আলী প্রয়াস

অনুপম সেন বহুমাত্রিক বিরল প্রতিভার অধিকারী প্রাতিস্বিক চেতনার একজন প্রাগ্রসর চিন্তক। মূলত সমাজবিজ্ঞানী। পাশাপাশি তিনি একজন সুলেখকও। নিরলস সাধনার মধ্য দিয়ে চিন্তা, দর্শন ও উপলব্ধির গভীরতায় নির্মাণ করেন অতুলনীয় সব সৃষ্টিসম্ভার। সমাজবিজ্ঞানের গবেষক হয়েও তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগবশত সৃজনশীল কর্মে তাঁর প্রতিভার উন্মেষ ও উৎকর্ষ ঘটিয়েছেন। আলোচ্য গ্রন্থটি অনুপম সেনের প্রথাগত ধারার বিপরীতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি গ্রন্থ, যার নাম ‘আদিঅন্ত বাঙালি : বাঙালি সত্তার ভূতভবিষ্যত’। গ্রন্থটি পাঁচটি মৌলিক মননশীল প্রবন্ধে অনন্যতা পেয়েছে। যার বিষয়বস্তু ভাষা ও বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক ইতিবৃত্ত। অতি আবেগী ভাষায় লিখিত প্রবন্ধাবলীতে ওঠে এসেছে হাজার বছরের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, প্রাচ্যপাশ্চাত্য দর্শন, ইতিহাস, বাঙালির রেনেসাঁস ও রাষ্ট্র চেতনার কথা। গ্রন্থের পাঁচটি প্রবন্ধের নাম হচ্ছে

.বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান : বঙ্গবন্ধুর এক অনন্য ভাষণ

. জীবনের সব ক্ষেত্রে বাংলার প্রয়োগ

. নিজের রাষ্ট্র নিজের ভাষা

. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ : বাঙালি চিরকাল তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।

. আদিঅন্ত বাঙালি : বাঙালি সত্তার ভূতভবিষ্যত

পাঁচটি প্রবন্ধের দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে প্রবন্ধের মূল বিষয়ের সংক্ষিপ্তসার আলোচনার প্রয়াস চালাব। প্রথম প্রবন্ধ– ‘বাঙালির প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান : বঙ্গবন্ধুর এক অনন্য ভাষণ’। প্রত্যেক জাতির জীবনে তাঁর ভাষা, স্বাধীনতা, রাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাঙালি জাতির জীবনেও তাঁর নিজস্ব ভাষা, ভাষার সাথে জাতিসত্তার সম্পর্কসূত্রের ভেতর দিয়ে লাভ করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালেই বাঙালি প্রথম একটি স্বাধীন ভূখণ্ড লাভ করে এবং সেই সাথে স্বীকৃতি পেয়েছে নিজ রাষ্ট্রের সংবিধান। লেখক এই সত্য কথাটি তাঁর নিজস্ব চিন্তার আলোকে যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে তিনি একটি জাতি সত্তার ইতিহাস অতি অল্পকথায় শেষ করে দিয়েছেন। যা পাঠক হিসেবে আমাদের অতৃপ্ততা থেকে যায়। তবে প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে ৭ মার্চের ভাষণ ও ৪ অক্টোবর ১৯৭২ সালের আরেক অসাধারণ ভাষণ সম্পর্কে অত্যন্ত যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছেন।

দ্বিতীয় প্রবন্ধ– ‘জীবনের সব ক্ষেত্রে বাংলার প্রয়োগ’ শীর্ষক লেখায় নিজের ভাষা চর্চার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে ভাষার সাথে জাতিগত উন্নয়ন ও অগ্রগতির সম্পৃক্ততা উল্লেখ করেন। এ প্রবন্ধে বাঙালির ইংরেজি চর্চা তথা ইংরেজি ভাষার প্রতি বাঙালির আদিখ্যতার অভিযোগ তুলে বলেন

আমাদের বিদ্বৎসমাজের বেশ বড় একটা অংশ ভাবেন, কেবলমাত্র ইংরেজি চর্চার মাধ্যমে, ইংরেজি শিখলেই আমরা উন্নত রাষ্ট্র হতে পারবো, অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করবো।’ (পৃ. ২৩)

বস্তুতপক্ষে বাঙালির ভাষা সংগ্রামের অর্ধশত বছর অতিক্রান্ত করলেও সর্বস্তরে বাংলাভাষা এখনো প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য বাঙালি হিসেবে কোনভাবেই ইতিবাচক সংবাদ হতে পারে না। কিন্তু এটা সত্য যে, যেকোনো জাতির অগ্রগতি, জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পেছনে তার মাতৃভাষার অবদানই অধিক। তিনি বলেন-‘ভাষাভিত্তিক জ্ঞানই একটি জাতিকে এগিয়ে নেয় এবং এ ক্ষেত্রে মাতৃভাষাই সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম।’ (পৃ. ২৩)

