মুহাম্মদ ইসমাঈল কুতুবী

ইসলামে হজ্বের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

সম্মানিত মুসল্লিয়ানে কিরাম!

মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো হজ্ব। ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় এর গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহর মেহমান হজ্বযাত্রীরা মক্কা শরীফে অবস্থিত ইসলামের ত্যাগ তিতিক্ষা ও সাধনার স্মৃতি বিজড়িত স্থানসমূহ পরিদর্শন করে অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির অধিকারী হয়। হজ্ব মানব জাতির আধ্যাত্মিক সামাজিক ও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করে।

হজ্ব ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। ইসলামে হজ্বের গুরুত্ব অপরিসীম। হজ্ব শব্দের মধ্যে পাঁচটি অক্ষর বিদ্যমান যা ইঙ্গিত বহন করে যে ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ এই হজ্বের মধ্যেই বিদ্যমান। তাছাড়া হজ্ব সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র সূরা (সুরাতুল হাজ্ব) অবতীর্ণ হয়েছে। রাসুল (.) আবু বকর (রা) কে কাফেলা সহকারে নবম হিজরীতে হজ্বের উদ্দেশ্যে পাটিয়েছেন। আল্লাহ কাবার জায়গাকে পৃথিবী সৃষ্টির দু’হাজার বছর পূর্বে তৈরি করেছেন। পৃথিবীর অন্যান্য মসজিদসমূহ কাবার অংশ বিশেষ। কিয়ামতের দিন কাবার সাথে সংযুক্ত হয়ে সমস্ত মসজিদ জান্নাতের অংশ হবে। একমাত্র আল্লাহর ইবাদতের জন্য তৈরি প্রথম ইবাদত গৃহ হল পবিত্র কাবা ঘর। (সূরা আলইমরান)

মক্কা পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম এমন প্রত্যেক মুসলিম পুরুষ ও মহিলার জন্য জীবনে একবার হজ্ব আদায় করা ফরজ। আল্লাহ বলেন, বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌছাতে সক্ষম প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আল্লাহর জন্য হজ্ব করা ফরজ। ( আলইমরান,আয়াত৯৭)

তাই হাজীদের তিনটি বিষয় সহীহ হওয়া জরুরী ১। নিয়ত সহীহ হওয়া ২। মাল বা পাথেয় সহীহ হওয়া, ৩। পদ্ধতি সহীহ হওয়া এবং হাজীদের তিনটি কাজ অধিক করার প্রতি নবীজি উৎসাহ প্রদান করেছেন। ১। অধিক হারে সালাম প্রদান করা ২। একে অপরকে অধিক হারে খাবার প্রদান করা ৩। সুন্দর ও নরম ভাষায় কথা বলা। তাহলে নবীজি আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনটি বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন ১। নিষ্পাপ শিশুর মত পবিত্র হওয়া। ২। দারিদ্রমুক্ত জীবন যাপন ৩। কিয়ামতে চারশ থেকে সাতশত পাপীকে জান্নাতে নেয়ার সুপারিশের অধিকার প্রদান।

সম্মানিত মুসল্লী ভাইসব!

হজ্বে হাজীকে পাপমুক্ত করাকে শর্তসাপেক্ষ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন– “হজ্বের সময় নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস। অতএব এ মাসগুলিতে যে হজ্ব করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তাকে হজ্বে অশ্লীলতা, পাপঅন্যায় ও কলহ বিবাদ থেকে সম্পূর্ণ বিমুক্ত থাকতে হবে। আর তোমরা যা ভাল কাজ কর আল্লাহ তা জানেন এবং তোমরা পাথেয় গ্রহণ করো, আর তাকওয়া বা আল্লাহভীতি ও আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয় এবং হে বিবেক সম্পন্নগণ তোমরা আমাকে ভয় কর।” (বাকারা১৯৭)

