ইলিয়াস বাবর

বৃষ্টি হলেই মন আমার উড়ক্কু হয়ে যায়!

অলস বসে থাকবো সে জোও নেই। ছাপোষা চাকরিজীবী মানুষের কি আর বিরতি বলে কিছু আছে, জীবনে? দৌড়ের উপর থাকতে থাকতে অনুভূতি ভোতা হয়ে আসে। নিচে নেমে আসে শখআহ্লাদের মাত্রা। বাসে উঠি কাকভেজা হয়ে। বেখেয়ালে অথবা শরীরেরই ভারসাম্য রাখতে না পেরে পা বসিয়ে দেই অন্য যাত্রীর পায়ে! নীরহগোছের কেউ স্বাভাবিক নাগরিক বিড়ম্বনা হিসেবে মেনে নিলেও ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। বিকৃত চেহারার ভেতরকার রুচিটুকু দেখিয়ে দেয় বাসভর্তি মানুষদের সামনেএ্যা, প্রাইভেট গাড়িতে যাইতে পারেন না, চোখ কি বাসায় রাইখ্যা আইছেন? আমি চুপ থাকি নিজেরই দোষে। হাতে প্রতিদিনকার ব্যাগ। ব্যাগে অফিসের প্রয়োজনীয় ফাইল, দুপুরের খাবার। ভোরে উঠে নিজে তৈরি হয়ে, ছেলেকে স্কুলের জন্য রেডি করার আগে চুলোয় চাল চড়াতে হয় তানিয়াকে। আমার অফিস আছে অজুহাতে হাজার কাজ দূরে ঠেলত পারি কিন্তু তানিয়ার চাকরির বেতনের টাকায় সংসারের সমান অংশগ্রহণ থাকে তা আমিও তো জানিকই কখনো বলিনি তুমি আরেকটু ঘুমাও সোনা। কোন কোন দিন গ্যাস থাকে না, পানির লাইনেও শায়তানি খেলা করে মাঝেমধ্যে। তবুও মুখ মলিন দেখিনি তানিয়ারবিয়ের সাত বছরের মাথায়ও। অথচ, এই লোকবেখেয়ালে একটু পা লাগায় এত কথা শুনিয়ে দিল! প্রতিবাদ যে করবো সে ভাষাও নেই, দোষ তো আমারই! তাছাড়া প্রতিবাদকারির চুলদাড়ি সাক্ষী দেয়তিনি মামার বয়েসি। জীবনের অলিগলিতে দেয়া শ্রমে তিনি ক্লান্ত, খানিকটা বিরক্তও মনে হয়। এক হাতে ব্যাগ, অন্যহাতে ছেলে মিহির। অফিসমুখী মানুষদের তাড়া দেখে দেখে আমরা বাপবেটা হাসি ভুলে যাই। ঘটনার অকস্মিকতায় মিহির অন্য দিনের মতো এটাওটা নিয়ে প্রশ্ন করে না। সেও কী তবে বাপের অপমান বুঝে গেল! বাবার কাছে সন্তান ছোট থাকে সবসময়, সন্তানের কাছে বাবাও বড়অনেক বড় বটবৃক্ষ। বাবার গ্লানিতে মিহিরের কোমল চেহারায় কেমন একটা বেদনারেখা এঁকে দেয় সকালের বিধ্বস্ত আবহাওয়া।