সুতরাং ইংরেজির মতো কেবল কর্পোরেট ভাষা দিয়ে একটি জাতির সার্বিক উন্নতি কখনোই আশা করা যায় না। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় মাতৃভাষাই মূল আরাধ্য হওয়া উচিত বলে অনুপম সেন তাঁর প্রবন্ধে তুলে ধরেন।

এরপর লেখকের ‘নিজের রাষ্ট্র নিজের ভাষা’ অত্যন্ত উৎকর্ষপূর্ণ ও ঋদ্ধ একটি প্রবন্ধ। তিনি বলতে চান, ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের আগে পর্যন্ত এজনপদের মানুষ প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতা পায়নি। এবঙ্গে অনেক স্বাধীন নবাব ও সুলতান ছিলেন, কিন্তু বাঙালি স্বাধীন ছিলেন না। ১৭৫৭ সালের পরাজয়ের পরবর্তী ঐতিহাসিক দিকগুলোর ইতিকথা ব্যাখ্যা করে একটি রাষ্ট্রের স্বাধীনতার মাধ্যমে একটি নিজস্ব ভাষার স্বীকৃতির তাৎপর্য ও একটি জাতিসত্তার পূর্ণ বিকাশের দিকগুলো বর্ণনা করে বাংলা ভাষার অবস্থান নির্ণয় করেন।

লেখকের পরবর্তী প্রবন্ধ ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ : বাঙালি চিরকাল তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে’ একটি সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের মাধ্যমে বিশারদভক্ত অনুপম সেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম গবেষক আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ এর কীর্তিগাঁথা নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা করেন। অনুপম সেন তাঁকে মনে করেন জ্ঞানের উপাসক ও নিষ্ঠাবান গবেষক হিসেবে। তিনি ইতিহাস ও সাহিত্য গবেষণায় এই মুসলমানের অবদানের কথা পরম শ্রদ্ধাভরে বাঙালি জাতি স্মরণ করবে বলে প্রবন্ধে উল্লেখ করেন। তিনি সাহিত্যবিশারদকে আচার্য হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করেন।

বইয়ের সর্বশেষ ও নামীয় প্রবন্ধ ‘আদিঅন্ত বাঙালি : বাঙালি সত্তার ভূতভবিষ্যৎ’। এটি অত্যন্ত মননসমৃদ্ধ একটি প্রবন্ধ। ব্যাপক ও বিস্তৃত আলোচনার মধ্য দিয়ে লেখক বাঙালি জাতির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় তুলে ধরেন। বাঙালির আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, বাঙালির ইতিহাসঐতিহ্য, বাংলা ভাষা, বাঙালির রেনেসাঁস ও জাতিগত বিকাশের কথা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন একই সাথে বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদের প্রভাবে আমাদের ভাষাসংস্কৃতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ও বাঙালি হিসেবে ভবিষ্যতে আমাদের করণীয় কি হবে তাঁর বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তাঁর এ বর্ণনা অত্যন্ত তথ্যনির্ভর, গভীর ও তাৎপর্যমণ্ডিত। তিনি তাঁর এ প্রবন্ধের ৫টি পরিচ্ছেদ জুড়ে প্রাচীন মধ্য যুগের বাঙালির ঐতিহাসিক পরিচয় বিধৃত করেন এবং ৬ষ্ঠ পরিচ্ছদ থেকে ইংরেজি শাসনামলে যেদুটি নবজাগরণের উন্মেষ ঘটেছিল তার কথা উল্লেখ করেন। এসময় ইংরেজ অভিঘাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ও শিল্প সাহিত্যের ব্যাপক জাগরণের ফলে সৃষ্টিবৈচিত্রের কথা তুলে ধরেন। অষ্টম পরিচ্ছদে বাঙালি জাতির সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদের নগ্ন অভিঘাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন।

——————–

আজকের এই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব থেকে মুক্তি পেতে বাঙালিকে মনেপ্রাণে বাঙালি হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বাঙালির কাছে আজ আর বাঙালির দর্শন নেই। নেই তার জাতীয়তাবোধের আত্মশক্তি ও সাহস। যা দ্বারা একদিন সে শিরদাঁড়া সোজা করে বৈশ্বিক চেতনা ধারণ করতে পেরেছিল। আজকের বাঙালিকে আর ইতিহাসের ধারায় খুঁজে পাওয়া কিংবা চিনে নেয়া কষ্টকর। তার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ব্যাপ্তি ক্রমাগত রাজনৈতিক বেনিয়া, বিশ্বায়ন এবং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক সংস্কৃতির হাতে লুণ্ঠিত হতে হতে আজ এক ক্ষীণ দীপশিখা মাত্র। ড. অনুপম সেন তাঁর সুলিখিত বই-‘আদিঅন্ত বাঙালি, বাঙালি সত্তার ভূতভবিষ্যৎ’তে এই কথাই বলেছেন

