মৃণালিনা চক্রবর্তী

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

১৩০৪ বঙ্গাব্দে ৮ আশ্বিন রবীন্দ্রনাথ জমিদারী কাজে জমিদারী ভাগ হওয়ার পর মাত্র একবারই শাজাদপুর এসেছিলেন। সেখন থেকে চলনবিল ও নগর নদ হয়ে পতিসর পৌঁছে যান ১০ আশ্বিন। এ সময় কল্পনা কাব্যের জন্য কবিতা রচনা চলছে। আশে পাশের এলাকায় বোটে বসে “নববিরহ” মানস প্রতিমা সংকোচ “লজ্জিতা” “কাল্পনিক বিদায়” যাচনা প্রভৃতি কবিতা। রবীন্দ্রসাহিত্যের অনেকখানি বুক জুড়ে আছে পদ্মা বড়াল, ইছামতি, করতোয়া, যমুনা, হুরাসাগরের বিশাল বিস্তীর্ণ জলীয় আবহ। খোলা দিগন্ত ফসলের মাঠ ও মানুষ। রবীন্দ্রনাথ শাজাদপুর বাসকালে বেশি সময় কুঠি বাড়িতে এসে থেকেছেন। রবীন্দ্রনাথের “সোনারতরী” চিত্রা “চৈতালী” কাব্যে বিশ্বজননীন আনন্দপূর্ণ ভরাযৌবনের যোগাযোগ, বিস্ময়কর, সৌন্দর্যবোধ এবং ছোটগল্পের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে সমাজনীতি, অর্থনীতি, জীবনবোধের সাফল্য, সুখ দুঃখের প্রাধান্য লাভ ঘটেছে।

জমিদারী ভাগের একদশক পরে রবীন্দ্রনাথ শাজাদপুর ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাবনা প্রাদেশিক সম্মেলনীতে সভাপতিত্ব করার জন্য আসেন। রবীন্দ্রনাথ প্রজাবৎসল জমিদার ছিলেন। প্রথম সফরে তার অভিভাষণে আত্নশক্তিতেম উদ্বুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ সবল সতেজ আধুনিক পল্লী গড়ার স্বপ্ন হৃদয়ে অংকিত করেন এবং সকলকে করেছেন। এবং প্রথম গোখামার প্রতিষ্ঠা করেন। মনের টানে রবীন্দ্রনাথ ১৩০৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে শেষ ভাগে মত শাজাদপুর আসেন। এবার তিনি অন্যতম বিখ্যাত গান ও কবিতা রচনা করেছেন “ভালবেসে সখি নিভৃত যতনে” ও বিদায় কবিতাটি “এবার চলিনু তবে, সময় হয়েছে নিকট, এখন বাঁধন ছিঁড়তে হবে”। ১৫ আশ্বিন বোটে বসেই রামপুর গোয়লিয়রের পথে “অন্তর্যামী” কবিতাটি রচনা করেন। রবীন্দ্রনাথের “সোনারতরী” কাব্যের উল্লেখযোগ্য “প্রতীক্ষা” কবিতাটির তিনটি স্তবক নাটোর এবং শিলাইদহে রচনা করেন। শিলাইদহ থেকে রবীন্দ্রনাথ ১৩০৪ বঙ্গাব্দে ১১ চৈত্র বৃহস্পতিবার জলপথে মিনো জাহাজে চড়ে রামপুর বোয়ালিয়া আসেন। এই পথেই রচনা করেন সোনারতরীর “দুর্বোধ” কবিতাটি। ১৩ চৈত্র “সুখ” ১৫ চৈত্র “ঝুলন”। ১৭ই চৈত্র “সমুদ্রের প্রতি” কবিতা সমূহ এবং সেখানে বসেই “মালিনী” নাটক রচনা করেন। ১৩১০ বঙ্গাব্দের ফাগুন মাসে জমিদারি কাজে তিনি পতিসর আসেন এবং ৯ ফাগুন সন্ধ্যা বেলায় চিত্রার– “সন্ধ্যা” কবিতাটি রচনা করেন।

