অজয় দাশগুপ্ত

এই কান্নার শেষ কোথায়?

যদি এরা ছাত্রলীগের নাম ভাঙায় তো দল বা নেতারা এদের শাস্তি দিতে কঠোর হয়না কেন? তাঁরাতো বরং এবিষয়ে এমন কঠোর হবেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ দলের নাম ভাঙিয়ে এমন কাজ করতে না পারে। সেটা না হয়ে যখন শাস্তি মওকুফ বা মাফ করে লঘু দণ্ড দেয়া হয় আমরা কি ধরে নেবনা কানেকশান কাজ করছে? এ জায়গাটাই ক্লিয়ার করতে পারছে না তারা। না পারার কারণ সবাই জানে কিন্তু কেউ বলে কেউ বলেনা। এই বিপথগামী তারুণ্য কখনো কোন দলকে বাঁচাতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতম করা ছাত্রদল এখন অতীত। রাজপথে একটা ঢিল ছোঁড়ার জন্যও তাদের দেখা মেলেনা। এই লেখা যখন লিখছি সিলেটে ছাত্রলীগের কর্মীদের বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে আধমরা বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে শিবিরের কর্মীরা। তখন কোথায় থাকে এই আস্ফালন? জায়গামত প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে ব্যর্থ ছাত্রলীগ যখন রাজপথে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমরা বুঝে নেই এর নাম শক্তের ভক্ত নরমের যম।

বিচার কাকে বলে? মূলত ন্যায় কি অন্যায় কি? এসব এখন আর আগের বিবেচনায় দেখার মানে নেই। বিচার বা আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে বা আইনের ওপর কথা বলা যাবেনা, এসব বাক্য সমাজকে কি আসলে ভালো রেখেছে? আইন বা বিচার না দায়ী না দোষী? আমরা সবাই জানি যন্ত্রের দোষ নাই। দোষ বা অসুবিধা যন্ত্রীর। এক ড্রাইভার যে গাড়ি নিরাপদে চালায় আরেকজন সে গাড়ি শুরুতেই খাদে ফেলে দেয়। আমাদের আইন বিচার ও আজ সে রকম। কে কোথায় কি করছে কেন করছে সবাই জানে। এমনকি খুন রাহাজানিও । অথচ বিচার একেক বেলায় একেক রকম। বিশ্বজিত হত্যার বিচার নিয়ে আমাদের মনখারাপ তাই মূলত মূল্যহীন।

বিশ্বজিত নিরীহ নিরপরাধ বলেই তাকে মরতে হয়েছে। এখন সমাজে নিরীহ হবার মানে নিজেকে বলীর পাঁঠা বানিয়ে নেয়া। এই যুবকটি যে হিংসার শিকার বা যেভাবে তাকে মারা হয়েছে তার পেছনে ছিল রাজনীতি। বিস্ময় মানি যে ছাত্রলীগ শিবিরের তাণ্ডব বা জামাতের সহিংসতার সময় একটা লাঠি নিয়ে বের হতে পারেনি সে তারাই এই ছেলেটিকে নির্মমভাবে কুপিয়ে মারলো। রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন ঘটনা আগে হয়নি বলা যাবে না। তবে এভাবে নিরস্ত্র একজনকে এতজন মিলে কোপানো লোমহর্ষক। সে লোমহর্ষক ঘটনাটি যারা ঘটিয়েছে তারা ছাত্রলীগের কর্মী বা নেতা। এই পরিচয় কে যারা নামধারী বলছেন তাদের কাছে একটা বিনীত প্রশ্ন রাখি, নামধারী হলে কি বিচার এভাবে ছাড় দিতো তাদের? না ডাবল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়তো? যখন তা হয়নি প্রচলিত রাজনীতি এটাই মনে করিয়ে দেয় এই বিচার প্রভাবিত হতে পারে। দুজনের ফাঁসি আর যাবজ্জীবন বা খালাস এই প্রক্রিয়া মনে করিয়ে দেয় ভাগাভাগি হয়েছে। আইন বিচার শুদ্ধতাও তা রুখতে পারেনি।

