকা তবে অর্ধেক। বঙ্কুর হঠাৎ খিদে পায়। হাউমাউ করে বলে

শঙ্কু ভাই, আমার খুব খিদে পেয়েছে।” ‘আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, মাবাবা চলে আসবে।”

শঙ্কুর সান্ত্বনা কাজে দেয় না। ধীরে ধীরে গলার স্বর উঁচুতে উঠতে থাকে।

হ্যাঁ, হু হ্যাঁ হু অ্যা হু অ্যা হু ক্যা হু ক্যাহু

একি আওয়াজ! শঙ্কু ঘাবড়ে যায় ভাইয়ের এমন অদ্ভুত শব্দ শুনে। ভাইকে রেখে শঙ্কু নেমে যায় মাবাকে খুঁজতে।

বাড়িটা টিনের। একচালা টিনের ঘর তিনদিকে তিনটা। পূর্বদিকে খালি জমি। বাড়ির উঠোনে এক কোণে একটা কাঁঠাল গাছ, দুইটা পেয়ারা গাছ, আর কয়েকটা ফুলের চারা লাগানো। অপর কোণের দিকে একটি করে সুপারি গাছ। এরকম একটা বাড়িতে থাকে তিনজন। শঙ্কু ও বঙ্কুর মাবাবা যখনই এই বাড়িতে খাবার খুঁজতে আসে তখনই শুধু আলেয়া বেগম আর তার ছেলে সবুরকেই দেখে। তার স্বামী যে বেঁচে আছে তাকে কখনো একনজর দেখা হয়নি। এ কেমন স্বামীরে বউবাচ্চা রেখে রাতের আঁধারে আমাদের ভূতদের মতো ঘর ছাড়া হয়ে থাকে। মায়া হয় মাছেলের জন্য। তাই সবসময় কিছু না নিয়ে এই বাড়ি পার হয়ে অন্য বাড়িতে হানা দেয় তারা।

শঙ্কু হাঁটছে আর বিড়বিড় করছেআজকের রাতটা কত সুন্দর অন্ধকার! মনটা আমার ভালো হয়ে গেলো। সব সময় যদি এমন নিকষ কালো রাত পেতাম! হঠাৎ করে হোঁচট খেলো মতিন চোরার গায়ের ওপর। মতিন চোরা বসে থাকতে থাকতে পোল্ট্রি মুরগির মতো ঝিমাচ্ছিলো। মুহূর্তেই জেগে ওঠে পড়িমড়ি করে আশপাশে তাকালো। শঙ্কু তখন খুব সাবধানে নারকেল গাছের আড়ালে চলে গেল। মতিন চোরা আজ ঘুমের জন্য কাবু হয়ে পড়ছে।

চুরি করা আজকে হবে না তবে হয়েছিলটা কি একটু আগে? কাউকে তো দেখছি না। মনে হয় স্বপ্নে পড়েছি। মতিন চোরা উঠে বাড়ির পথে রওয়ানা দিল। শঙ্কু ভূত ভীষণ অবাক, চিকচিক করা শরীর মানুষের মতো দেখতে এটা আবার কোন গাছের ভূত। শঙ্কু ভূত পিছু নেয় মতিন চোরার।

আলেয়া বেগম তার ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দরজায় বসে অপেক্ষা করছে স্বামীর জন্য। কোনো এক ফাঁকে চোখ পড়ে শঙ্কু ও বঙ্কু ভূতের মাবাবার ওপর। একটা আস্ত ছাগল দুজনে কাঁধে করে নিয়ে উড়ে যাচ্ছে। আর তা দেখেই মতিন চোরার বউ মুহূর্তে অজ্ঞান।

বাড়ির উঠানে এসে চোখ কপালে ওঠে গেল মতিন চোরার। এক দৌড়ে বউয়ের কাছে যায়। গুন গুন স্বরে কেঁদে কেঁদে ডাকছে “ও সবুরের মা তুমার কী অইছে?

তুমি এমন কইরা শুইয়া আছো ক্যান?” তার পেছনে শঙ্কু অনেকটা এসে গেছে। মতিনের অবস্থা দেখে শঙ্কুর মায়া হয়। তবে কিছু না বলে ধীরে ধীরে তার কাছাকাছি এসে আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকে। এমন সময় শঙ্কু ও বঙ্কুর মা বাবা শঙ্কুকে দেখতে পায়। একটা মহিলা লাশ হয়ে পড়ে আছে। পাশে তার খুনি স্বামী এবং একটু দুরে তাদের পুত্র শঙ্কুকেও ধরে এনেছে। এমন চিন্তা করতে করতে তারা মতিন চোরাকে না বুঝেই মুহূর্তের মধ্যে আঘাত করে ক্ষত বিক্ষত করে দিল।

LEAVE A REPLY