১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বোয়ালিয়া থেকে রামসর্বস্ব বিদ্যাভূষনের সম্পাদনায় জ্ঞানঙ্কুর ও প্রতিবিম্ব পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ “বনফুল” “প্রলাপ”। প্রথম গদ্যরচনা “ভুবনমোহিনী” “অবসর” “সরোজিনী” “দুঃখসঙ্গিনী” প্রকাশিত হয়। তিনি রামপুর বোয়ালিয়ায় বসে সোনারতরী ও চিত্রার অনেক কবিতা লিখেছেন।

রবীন্দ্রনাথ রামপুর বোয়ালিয়া অবস্থানকালে পঞ্চভূতের ডায়ারী গ্রন্থ রচনার পরিকল্পনা করেন। ১৩০৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। ১৮৯২ সালের ২ ডিসেম্বর রাজশাহী কলেজ রাজশাহী এসোসিয়েশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষায় হেরফের নামে প্রবন্ধ পাঠ করেন। ৪ ডিসেম্বর শীতের খোলা মাঠে ঘুরে বেড়ানোয় কবির শরীর খারাপ হলে অসুস্থতা শরীরে নাটোরে বসে “প্রতীক্ষা” কবিতাটি রচনা করেন। ৯ তারিখে আবার মহারাজা জগদিন্দ্রনাথের আতিথ্য শেষে শিলাইদহে চলে যান।

১৮৯৭ সালে ৯ জুন তারিখে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ থেকে নাটোর আসেন “বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে” যোগ দিতে। রবীন্দ্রানাথ “আমার সোনার বাংলা আমি তোমার ভালবাসি” গানটি গেয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন। ১৩১৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখে রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হয়। কবির সুর্বণজয়ন্তী অনুষ্ঠান পালনোপল ে সংবর্ধনা সভা নাটোরাধিপতি জগদিন্দ্রনাথ আয়োজন করেন। যতীন্দ্রমোহন বাগচী রচিত “বানীবরত নয় আমি স্বাগত সভা মাজে” অভ্যর্থনা সঙ্গীতটির মধ্য দিয়ে অর্ঘ্যদান করতে উঠে নাটোরাধিপতি জগদিন্দ্রনাথ রৌপ্যপাত্রে সজ্জিত ধান্য, দুর্বা, অ ত, সিদ্ধার্থ, চন্দন, অগুরু, কস্তুরী, কুঙ্কুম দধি, মধু, ঘৃত, পুষ্প, গোরচনা, অর্ঘ্যস্বরূপ দান করলেন।

১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ “নোবেল পুরষ্কার” প্রাপ্তি উপলক্ষ্যে পাবনায় অনুষ্ঠিত হয় উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সপ্তম অধিবেশন সভাপতি ছিলেন মহারাজা জগদিন্দ্রনাথ। শরীর খারাপ থাকা অবস্থায়ও জমিদার বন্ধুর অনুরোধে কবি জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভায় উপস্থিত হয়েছিলেন।