বাংলাদেশে কোনকালে সঠিক বিচার ছিল কিনা সেটা গবেষণার বিষয়। তবে এখন যেসব রাজনৈতিক লেনদেন হয় যেভাবে রাজনীতি সবকিছু দখল করে আছে তা কিন্তু ছিলোনা। প্রফেসর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একবার বিদেশে গিয়ে বলেছিলেন, ন্যায় বিচার ছিলো ব্রিটিশ আমলে। সুশাসন ছিল সামরিক শাসনের আমলে। ব্যস সবাই মিলে তাঁকে তুলোধুনো করা শুরু হলো। এই তুলোধুনো করা ন্যায় কি অন্যায় জানিনা তবে তাঁর কথা উড়িয়ে দেয়া যাবেনা। ভদ্রলোককে একেক সময় সুবিধাবাদী মনে হলেও এই কথাটি দারুণ বলেছিলেন। সামরিক শাসনের বিষয়টি তিনি কি কারনে বলেছিলেন জানি না তবে সেসব আমলে গণতন্ত্রের লেশ না থাকলেও মানুষ ভয়ে মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকতো। আমাদের যৌবনে এমন ও দেখেছি চুল লম্বা ছিল বলে চুল ধরে টেনে হিঁচড়ে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে। আর যায় কোথায় পড়ে গেলো চুল কাটার ধুম। বিষয়টা সমর্থনযোগ্য না। কিন্তু সংস্কৃতে আছে, মূর্খানং ল্যাঠ্যাষোধি। মূর্খের জন্য লাঠিকেই ওষুধ বলছে শাস্ত্র। সেটা একটু পরিবর্তন করার প্রয়োজন পড়েছে আজ। মূর্খ নামের সাধারণ মানুষেরা মূলত এখন আর অন্যায় বা মন্দের সাথে জড়িত না। তাদের দিয়ে করানো হলেও তারা আসলে নিরীহ। তাদের চাওয়া খুব সাধারণ একটি জীবন। আর যারা ধনী তাদের কাজ ইন্ধন দেয়া। ঝগড়া লাগিয়ে রাখা। মাঝখানে যে শ্রেণিটি তারাই সকল অকাজের কাজী। এদের জন্য সংস্কৃত বর্ণিত লাঠির দরকার আজো ফুরোয়নি।

বলছিলাম আইন ও বিচারের কথা। এর নিয়ন্ত্রণ এখন এদের হাতে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ যদি আগ্রাসী হতো যদি তারা মারামারি খুনোখুনি চাইতো দেশ সিরিয়ার মত হতো। কেউ ঠেকাতে পারতো না। তারা চায় না বলেই বিএনপির মত সংখ্যাগরিষ্ঠের দল ও চুপটি মেরে থাকে। বিশ্বজিৎ হত্যার ভিডিওটি দেখুন নিচে দাঁড়ানো এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক যাঁকে দেখলেই আপনি বুঝবেন ইনি ধর্মপ্রাণ ও সহজ প্রাণ মানুষ, কিভাবে আকুতি জানাচ্ছেন। দুহাত জোড় করে মিনতি করছেন ছেড়ে দেয়ার জন্য। কারণ তাঁর কাছে বিশ্বজিৎ কোন মালাউন বা বিধর্মী মনে হয়নি তখন। সন্তানতুল্য একটি যুবকের এমন করুণ মৃত্যু বা নিহত হবার দৃশ্য দেখেও যাদের মন গলেনি তারা নাকি যুবক। তারা আবার রাজনৈতিক দলের সদস্য। এখানেও একটা হ্যাপা আছে। একদল বলে তারা ছাত্রলীগ করেনা। নাম ভাঙ্গায়, আরেক দল বলে এটাই ছাত্রলীগের আসল চেহারা। আমরা যারা সাধারণ মানুষ আমরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। যদি এরা ছাত্রলীগের নাম ভাঙায় তো দল বা নেতারা এদের শাস্তি দিতে কঠোর হয়না কেন? তাঁরাতো বরং এবিষয়ে এমন কঠোর হবেন যাতে ভবিষ্যতে কেউ দলের নাম ভাঙিয়ে এমন কাজ করতে না পারে। সেটা না হয়ে যখন শাস্তি মওকুফ বা মাফ করে লঘু দণ্ড দেয়া হয় আমরা কি ধরে নেবনা কানেকশান কাজ করছে?