আমাদের বাঙালি সত্তাকে রক্ষা করতে হলে, আমাদের আদিঅন্তে বাঙালি হতে হলে বিশ্ব পুঁজিবাদের আগ্রাসন বা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আমাদের মানস পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ঠেকাতে হবে। এদের মূল উদ্দেশ্য জীবনকে পণ্যাশ্রয়ী করা, পণ্যে পরিণত করা; অবশ্য তা থেকে ফেরার চেষ্টাও চলছে আজ বিশ্বব্যাপী। বারবার পুঁজির বিপন্নতার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদ নিজেই তার দৌর্বল্যকে বিশ্বের নিপীড়িত নিগৃহীত মানুষের কাছে তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছে। এরই মধ্যে দিয়ে দেশে দেশে এই সত্য ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে, পণ্য নয়, মানুষের যা প্রয়োজন, মানুষ তা নিজেকে পণ্যে পরিণত করে পাবে না। পণ্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে হবে। পণ্যকে তার বশে আনতে হবে। ঋসডদটভথণ গটফলণএর পরিবর্তে বস্তুর খ্রণ গটফলণ কে ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশ্ব প্রকৃতি আমাদের যা দিচ্ছে তাকে নিরবচ্ছিন্ন পণ্য প্রবাহে রূপান্তর না করে আমাদের জীবনের সহায়ক শক্তিতে পরিণত করতে হবে।’

নিজের রূপে বিশ্বরূপ প্রতিফলিত করবার অহংবোধ বাঙালিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একমাত্র পথ। ‘আমরা বাঙালি’চির নতুন ও শাশ্বত এই সত্য ও রাজনৈতিক দর্শনকে ধারণ করাই আজকের জীবন চলার পথে বাঙালির প্রাথমিক ও প্রধান কাজ। তিনি বাঙালির প্রতি গভীর আস্থাশীল, তাঁর অপার বিশ্বাস বাঙালি ঘুরে দাঁড়াবেই একদিন। সময়ের যে দৃশ্যমান সংকট তা সাময়িক। তিনি বলেন

বাঙালির জীবনে আজ যে অন্ধকার, যেদৈন্য তাৎক্ষণিকের বলেই আমি বিশ্বাস করি। বাঙালি আবার উঠবে, জাগবে, কারণ তার সংস্কৃতিতে, তার জীবনবোধে সেই গভীর প্রত্যয় রয়েছে। আদিঅন্ত বাঙালি হয়েই বাঙালিকে বিশ্বসভায় তার আত্মশক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর জন্য যা প্রয়োজন তা হলো নতুন প্রজন্মের কাছে তার হাজার বছরের সংস্কৃতির দিকগুলো তুলে ধরা, তার উপলব্ধিতে সর্বমানবের মুক্তিসংগ্রামকে জাগ্রত করা। বাঙালিকে বিশ্বের সব সংগ্রাম মানুষের সঙ্গে এক হয়েই এগোতে হবে তার বন্ধন মুক্তির জন্য, তার আত্মসত্তার পূর্ণবিকাশের জন্য।’ (পৃষ্ঠা৬২)

অনুপম সেন বিশ্বায়ন পুঁজিবাদ ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বরূপ উদঘাটন করে এখানে শুধু বাঙালি নয়, পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি গোষ্ঠীর ভবিষ্যত করণীয় সম্পর্কে অসাধারণ ও যৌক্তিক দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। আমাদের ভেতরে বাঙালি চেতনা কিভাবে কাজ করতে হবে কিংবা হাজার বছরের ঐতিহ্যিক বাঙালি হিসেবে আমাদের বৈশ্বিকভাবনা কি হওয়া উচিত তারই চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন তাঁর মূল্যবান প্রবন্ধে

প্রকৃতবাঙালি হতে হবে বিশ্ব নাগরিক হয়েই; নিজের মানবসত্তার পূর্ণতাদেয়ারসংগ্রামের সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মানব সত্তার পূর্ণতাদেয়ার প্রতিজ্ঞা যুক্ত করেই। বাঙালির এই সংগ্রাম এখনো অপূর্ণ, বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সঙ্গে তাকে আরো বহুপথ হাঁটতে হবে। এই পথ চলায় তার পাথেয় হবে নিজের হাজার বছরের ঋদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, তার মুক্তিসংগ্রামের অঙ্গীকার।’ (পৃষ্ঠা৬৩)

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ, বাংলাভাষা এবং বাঙালি জাতির আত্মবিস্মৃত অবস্থার পরিবর্তন কামনা করেছেন। এভাবেই লেখক অনুপম সেন বইয়ের প্রত্যেকটি প্রবন্ধে তাঁর চিন্তাশক্তির স্বাক্ষর রেখেছেন। এটি একটি অতি মূল্যবান বই। যারা নিজেকে বাঙালি ভাবতে ভালোবাসেন সেইসব পাঠককে এই বইটির স্বাদ নেয়ার আহ্বান জানাই।

LEAVE A REPLY