অসুস্থতা ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ পুত্রকে দিয়ে জমিদারী পরিচালনা করাবেন পরিকল্পনায় রথীন্দ্রনাথকে কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রির আগ্রহে আমেরিকা পাঠান। ১৯০৯ সালে পাস করে রথীন্দ্রনাথ ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথের স্বস্তির নিঃশ্বাস। পুত্রকে জমিদারীর ভার অর্পনের আগে রবীন্দ্রনাথ বোটে পতিসর যেতে যেতে জমিদারী পরিচালনার নানা উপদেশ দেন। গ্রাম সংস্কার, রাস্তাঘাট সংস্কার, গ্রামের মানুষের সার্বিক কল্যাণ, চিকিৎসা সুব্যবস্থা, কৃষি উন্নয়ন, সকল প্রকার সন্তানের শিক্ষা গ্রহণের দ্বার উম্মুক্তকরণ কালীগ্রাম হিতৈষী সভার উদ্দেশ্য। রবীন্দ্রনাথ কালীগ্রাম পরগনায় একটি হাই স্কুল, দুটি মধ্য ইংরেজী স্কুল প্রতিষ্ঠিত করেন। পতিসর হাইস্কুলটি রথীন্দ্রনাথের নামে রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন” নামে প্রতিষ্ঠিত হয়। মধ্যে ইংরেজী স্কুল “রবীন্দ্রনাথ হাই স্কুল” নামে উন্নীত হয় কেবল কৃষি উন্নতি নয় তিনি পিতৃ নির্দেশানুযায়ী গ্রামীণ উন্নয়নে ব্রতী হন। পিতার গৃহীত কুটির শিল্পের মানোন্নয়নে জন্য পতিসরের লোককে শান্তিনিকেতন থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে রথীন্দ্রনাথ পতিসরে বয়ন শিল্পের শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন। জমিদারী শেষে দিকে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, সেবার পতিসর পৌঁছে গ্রামবাসীদের অবস্থায় উন্নতি দেখে মন পুলকিত হয়ে উঠলো। পতিসরের হাইস্কুলে ছাত্র আর ধরছে না দেখলুম। নৌকার পর নৌকা নাবিয়ে দিয়ে যাচ্ছে ছেলের দল ইস্কুলের ঘাটে। এমন, কি আট দশ মাই দূরের গ্রাম থেকেও ছাত্র আসছে। পড়াশুনার ব্যবস্থা প্রথম শ্রেণির কোন স্কুলের চেয়ে নিকৃষ্ট নয়। পাঠশালা মাইনর স্কুল সর্বত্র ছড়িয়ে গেছে। তিনটি হাসপাতাল ও ডিসপেনসারির কাজ ভাল চলছে। মামলা মোকাদ্দমা খুবই কম। যে অল্প অল্প বিবাদ উপস্থিত হয় প্রধানরা মিটিয়ে দেন। যে সব জোলারা আগে গামছা বুনতো তারা এখন ধুতি, শাড়ি, বিছানার চাদর বুনে, আমাকে দেখাতে আনলো। যতরকম মাছ ধরা জাল, খাঁচা ব্যবহার হয়। একটি জেলে এক সেট মডেল আমাকে উপহার দেন। কুমোররা নানা রকমের মাটির বাসন এনে দেখালো। শুধু চাষীরা অনুযোগ জানালো। বাবু মশায় আমাদের আরো ট্রাক্টর এনে দিলেন না। সেবার উত্তরবঙ্গ বন্যায় সাহায্যার্থে আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় মহাশয় অনেক টাকা তুলেছিলেন। দুঃস্থদের সাহায্য করা শেষ করে উদ্বৃত্ত টাকায় আত্রাইতে স্থায়ীভাবে খাদি আশ্রম প্রতিষ্ঠা ও কয়েকটি ট্রাক্টর কেনা হয়। উন্নত চাষাবাদের জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম আগামী বছর আরো ট্রাক্টর আনিয়ে দেবো।”

১৯২৯ সালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫১ সালে রবীন্দ্রানাথের বিশ্বভারতী ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদার লাভ করলে। রথীন্দ্রনাথ হন প্রথম উপাচার্য্য। সেই সময় পতিসরের এস্টেট পরিচালনা করেন পত্নী প্রতিমাদেবী। ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সরকার এক অর্ডিন্যান্স জারিতে। কালীগ্রাম পরগনার জমিদারী হাত ছাড়া হয়ে গেলে। পূর্ববঙ্গে শেষ ঠাকুর জমিদার ও জমিদার পত্নীর আসা যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই ক্রমাগত অজ্ঞাত হয়ে পড়তে থাকে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বরেন্দ্রের সর্বশেষ জমিদারী কালীগ্রাম পরগণার কথা।

