শুকলাল দাশ

বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। নগরীর বিশাল এলাকায় অনেক দিন থেকে সকালের রান্নার আয়োজন শুরুর আগেই নিভে যায় গ্যাসের চুলা। তারপরও মাসের পর মাস পরিশোধ করতে হয় গ্যাসের বিল। এর মাঝে আবার বাড়ানো হল গ্যাসের বিল। গড়ে ২২ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার, যা কার্যকর হবে মার্চ ও জুন মাসে দুই ধাপে। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ানো হয়েছে আবাসিক গ্রাহকদের। কিন্তু গ্যাস সংকট সবচেয়ে বেশি আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে। আগামী ১ মার্চ থেকে এক চুলার জন্য মাসে ৭৫০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ৮০০ টাকা দিতে হবে, যা এতোদিন ছিল ৬০০ টাকা ও ৬৫০ টাকা। আর দ্বিতীয় ধাপে ১ জুন থেকে এক চুলার জন্য মাসিক বিল ৯০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য হবে ৯৫০ টাকা। সে হিসাবে বাসাবাড়িতে প্রতিটি গ্যাস সংযোগের জন্য গুণতে হবে বাড়তি ৩০০ টাকা।

দিনরাত ২৪ ঘণ্টায় যে কয়বার গ্যাস আসা যাওয়া করে তাতে কোনো বেলার রান্নাই ঠিকভাবে করতে পারেন না বলে জানিয়েছেন, হালিশহর এলাকার উন্নয়ন কর্মী শিরীন শারমিন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, চুলাই জ্বলে নাতারপরও মাস শেষে কেন এতো টাকা ? সকালের নাচ্চা জুটে না অনেক দিন থেকে। গ্যাস থাকে না বলে ঘরে তৈরি হয় না দুপুরের খাবারও। রাত ১০টায় গ্যাস এলে সারাদিনের রান্নার কাজ শুরু হয়। তিনি বলেন, গ্যাসের বিল নেয়া হচ্ছে মাসিক ভিত্তিতে। কিন্তু দিনে ১২/১৩ ঘণ্টা গ্যাস না থাকলে ৩০ দিনের মাসের বেশ অর্ধেক সময়ই তো গ্যাস থাকলো না। এখানে পুরো মাসের বিল নেওয়ার যৌক্তিকতা কী? কেনই বা গ্রাহক সে বিল দেবে? তার দাবি, প্রতিদিন যতক্ষণ গ্যাস থাকে নাসেই হিসেবে মাস শেষে যত ঘন্টা গ্যাস ছিল না তার টাকা বাদ দিতে হবে। সারাদিনে যতক্ষণ গ্যাস জ্বলবে সেই পরিমাণে বিল নেয়া উচিত।

খবর নিয়ে জানা গেছে, নগরীর জামালখান, মোমিন রোড, হেমসেন লেইন, ঘাটফরহাদবেগ, খলিফাপট্টি, বাকলিয়া ডিসি রোড, বগারবিল, বাকলিয়া শান্তিনগর, চকবাজার, কাপাসগোলা, বাদুরতলা, পাথরঘাটা, ফিরিঙ্গী বাজার, এনায়েত বাজার এলাকায় গ্যাসের সংকট লেগে আছে অনেক দিন ধরে। দিনের বেশির ভাগ সময় এ সব এলাকায় গ্যাস থাকে না। এদিকে বন্দরটিলা, মধ্যম হালিশহর, দক্ষিণ হালিশহর, পতেঙ্গার বিশাল এলাকা জুড়েও একই হাহাকার। এ সব এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন সকাল ৬টার দিকে ধীরে ধীরে চাপ কমতে থাকা গ্যাস সারাদিন উধাও থাকার পর বিকাল ৪টার দিকে আসে মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য। এরপর আবার তিন ঘণ্টা উধাও থেকে রাত ১০টার দিকে ফিরে এলেও তা গৃহস্থালির কোনো কাজে আসে না।

