সুনীল বড়ুয়া

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জন্য অনেকের কাছে স্বপ্নের শহর এই কক্সবাজার। বালিয়াড়িতে দৌড়ঝাঁপ আর দেশী বিদেশী পর্যটকদের কাছে আরেক আশ্চর্য সুন্দর স্বপ্ন সমুদ্রস্নান। সমুদ্রের লোনা জলের গর্জন বা ঢেউয়ের দোলাচলে গা ভাসাতে কার না ভাল লাগে। কিন্তু পাঠক,ওই স্বপ্নে মোটেও ডুব দেবেন না। কারণ সমুদ্র,সমুদ্র স্নান বা পর্যটন কোনটাই আজকের লেখার বিষয়বস্তু নয়। বলছি,কক্সবাজার থিয়েটার আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী আলো ঝলমল নাট্যোৎসবের কথা। যে উৎসবকে ঘিরে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল ঝিমিয়ে পড়া সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে। কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে গত ২৬ জুলাই শেষ হয় নাট্যোৎসব। উৎসবে অংশ নিয়েছে ঢাকা,চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ছয়টি নাট্য সংগঠন।
‘মনে হচ্ছে সমুদ্র পাড়েই বসে আছি। সমুদ্রের গর্জন কানে বাজছে। সমুদ্র থেকে এমন স্বল্প দুরত্বে বসে মঞ্চ নাটক দেখছি ? ভ্রমণে এমন বৈচিত্রতায় মন তো একটু রোমাঞ্চিত তো হবেই’। কক্সবাজারের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে বসেই এমন প্রতিক্রিয়া জানান ঢাকার মিরপুর থেকে আসা পর্যটক মো. সাইফুদ্দিন মোজাম্মেল।
‘ছোট ছোট অন্যায় থেকে জন্ম নেয় ক্ষোভ। আর এ ক্ষোভ থেকে জন্ম হয় প্রতিশোধ স্পৃহার। এরই বাস্তব প্রতিফলন হয়েছে ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকে। মূলত মুক্তিযুদ্ধের নিধন এবং মূল্যবোধের সব অর্জনকে ধ্বংস করার পরিকল্পিত চক্রান্ত এ নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে। সত্য-মিথ্যার দ্বন্ধ থেকেই সত্যের স্ফুলিঙ্গ নির্মাণ করেছে সভ্যতা। সেই অবিনাশী সত্য এত লঘু নয়,যা সহজেই চোখ দিয়ে দেখে বোঝা যায়। বাইরের চোখে দেখা সত্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মিথ্যার গুটিপোকা। এই সত্য কখনো হয়ে ওঠে মানুষের প্রাণের চেয়েও মূল্যবান বস্তু এমনকি আত্মার মুক্তির জন্যও অনিবার্য প্রয়োজন’।
উৎসবের শেষ দিনে চট্টগ্রামের নাট্যদল নান্দিকার ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকটির মূল উপজীব্যকে এভাবেই ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে এস এম সোলায়মানের রচনায় এ নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন সংগঠনটির দলপ্রধান বিশিষ্ট নাট্যজন অলক ঘোষ। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হল ভর্তি দর্শকের পিনপতন নিরবতা জানান দিয়েছে এ নাটকে কতটা মন্ত্রমুগ্ধ ছিল দর্শক। বলা যায়,নান্দিকার সফল প্রযোজনা এটি। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নান্দিকার দল প্রধান অলক ঘোষ বললেন, ‘কোর্ট মার্শাল’ নাটকের মাধ্যমে আমরা চেষ্টা করেছি মুক্তিযুদ্ধ কি, কেন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধের মানুষের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে শাণিত করার তাগিদ আমরা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। যাতে নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে।