এ জায়গাটাই ক্লিয়ার করতে পারছে না তারা। না পারার কারণ সবাই জানে কিন্তু কেউ বলে কেউ বলেনা। এই বিপথগামী তারুণ্য কখনো কোন দলকে বাঁচাতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাতম করা ছাত্রদল এখন অতীত। রাজপথে একটা ঢিল ছোঁড়ার জন্যও তাদের দেখা মেলেনা। এই লেখা যখন লিখছি সিলেটে ছাত্রলীগের কর্মীদের বেধড়ক পিটিয়ে জখম করে আধমরা বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে শিবিরের কর্মীরা। তখন কোথায় থাকে এই আস্ফালন? জায়গামত প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে ব্যর্থ ছাত্রলীগ যখন রাজপথে কারো ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমরা বুঝে নেই এর নাম শক্তের ভক্ত নরমের যম। ছাত্রলীগের এই চেহারা সরকারি দলের জন্য ভয়াবহ। এভাবে তাদের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। আগামী দিনে নির্বাচনে মানুষ কেবল উন্নয়নের নামে কিছু রাস্তাঘাট পুল বা দালালনকোঠা দেখবে এটা মানা বোকামি। মানুষ এগুলোর সুফল ভোগ করেই পাল্টে যাবে। একথা মনে না রাখলে ভরাডুবি ঠেকানো যাবে না।

বিশ্বজিৎ হত্যার বিষয়টি আরো এক কারণে মানুষের মনে দাগ কেটে রেখেছে। ভালো করে ভাবুন। চোখ বন্ধ করে দেখুন। এমন একটা ঘটনা এদেশের লাখ লাখ শিশু কিশোরের মনে কি প্রভাব ফেলেছে। কিভাবে তারা নিয়েছে এই ঘটনাকে? এ নিয়ে সমাজ বা জাতির কোন মাথা ব্যথা নেই। অথচ এই আমরা পত্রিকার পাতায় নিশ্চল সাত খুনের ছবি দেখেছিলাম কৈশোরে। সে দুঃসহ স্মৃতি এখনো আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আর এরা দেখেছে চলমান হত্যাকাণ্ড। একটি জাতিকে এমন ট্রমার ভেতর দিয়ে নিয়ে যাবার পরও যদি ন্যায্য বিচার না হয় তো দেশের ভবিষ্যত আসলে কি? যারা মন দিয়ে নিহতের মা বাবাদের ছবি দেখেন তাদের অন্তরের অভিশাপ মার্জনা করবে আমাদের? যারা শক্তি ও পেশীর জোরে দেশ ও মানুষকে পায়ের তলায় রাখে এই সরকারকে এখনো তেমন মনে করিনা আমরা। আমাদের চাওয়া শেখ হাসিনা এগুলো জানুন। জেনে কঠোর হয়ে উঠুন।

যেদিন রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন, সেদিন রায় বেরিয়েছিল। যখন তা টিভিতে প্রচারিত হচ্ছিল কারণ যেন গাইছিল, বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান তুমি কি এমন শক্তিমান? শিউরে উঠেছিলাম। কোন পথে এগুচ্ছে সমাজ? কোন পথে আমাদের তারুণ্য যাচ্ছে আসলে? এমন করুণ কঠিন নারকীয় প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের যদি বিচার ঠিক মত না হয় তো মানুষ বাঁচবে কোন ভরসায়? তারপরও আইন বিচারের ওপর কথা চলে না। তাই মুখবন্ধ রাখাই ভালো। বাকিটা সময়ের কাছে জমা থাক।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

LEAVE A REPLY