যে নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর আর যে বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৮০ ভাগ পণ্য ওঠানামা হয়, সেই কর্ণফুলী এখন বিপর্যস্ত। অবৈধ দখল, অতিরিক্ত পলি পড়ে ভরাট আর কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থসহ চট্টগ্রাম নগরবাসীর অপরিশোধিত আবর্জনায় এই নদী এখন অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধে অবতীর্ণ। কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ও নগরবাসীর বিভিন্ন বর্জ্য খাল ও নর্দমা দিয়ে সরাসরি মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। ফলে পানি ক্রমেই হয়ে উঠছে বিষাক্ত। হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী। নদী রক্ষায় মাঝে মধ্যে নগরীতে সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হলেও সুপরিকল্পিতভাবে নদী রক্ষা এবং নদীর দুই পাড়ে অবৈধ দখল বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে ‘ড্রেজিং জটিলতায় কর্ণফুলী, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অগ্রগতি নেই, নতুন নতুন দখলে বিপন্ন নদী’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকাল দৈনিক আজাদীতে। এতে বলা হয়েছে, কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা ২ হাজার ১৮১টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে হাই কোর্টের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন হয়নি গত এক বছরেও। অথচ ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট দেওয়া উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল, ‘রায় প্রকাশের সাত দিনের মধ্যে নদীর তীর দখল করে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তা সরিয়ে নিতে স্থানীয় দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে প্রশাসনকে’। কিন্তু গত এক বছরেও রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে না পাওয়ায় দখলদারদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে কর্ণফুলীর দুই পাড়ে নতুন করে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠছে।
পরিবেশবিদদের মতে, কর্ণফুলী নদীর দুই পাড়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত প্রায় হাজার খানেক শিল্প কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত তরল ও কঠিন বর্জ্যে কর্ণফুলী এখন মূলত ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কাগজকল, রং কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, ট্যানারি, তেল কারখানা, সাবান ফ্যাক্টরি, রেওন মিল, রাসায়নিক পদার্থ উৎপাদন কেন্দ্র এবং টেক্সটাইল মিল থেকে নির্গত বর্জ্য প্রতিনিয়ত দূষণ করছে এ নদীকে। এ ধরনের ১৫০টি কারখানা থেকে ৬২ ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ কর্ণফুলীর পানির সঙ্গে মিশে পানিকে দূষিত করছে বলে তাঁরা জানান।
পরিবেশবিদরা বলেন, স্বাভাবিক পানিতে যে পরিমাণ দ্রবীভূত অক্সিজেন থাকার কথা তা অনেক ক্ষেত্রেই কমে গেছে। অক্সিজেনের অভাবে পানিতে জলজ প্রাণী বাস করতে পারছে না। সাধারণ পানির ক্লোরাইডের মাত্রা লিটারপ্রতি ১৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম থাকার কথা থাকলেও কর্ণফুলীতে নাকি আছে আরো অনেক বেশি। নদীর দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করতে হয়, ৬০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত চট্টগ্রাম নগরীর বিশাল অংশের বর্জ্যের ঠিকানা এই কর্ণফুলী। তাই দূষণে বিলুপ্ত হচ্ছে মৎস্য সম্পদসহ এ নদীর হাজারো জীববৈচিত্র্য। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, কর্ণফুলীতে মিঠা পানির ৬৬ প্রজাতির, মিশ্র পানির ৫৯ প্রজাতির এবং সামুদ্রিক পরিযায়ী ১৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো। দূষণের কবলে পড়ে এর মধ্যে মিঠা পানির প্রায় ২৮ প্রজাতির এবং মিশ্রপানির ১৬ প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়। আরও ২০ প্রজাতির অর্থকরী মাছ বিপন্ন।
কর্ণফুলী মোহনায় শত শত একর ভূমি বেদখল হয়ে গেছে। নির্বিচারে গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা। কর্ণফুলীর উভয় তীরের অবৈধ দখল হওয়া জমি উদ্ধারে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বার বার আশ্বাস প্রদান করা হলেও তার বাস্তবায়ন নেই। নদীর উভয় পাড়কে কেন্দ্র করে অব্যাহত রয়েছে ভরাট ও দখলের প্রতিযোগিতা। এর পেছনে তৎপর রয়েছে প্রভাবশালী ভূমিদস্যু চক্র। এ নিয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও কম চলছে না। সার্বিক চিত্রে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কোনো অগ্রগতি নেই। উপরন্তু নতুন উদ্যমে কর্ণফুলী দখলে নেমেছে প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। তাই অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দখলদারের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে স্থানীয় শক্তিধর ব্যক্তিরা থাকলেও কঠোরভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে।

LEAVE A REPLY