কক্সবাজার থিয়েটারের ৩৩ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত এবারের উৎসবের শিরোনাম ছিলো ‘যুক্ত করো হে সবার সঙ্গে,মুক্ত করো হে বন্ধ’। সপ্তাহব্যাপী এ উৎসব উৎসর্গ করা হয় প্রয়াত নাট্যকর্মী বদরুল আলম লিটনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন ২১ জুলাই ছিল ঢাকা শব্দ নাট্যচর্চ্চা কেন্দ্রের ‘রাইফেল’ ও ‘বীরাঙ্গনার বয়ান’ নাটকের মঞ্চায়ন।
‘১৯৭১ সালের মে মাস। বাংলাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল,পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী বিস্তার করেছে হিংস্র থাবা। পাশাপাশি গড়ে উঠেছে প্রতিরোধ,লড়ছে বাঙালী সৈনিক ও তরুন যুবকদের সম্মিলিত মুক্তি ফ্রন্ট। কিন্তু সোনার দেশ নিয়ে তরুণদের বুকে যে স্বপ্ন তা স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের হাতে জিম্মি। এমনই পরিস্থিতিতে স্বামীহারা এক মা আঁচলে বেঁধে রাখতে চাইছেন তাঁর বুকের মানিকদের। কিন্তু রক্তের উন্মাদনা আর খুনিদের প্রতি ঘৃণার আগুন জ্বলছে তার ছেলে লালু ও সালুর মনে। পাটকলে কাজ করা মজুর ভাই এসেছে-জেল এর তালা ভেঙ্গে। ভাইটি জানে তার বিধবা বোনের কাছে আন্দোলনে নিহত স্বামীর একটি রাইফেল আছে। রাইফেলটি মুক্তির জন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। তিনি এবং মুক্তিফ্রন্টের যোদ্ধারা বাঙালী ছেলেদের যুদ্ধে যাবার জন্য আহবান জানায়। কিন্তু মায়ের শত পাহারা সত্বেও পাকিস্তানী হানাদার ও এদের দোসরদের হাত থেকে তারা রেহাই পায়নি। পাক সেনারা রাতের অন্ধকারে নদীতে মাছ ধরার সময় লালুকে গুলি করে মারে। শেষ পর্যন্ত শোকাক্রান্ত মা নিজেই রাইফেল হাতে বেরিয়ে পড়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে’।
‘রাইফেল নাটকে মুক্তিযুদ্ধের এই প্রেক্ষাপটকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন শিল্পীরা। বের্টোল্ট ব্রেখট-এর লেখা এর নাট্যরূপ দিয়েছেন অমিত চন্দ। নির্দেশনা দেন খোরশেদুল আলম। ‘বীরাঙ্গনার বয়ান’ নাটকটিরও মূল উপজীব্য ছিল মুক্তিযুদ্ধ। রওশন জান্নাত রুশনীর লেখা এ নাটকটি নির্দেশনা দেন দেবাশীষ ঘোষ। দুর্দান্ত অভিনয় শৈলীতে দুটি নাটককেই সফলতার আলো দেখিয়েছেন রওশন জান্নাত রুশনী।
এছাড়াও সাতদিনের উৎসবে ঢাকা নাট্যতীর্থের ‘দ্বীপ, মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের ‘নীলাখ্যান’ ও ‘শিবানী সুন্দরী’,কক্সবাজার থিয়েটারের ‘টু ইডিয়টস’,চট্টগ্রাম অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায়ের ‘দুতিয়ার চাঁন’ নাটকের সফল মঞ্চায়ন হয়েছে। এবারের উৎসবে বিশেষ মাত্রা যোগ করে কক্সবাজারের নাট্যাঙ্গনের সাত অগ্রজ নাট্যজনকে সম্মাননা। জসীম উদ্দিন বকুল,খোরশেদ আলম, পরিতোষ চৌধুরী,নজরুল ইসলাম বকসী,সাহানা রেজা, আক্তার শাহনেওয়াজ করিম (শাহীন) ও আবুল কালাম আজাদকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয় এ উৎসবে।
উৎসব প্রসঙ্গে কবি ও সাংবাদিক বিশ্বজিৎ সেন বাঞ্চু বলেন, প্রায় প্রতিদিনই নাটক দেখেছি,সবকটি নাটকের সফল মঞ্চায়ন হয়েছে। বৃষ্টি-বাদলকে তুচ্ছ করে দর্শক নাটক দেখতে এসেছে। এক কথায় বলবো সফল নাট্যোৎসব। বিশেষ করে অগ্রজ সাত নাট্যজনকে যে সম্মাননা দেওয়া হলো,এটি অবশ্যই কক্সবাজার থিয়েটারের প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