লালখান বাজার এলাকার গৃহিনী শায়েলা শাহেনা বলেছেন, ‘যে গ্যাসে প্রয়োজন মেটে না, তার জন্য মাসে মাসে এতো টাকা দেওয়ার যৌক্তিকতা খুঁজে পাই না’। এ ব্যাপারে কর্ণফুলী গ্যাস কোম্পানী লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, নগরীতে আবাসিক খাতে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আগে চট্টগ্রামে আমরা প্রতিদিন ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেতাম। ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পেলে আবাসিকে কোনো সংকট থাকে না। গত প্রায় এক মাস ধরে কর্ণফুলীকে দেয়া হচ্ছে দেয়া হচ্ছে ২২৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে থেকে কাফকোকে দিতে হচ্ছে ৪১ মিলিয়ন ঘনফুট, সিইউএফএল চালু হওয়াতে সেখানে দিতে হচ্ছে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। আবাসিক খাতে মাত্র ১৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেয়া সম্ভব হচ্ছে। এই কারণে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের। কিছুদিন পরপর আবাসিক খাতে গ্যাসের সংকট লেগেই থাকে। মহেশখালীর মাতারবাড়িতে ভাসমান এলএনজি গ্যাস টার্মিনাল থেকে আনোয়ারা হয়ে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট কাটবে না বলে জানিয়েছেন কর্ণফুলী গ্যাসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মহেশখালীতে নির্মিতব্য এলএনজি গ্যাস টার্মিনাল থেকে ২০১৮ সালের শেষের দিকে গ্যাস চট্টগ্রামে আসবে বলে জানিয়েছেন এই প্রকল্পের সংশিষ্ট প্রকৌশলীরা।

তারা জানিয়েছেন, চট্টগ্রামে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু আমদানিকৃত এলএনজি গ্যাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হবে। তাই চট্টগ্রামবাসীকে আরো প্রায় দেড় বছরের মতো গ্যাসের সংকটের মধ্যে কাটাতে হবে।

এদিকে, বাসাবাড়ি, কলখারখানা ও পরিবহনে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রচ্চাব অনুমোদনের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ক্রেতাভোক্তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে ক্যাব নেতৃবৃন্দ এ প্রচ্চাবের মার্চের অংশ বাচ্চবায়ন করা হলেও জুনের অংশটি বাতিল, সর্বত্র গ্যাসের প্রাপ্যতা ও সেবার মান নিশ্চিত, এলপিজির সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, বাসাবাড়িতে গ্যাসের অপচয় রোধে প্রিপেইড মিটার স্থাপন, জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস বিতরণে সমতা আনা, গ্যাসখাতে অনিয়ম ও সিস্টেম লস কমাতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, গ্যাস কোম্পানিগুলির আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ভোক্তাদের স্বার্থ চিন্তা না করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য তারা সরকারের প্রতি দাবি জানান। তারা বলেন, গ্যাস কোম্পানিগুলোর চুরি বন্ধ না করে, সেবার মান না বাড়িয়ে, নানা অনিয়মের প্রতিকার না করে বার বার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অপরিপক্ব ও জনস্বার্থ বিরোধী।

ক্যাব নেতৃবৃন্দ বলেন, প্রতিদিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। সাধারণ মানুষের জীবন নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে জনগণের স্বার্থ চিন্তা না করে গ্যাসের দাম দুই দফায় বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গৃহস্থালির ব্যবহার্য গ্যাস ও সিএনজি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে জীবনযাত্রার ব্যয় আরেক দফা বাড়বে। গণপরিবহন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন খরচও বাড়বে। এর খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। গণশুনানিতে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে দেয়া একটি সুপারিশও কার্যকর না করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেশন কমিশন সরকারিবেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করেছে বলে বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী, ক্যাব মহানগরের সভাপতি জেসসিন সুলতানা পারু, দক্ষিণ জেলা সভাপতি আবদুল মান্নান প্রমুখ।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে চট্টগ্রাম গণঅধিকার ফোরামের এক সভা গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, বৃহত্তর চট্টগ্রামে প্রেসার কম থাকার কারণে অধিকাংশ সময় চুলা বন্ধ থাকে। সেখানে নতুন করে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট প্রশ্নের দাবি রাখে। এভাবে দেশ চলতে থাকলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র শিল্প কলকারখানা ও যাতায়াত ব্যবস্থায় করুণ পরিণতি নেমে আসবে। শুধু তাই নয়, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে যাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্যও। তিনি বলেন, গ্যাস চুরি বন্ধ করতে না পেরে সরকার সাধারণ জনগণের পকেট কাটার জন্য মূল্যবৃদ্ধি করেছে। চট্টগ্রামবাসী তা মেনে নেবে না।

LEAVE A REPLY