যারা হজ্বের নিয়্যাত করেছেন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এ আয়াতটি তাদের জন্যই দিক নির্দেশনা। অনেক কষ্ট করে হজ্বে যাচ্ছেন। গতানুগতিকতায় গা ভাসিয়ে দেবেন না। আল্লাহর নির্দেশ মন দিয়ে স্মরণ করুন। প্রথম বিষয় হলো সর্ব প্রকারের অশ্লীলতা বোধক চিন্তা, কর্ম, দৃষ্টি ও আচরণ থেকে সর্বোতভাবে বিমুক্ত থাকতে হবে। কারো সাথে কোনো অশোভন আচরণ করা যাবে না এবং ঝগড়া বিবাদ করা যাবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ের মধ্যে হাজারো কষ্ট পেয়েও কারো প্রতি রাগ করা যাবে না বা কারো সাথে ঝগড়া করা যাবে না। এরই নাম হলো হজ্ব।

সম্মানিত মুমিন ভাইসব

আর হজ্ব ফরজ হওয়ার পরেও হজ্ব না করে মৃত্যুবরণ করাকে কোনো কোনো হাদীসে ইহুদি খ্রিস্টান হয়ে মরা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। (তিরমিযি)। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ বলেন– ‘বান্দার শরীর আমি সুস্থ রেখেছি এবং জীবনযাত্রায় সচ্ছলতা দান করেছি, এভাবে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও সে আমার ঘরে আগমন করল না সে সুনিশ্চিত বঞ্চিত ও হতভাগা।’ (ইবনু হিব্বান ৯/১৬)

হাযেরীন, কুরআন ও হাদীসে অগণিত স্থানে বারংবার হজ্বের গুরুত্ব ও ফযীলত বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলির আলোচনা সংক্ষিপ্ত পরিসরে সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য নিবেদিতভাবে, সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায় ও অশ্লীলতা মুক্ত হয়ে হজ্ব আদায় করলো, সে নবজাতক শিশুর মত নিষ্পাপ হয়ে ঘরে ফিরল।” (বুখারী ২/৫৫৩)

একবার ওমরা আদায়ের পর দ্বিতীয়বার ওমরা আদায় করা হলে, তখন দুই উমরার মধ্যবর্তী গোনাহ আল্লাহ মাফ করে দেন। আর পুণ্যময়পরোপকারময় হজ্বের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত।” (বুখারী ২/৬২৯)

তোমরা বারবার হজ্ব ও উমরা আদায় কর, কারণ কর্মকারের ও স্বর্ণকারের আগুন যেমন লোহা ও সোনারূপার ময়লা মুছে ফেলে তেমনিভাবে এ দুই ইবাদত দারিদ্র্য ও পাপ মুছে ফেলে। আর পুণ্যময়পরোপকারময় হজ্বের একমাত্র পুরস্কার হলো জান্নাত। (তিরমিযি ৩/১৭৫)

চারটি আমলের মাধ্যমে গরীবদের জন্য আল্লাহ হজ্বের সওয়াবের ব্যবস্থা করেছেন ১. ফজর নামাজ শেষে সূর্যোদয়ের পর দু’রাকাত নফল পড়লে একটি পরিপূর্ণ হজ্ব ও ওমরাহর সওয়াব লাভ করা যায়। ২. রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করলে এক হজ্ব ও এক ওমরার সওয়াব লাভ করা যায়। ৩. পিতামাতার দিকে শ্রদ্ধাভক্তি ও ভালবাসা নিয়ে তাকালে একটি পরিপূর্ণ হজ্বের সওয়াব পাওয়া যায়। ৪. জুমাবারে ওজুগোসল সেরে পবিত্র হয়ে মসজিদে এসে খতিবের পাশে বসে খুতবা শুনে, কাউকে কষ্ট না দিয়ে ঘরে ফিরলে একটি মকবুল হজ্ব ও ওমরার সওয়াব পাওয়া যায়।

মুহতারাম হাযেরীন!