কিন্তু শিলাইদহ রবীন্দ্র অন্তরে জায়গা করে নিয়েছে দ্বিতীয় শান্তি নিকেতনের আবহে। শিলাইদহের এত স্মৃতি ভাণ্ডারে বাংলায় বাঙালি চিত্তে রবীন্দ্রনাথ বিস্মৃত হওয়া অসম্ভব। সেই রবীন্দ্র স্মৃতির রাজ্যে আমিও পরমভক্ত, প্রেমিক, পথিক হিসেবে ষোল এগার তিরাশি ইং বুধবার দর্শনার্থীরূপে যাওয়ার, উপভোগের সৌভাগ্য হয়। এটি জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিন। বাংলা সাহিত্যের চীর অপারাজেয় সম্রাট কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়ি দর্শন। যেন সুরের নির্ঝর সেখানে আকাশেবাতাশে, গাছে প্রান্তরে। “কুষ্টিয়া জেলা শহর থেকে আট কিলোমিটার দুরে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি” সকাল দশটায় রিকশা যোগে গড়াই নদীর ঘাট। নৌকা করে ছোট নদীর অপর পাড়ে। এর পর দীর্ঘ চার মাইলের পথ। এক ঘোড়া বিশিষ্ট টমটম, গরুর গাড়ি এছাড়া আর কোন যানবাহন ব্যবস্থা নাই। এও সংখ্যায় কম। শিক্ষা সফরের অনেকের সাথে পায়ে হেঁটে হেঁটে এগুতে লাগলাম। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নগাঁথা পল্লীর মোহমায়া আবহে কণ্ঠেআবাহনে, কবিতায়, সকলের কণ্ঠে, কবির পদচারনার, ধূলাবালির পবিত্র সত্য চিহ্নত আবেগ সকলকে, উচ্ছ্বাস, মোহাবিষ্ট করে তুলেছে। “দুপুর পৌণে বারটায় একটুকু ছোঁয়া লাগে একটুকু কথা শুনি তাই নিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনী”/ গেয়ে গেয়ে শিলাইদহ, অপেক্ষার বাঁধ ভাঙা কুঠিবাড়িতে পৌঁছি। দারুণ মনোহরণকারী সৌন্দর্য্যের ফুলও সবুজের সমারোহে নন্দনকানন-“কুঠিবাড়ি” । সরকারি রাস্তাটি ছেড়ে সোজা উত্তরদিকে কিছুটুকু এগুলেই দেখা যায় “কুঠিবাড়ি”। কুঠিবাড়ির প্রাঙ্গণের বাইরে ঘাটায় আছে একটি মনোরম রেষ্ট হাউজ এখানে পর্যটকদের থাকার বন্দোবস্ত আছে। বাড়ির অঙ্গনের বাইরে আছে আম অশ্বত্থ ও বটবৃক্ষকে ঘিরে ঘিরে কয়েকটি পাঁকা বেদী বসার জন্য। বাড়িতে প্রবেশ করার দুটো ফটক আছে। একটা উত্তর দিক থেকে অন্যটা পশ্চিম দিকের পুকুর থেকে। উত্তর দিকে ফটকটা পেরুলেই সামনে পড়ে দুই/তিন হাত চওড়া একটি পাকা রাস্তা। এর দুপাশে আছে কচি সবুজ ঘাসের চত্বর আর বিভন্ন ফুলের সমারোহে গাছ আর ঝাউ গাছের সমাবেশ। আট/দশ গাত লম্বা এই রাস্তাটি পেড়িয়ে আমরা তার আড়াইতলা কুঠিবাড়ির সিঁড়িতে পা রাখি। নিচের তলায় ডান দিকে আছে তাঁর লাইব্রেরি। বাইরে উল্লেখ আছে কবিগুরুর অনেক গান, গ্রন্থ, কবিতা, যা তিনি এখানে বসেই রচনা করেছিলেন। এছাড়াও রয়েছে রবীন্দ্র পত্রগুচ্ছ, শিলাইদহে কথা ও শিলাইদহে রচিত রবীন্দ্র সাহিত্য সম্ভারের বিবরণ। জাতীয় রবীন্দ্র উৎসব সংকলন সজ্জিত লেখাগুলো হচ্ছেশিলাইদহ পরিচয় (সচীন্দ্রনাথ অধীকারী) শিলাইদহের স্মৃতি (রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর) শিলাইদহে রবীন্দ্রবাবু (যতীন্দ্রনাথ বসু) শিলাইদহে রবীন্দ্র স্মৃতি (মোহিতলাল মজুমদার) সাহিত্য তীর্থ শিলাহদহে (সৈয়দ মুতর্জা আলী) শিলাইদহে (মৈত্রেয়ী দেবী) রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহ (আজিজুর রহমান) সোনার বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ১৮৯১১৯০১ (শ্যামল কান্তি চক্রবর্তী) শিলাইদহে দ্বিতীয় শান্তি নিকেতন (নেপাল মজুমদার) শিলাইদহে কুঠিবাড়ি (আনোয়ারুল করিম) শিলাইদহ থেকে বিদায় (প্রমথনাথ বিশী) শিলাইদহে রবীন্দ্র মেলা (ডা. আশরাফ সিদ্দিকী) শিলাইদহ পর্ব ও চিত্রাশিল্পী রবীন্দ্রনাথ (সৌমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়) রবীন্দ্রনাথ ও শিলাইদহের বাউল সম্প্রদায় (আবুল আহসান চৌধুরী) ইত্যাদি।