নাট্যজন ও আবৃত্তিকার, শব্দায়ন আবৃত্তি একাডেমীর পরিচালক জসীম উদ্দিন বকুল বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হলাম, দেশ স্বাধীন হলো এর পর পর একযোগে শুরু হলো ,নাট্যচর্চা,সংস্কৃতি চর্চা, সাহিত্য চর্চা, শিল্পকলা চর্চ্চা একটা বিশাল আন্দোলনে পরিণত হলো যেনো। এটি হলো সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটি ক্রমাগত চলতে চলতে আজ এই পর্যন্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয়,আকাশ সংস্কৃতির কারণে বা করপোরেট সংস্কৃতির কারণে আজ দেখা যাচ্ছে একটা আকাল তৈরী হয়েছে সংস্কৃতি চর্চায়। এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের উৎসব আয়োজন আমাদের আশার আলো দেখায়। কক্সবাজার সংস্কৃতি চর্চাকে অনেক বেগবান করবে এ উৎসব। পাশাপাশি অন্যান্য দলগুলোও যদি এভাবে এগিয়ে আসে,তবেই আমরা ৭১ এর চেতনাকে ধারন করে সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিতে পারবো।
কক্সবাজার থিয়েটারের প্রাণ,নাট্য নির্দেশক স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, এ ধরনের উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা দেশের নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে মেলবন্ধনের সুযোগ তৈরী হয়। ঝিমিয়ে পড়া সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রাণের সঞ্চার হয়। সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে জেগে ওঠার তাগিদ তৈরী হয়। এছাড়াও উৎসবে ভিন্নধারার ভিন্ন ভিন্ন নাটক মঞ্চায়নের কারণে দর্শকেরাও সারা দেশের নাট্য চর্চার চালচিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারনা লাভ করে। দেশকে এগিয়ে নিতে, সমাজকে এগিয়ে নিতে এর ইতিবাচক একটা প্রভাব তো আছেই। আমরা আশাবাদি অন্ধকার দূর হয়ে একদিন আলো আসবেই। কক্সবাজার থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস রক্ষিত বলেন, কক্সবাজার থিয়েটার বিশ্বাস করে,শিল্পের জন্য শিল্প নয়, মানুষের জন্য শিল্প, জীবনের জন্য শিল্প। নাটকের মাধ্যমেই এই সমাজ থেকে জঙ্গীবাদ দূর হবে,সাম্প্রদায়িকতা দূর হবে। তাতেই করে এগিয়ে যাবে দেশ এগিয়ে যাবে সমাজ। আগামীতে এ উৎসব আরো বড় পরিসরে করার ভাবনার কথাও জানান তিনি।
গত ২৬ জুলাই সমাপনী দিনে অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম মজুমদার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আব্দুর রহমান। ২০ জুলাই উৎসবের উদ্বোধন করেন দেশের নাট্যতাত্ত্বিক গবেষক ও জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য্য অধ্যাপক ড. আফসার আহম্মদ। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস রক্ষিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সেক্রেটারী জেনারেল আকতারুজ্জামান, কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক পিন্টু আরেং, কামরুন নূর চৌধুরী, কক্সবাজার সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সত্যপ্রিয় চৌধুরী দোলনসহ অন্যান্যরা বক্তব্য দেন।

LEAVE A REPLY