হজ্বের তাৎপর্য সম্পর্কে ওলামায়েকেরাম বলেন,

এহরামের কাপড় গায়ে জড়িয়ে আত্মীয়স্বজন ছেড়ে হজ্বের সফরে রওয়ানা হওয়া কাফন পরে আত্মীয়স্বজন ছেড়ে আখেরাতের পথে রওয়ানা হওয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

হজ্বের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেয়া আখেরাতের সফরে পাথেয় সঙ্গে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।

এহরাম পরিধান করে পুতপবিত্র হয়ে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেয়ার জন্য ‘লাব্বাইক’ বলা সমস্ত গুনাহপাপ থেকে পবিত্র হয়ে পরকালে আল্লাহর কাছে হাজিরা দেয়ার প্রয়োজনীয়তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলে বান্দা হজ্ব বিষয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর যে কোনো ডাকে সাড়া দেয়ার ব্যাপারে সদা প্রস্তুত থাকার কথা ঘোষণা দেয়।

এহরাম অবস্থায় সকল বিধিনিষেধ মেনে চলা স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে যে মুমিনের জীবন বল্গাহীন নয়। মুমিনের জীবন আল্লাহর রশিতে বাঁধা। আল্লাহ যেদিকে টান দেন সে দিকে যেতে মুমিন প্রস্তুত।

এহরাম অবস্থায় ঝগড়া করা নিষেধ। এর অর্থ মুমিন ঝগড়াটে মেজাজের হয় না। মুমিন ক্ষমা ও ধৈর্যের উদাহরণ স্থাপন করে জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে।

বায়তুল্লাহর সান্নিধ্যে গিয়ে মুমিন নিরাপত্তা অনুভব করে। কেননা বায়তুল্লাহকে নিরাপত্তার নিদর্শন হিসেবে স্থাপন করেছেন আল্লাহতা’আলা। সফরের কষ্টযাতনা সহ্য করে বায়তুল্লাহর আশ্রয়ে গিয়ে মুমিন অনুভব করে এক অকল্পিত নিরাপত্তা।

হাজরে আসওয়াদ চুম্বনস্পর্শ মুমিনের হৃদয়ে সুন্নতের তাজিমসম্মান বিষয়ে চেতনা সৃষ্টি করে। কেননা নিছক পাথরকে চুম্বন করার মাহাত্ম্য কী তা আমাদের বুঝার আওতার বাইরে। তবুও আমরা চুম্বন করি, যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন।

উকুফে আরাফা কিয়ামতের ময়দানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে সমগ্র মানবজাতি একত্রিত হবে সুবিস্তৃত এক ময়দানে। যেখানে বস্ত্রহীন অবস্থায় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে গুণতে হবে অপেক্ষার প্রহর।

ইহরামে সাম্যের দৃশ্য উদ্ভাসিত হয় যে, বাদশা হোক নিঃস্ব হোক সকলকে একই কাপড় পড়তে হবে।

তাওয়াফ হলো ভালবাসার নিদর্শন। কারণ প্রেমিক প্রেমিকার ঘরের চতুর্দিকে চক্কর বা ঘর প্রদক্ষিণ করা, জড়িয়ে ধরা, আলিঙ্গন করা, চুমু খাওয়া ইত্যাদি সব ভালবাসার নিদর্শন। মূলতাযিম আলিঙ্গন করার অর্থ হলো আল্লাহর ঘরের দরজাকে জড়িয়ে ধরা। তখন বান্দা যা চায় তা তাকে দেওয়া হয়। আল্লাহর ঘর মানুষের আবেগ প্রকাশের উত্তম মাধ্যম।

মিনায় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ লক্ষ রাকাতের ছওয়াব বাদ দিয়ে পড়তে হয়। কারণ কারো নিকট কোন ফজিলত নেই। একমাত্র আল্লাহর নির্দেশের ফজিলত।

মহান আল্লাহপাক বলেন, “হজ্বের সময় নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস। অতএব এ মাসগুলোতে যে হজ্ব করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তাকে হজ্বে অশ্লীলতা,পাপঅন্যায় ও কলহ বিবাদ থেকে সম্পূর্ণ বিমুক্ত থাকতে হবে।” (বাকারা১৯৭)

মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে কুরআন সুন্নাহ মোতাবেক হজ্ব করার তওফিক দান করুন। আমিন!

লেখক : খতিব, আমিরবাগ জামে মসজিদ, মেহেদীবাগ, চট্টগ্রাম।

LEAVE A REPLY