দ্বিতীয় কক্ষে আছে তাঁর আলমারি ও জমির কাজে ব্যবহৃত রোলার। তৃতীয় একটি বড় কক্ষে আছে তাঁর আপন হস্তে দুর্লভ ও মূল্যবান অনেকগুলো চিত্র। যার মধ্যে বেশ ভালো লেগেছে অদ্ভুত “প্রতিকৃতি” “চরিত্র চিত্রণ” “সাতটি মানুষ” “জানালায় দুটি মুখ” “উপবিষ্ট পুরুষ” ইত্যাদি। চতুর্থ ক ে আছে তাঁর ব্যবহৃত দুচো “ষোল বেহারার পালকী” ও দুটো “হাত পালকি” । এরপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই চোখে পড়ে আপন চিত্র সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব বক্তব্যটি। উপরে উঠে আমরা প্রথম যে বড় ঘরটিতে গেলাম তাতেও আছে তাঁর অঙ্কিত অনেকগুলো চিত্র। দ্বিতীয়টি কবিগুরুর শোবার ঘরএখানে আছে একটি সুন্দর পালঙ্ক, আলনা, লেখার টেবিল, বুক সেলফ, টেবিলের উপর একটি সুন্দর টেবিল। খাপও তরবারি দেওয়ালে। চতুর্থ কক্ষে আছেতাঁর জীবনের বহুবহু স্মরণীয় ঘটনার আপনালয়ের বাঁধানো ছবি। বোট চপলা, পলটুন, বাইরে দরজায় নিচে চিঠি ফেলার বক্স। এরপর গেলাম কুঠিবাড়ি ছাদের উপর ছোট একটি ঘরে। সেখানে বসলে সম্পূর্ণ পদ্মা নদী ও শিলাইদহের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়। কবিগুরু এখানে বসেই চাঁদের আলোর সাথে বাতাসে দোলার সম্পর্কে আসক্ত হতেন আর রচনা করতেন গানকবিতা, গল্প। এরপর একেবারে নিচে এসে বাড়ির পশ্চিম ফটক দিয়ে গেলাম পুকুর পাড়ে। এই ফটকে দুপাশে বিভিন্ন সুন্দর ফুল ফুলরাজির গাছ এবং মাঝখান দিয়ে সরু রাস্তা পুকুরে যাওয়ার। পুকুরের পূর্বদিকে সানবাঁধানো ঘাটলার পাশে বকুলতলা এবং চারপাশে কুটিবাড়ির চত্বরের গাছগাছালি যেন উদাস আরণ্যক পরিবেশ। প্রত্যেকটি গাছ সমান্তরাল ভাবে দাঁড়িয়ে আছে, বাতাসের সাথে একইভালে হেলছে দুলছে এক আধটু নড়ছে মাথা। পুকুর পাড়েতে আছে সবুজ ঘাস যেন সবুজ গালিচা এত পরিচর্যা। আর জলেতে শাপলা ফুল ও তার সবুজ সবুজ বড় পাতা। কোথাও কলমি উঁকি দিয়ে চায় পাড়ের কোনায়। শেওলা দোলে ঘাটের চরণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। সত্যিই কবিগুরুর সাজানো নি:সর্গ প্রশংসামুখর। বাড়ি থেকে পুকুর যাওয়ার পথে আছে একটা পাকা কুয়া এ নিয়েও কবিগুরুর রচনা আছে।

রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির সবকিছু সুরছন্দলয়ে আবদ্ধ সৌন্দয্য বৈচিত্র্য। এখানে জীবন আর প্রকৃতি একাকার হয়ে মিশে আছে। আর যেন বলছে,- এমর ঐমঢ ওদটপণ, ঔমফঢ হমলর্ লভথ, টভঢ ফর্ণ বণ ফমশণ, দোহাই পৃথিবী তোদের/ একটুকু চুপ কর/ ভালবাসিবার তরে আমারে দে/ একটুকু অবসর।

কুঠিবাড়িএ যেন কাকের চোখের মতন, কালো চুল এড়িয়ে, পানিতে পা ডুবিয়ে রাঙা উৎপলা যার উপমা। যেন এক সিক্ত নীলাম্বরী একগুচ্ছ স্নিগ্ধ অন্ধকারের তমাল।

এখানে এসে কবিগুরুর গানে কবিগুরুকে শ্রদ্ধা ভালবাসা না জানালে নয়। মন আনন্দ আস্ফালনে গায়/আমায় থাকতে দেনা আপন মনে/ কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা / সার্থক জনম আমার জন্মছি এই দেশে / ভালবেসে সখি নিভৃত যতনে /এই কথাটি মনে রেখ।

তিনটায় বিকেল গড়িয়ে আমাদের ফিরতে হবে। চলার পথে পেছনে যত তাকাই ততই মনে হয় কুঠিবাড়ি বলছেযেতে নাহি দিব / তবু যেতে দিতে হয় /তবু চলে যায়। মনে অশনি সময় ঝড় তুলছে ফিরতে চায় না মন। ব্যথিত চিত্তে যখন হাঁটছি একপা একপা করে সামনের দিকে। পেছন থেকে বাতাসে যেন ভেসে আসে সেই কবিগুরুর কবিতাটির সুরসেই পুরাতন চোখে/মাঝে মাঝে চেয়ো সখি/উজ্জ্বলিয়া স্মৃতির মন্দির/ এই পুরাতন প্রাণে মাঝে মাঝে এসো সখি/শূণ্য আছে প্রাণের কুঠির।

তোমার টানে আমার ছন্দ পাখা মেলে বলে

তোমায় ভুলিবার নয়,

তুমিতো করেছো, জয় বিশ্বময়।

তোমার সুরে কেটেছে, য়ের ভয়,

মিলন বন্ধনে সমাজে, কুসংস্কারের হয়েছে লয়।

তুমি বাংলার আকাশে ধ্রুবতারা, দেদীপ্য উজ্জ্বলময়,

স্নিগ্ধমায়ার বেঁধেছো মানুষেরে, প্রকৃতিকে আপনালয়।

তোমার সোনারতরী, ভরা ফসলে চীর পূর্ণ অক্ষয়,

বিশ্বসমাজে তোমার সত্য, তোমাকে করেছে আলোকময়।

তুমি একা নও, বাংলা ও বাঙালি, যত আছে আপাময়,

বিজয়টিকা কমালে এঁকেছো, তোমারি হোক জয়।

LEAVE A REPLY