বাইরে বৃষ্টিজানলার কাঁচ বেয়ে ভেতরে ঢোকার পথ খোঁজে। বাস চলছে মোটামুটি গতিতে। যাত্রী একটু বেশিই। তবুও হেলপার ডাকছেআসেন ভাই, আসেনমহিলার সিট আছে। এই ভাই পেছনে যান, ভেতরে যাবার পথ ক্লিয়ার রাখেনরাস্তার কোথাও কোথাও পানি জমে গেছে। গতকাল অফিস থেকে ফেরার সময় কোন এক রাজনৈতিক দলের কর্মীদের োগান শুনিউন্নয়নের নমুনা, বৃষ্টি হলেই যমুনা…! আমজনতা স্রোগানে নতুত্বে আর প্রাসঙ্গিকতা দেখে চোখ টিপে হাসে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেউ কেউ থাকে সমাজের তে মলম দেয়ার কাজে। রাজনীতিকে এখনো রেখেছে মানুষের কল্যাণেসমাজের মানবিক চোখকে সচল রাখতে তরুণদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মতো। রিক্সা চলছে হুড নামিয়ে, সামনে পর্দা। আজকের পরিবেশ প্রেম করার পক্ষে বড় বেশি মানিয়ে যায়। ছাত্রজীবনে বন্ধুরা এরকম বর্ষার দিনে কলেজে আসতো না খুব একটা। পরে, সুবিধামতো আড্ডায় নিজেদের প্রেমিকহৃদয়ের বাসনা আর কাছাকাছি হওয়ার গল্প করতো দাঁত খেলিয়ে। সমির আর আমি অসহায়ের মতো চেয়ে থাকতাম। শালার এবর্ষায় একটা প্রেমিকা পেলাম না! ছিল সাহসের অভাব। গ্রাম থেকে উঠে আসা ছাত্রটির মনে ভয় আর শঙ্কার যুগপৎ যাপনে প্রেম ধরো ধরো করেও ধরা দিতো না। কত জনের প্রেমে পড়তাম মনে মনে, কত বার। মুখ খুলে বলার সাহস না ছিল আমার, না ছিল সমিরের। হয়তো এ কারণেই আমাদের জমতো ভালো। কাশেম, হৃদয়, জিকুরা প্রেমবিষয়ক কথাবার্তা শেষে চলে গেলে আমরা পরস্পরে গলা মিলিয়ে বলতামযা, ভালো করছো মনু! পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হলেই বুঝতে পারবা, হাহাহাথেকে থেকে বজ্রপাতের মৃদু হুংকারও শোনা যাচ্ছে। মনের পর্দায় শিরিনকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। আহা, মেয়েটি ক্লাস টেনের শেষ সময়ে এসে আমাকেই অফার দেয় চিটির বুকে করে। খুব সুন্দর হাতের লেখায় তার হৃদয়ের আকুতি আঁকা ছিল কিশোরীমনের চঞ্চলতায়। আমাদের প্রেম গভীর হলে ঘোর বর্ষার মেঠোপথে স্কুল থেকে যাচ্ছি দু’জন পাশাপাশি হেটে। আশেপাশের সামাজিক বনায়নের বৃক্ষ সারি সাক্ষ্যি রেখে আড়চোখে দেখিজনমানবহীন রাস্তায় পথচারীর এ আকালে শিরিনের ছাতায় ঢুকে গেলে মন্দ হয় না। মনের দ্বন্দ্বে আপস করে শিরিনের ছাতায় সহযাত্রী হয়ে তারই অজান্তে আপেল গালে বসিয়ে দেই অভিজ্ঞতাহীন চুমুর দাগ! কিছুৃ একটা বলার সুযোগ না দিয়েই একা ভিজে বাড়ি গিয়ে দেয়ালের আয়নায় লক্ষ্য করি আমারই নাকের নিচে অস্তিত্ব ঘোষণা করছে গোঁফ! একটু বড় হয়ে যাওয়ার শরমে শিরিনের সামনে পড়ি না অনেক দিন। এখন সে প্রবাসী স্বামীর হাত ধরে হয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশের ব্যবসায়ী। ছেলে আমার পাশে বসা, উপভোগ করছে প্রকৃতির উপদ্রব। কিচ্ছু না এসব। এতটুকুন বয়সে সেও মানিয়ে নিয়েছে ঋতুর খেলা। মিহিরকে আজ স্কুলে না আনলেও কি চলতো না? আমরা মনেপ্রাণে চাই ছেলে নিয়মিত স্কুলে যাক, পড়াশোনায় সামনের দিকে থাকুক। বাইরের পরিবেশ এত জগণ্য হবে তা হয়তো তানিয়াও ভাবেনি। মা হিসেবে সেও চায় তার ছেলের রেজাল্টকার্ডে লেখা থাকুক প্রথম স্থান অধিকারের তকোমা। জীবনে, সামাজিক অবস্থানের কেইবা পিছিয়ে থাকতে চায়? দৌড়লাগা সময়ে!

গাড়ি চলছে তারমতো। যাত্রী উঠানামা থেমে নেই। এই সকালেও বৃষ্টির বেদিশা আবদারে ফ্রেস মুখাবয়ব আর পোশাক আশাকে কেমন যেন ক্লান্তি, বিরক্তির চরম প্রকাশ টিকরে পড়ছে নিজেদেরই অলক্ষ্যে। গ্রামে থাকলে মা নিশ্চয়ই শিমের বীজ ভেজে দিত, চাল ভেজে দিত। রান্নাঘরের মৃদু উত্তাপে ভাইবোনেরা খেলতাম; ভাজা চাল আর বীজের ভাগাভাগিতে চলতো ঝগড়া। মায়ের হস্তক্ষেপে, একটু তিরস্কারের দাওয়ায় ভাইবোনেরা আবারো মিলে যেতাম। এভাবেই চলতো বেশ। টিনের চালে বৃষ্টির দারুন সুর আর বাতাসের দ্বন্দ্বে গোয়ালের গরুগুলো কেমন অলস জাবর কাটতো। বাবা আমার ওসব আহ্লাদে নেই। গ্রামের হলেও শক্তমনের, অভিজাত রুচির মানুষ ছিলেন তিনি। রান্নাঘরে খেতেন না। বড়ঘরে তার জন্য আলাদা খাবারের আয়োজন রাখতেন মা। আমরা প্লেটবাটি এগিয়ে দিতাম। ভাইবোন বলতে মোটে তিনজন। গ্রামে, আটদশজন ছেলেপুলে না থাকা মানেই ছোট পরিবার। বেহুদা হৈচৈ আমাদের ঘরে ছিল না। বড়ভাই আমার বয়সে বেশ এগিয়ে। তার জন্মের প্রায় দশবছর পরে আসে তুতলীআপা। আপা এখন মেয়ের বিয়েথা দিয়েছে। বেয়াইবাড়িতে যাওয়া আসা করে পানের রসে লাল হওয়া দাঁত নিয়ে। সর্বশেষ আমার আগমনে মাবাবা খুব খুশি হয়। বড়রা মেতে থাকে আমাকে নিয়ে। ঝগড়াটাও বেশি হয় আমার খেলনা নিয়ে, ভাগাভাগি নিয়ে। বাবা দূর থেকে হাসতেন আমাদের কাণ্ড দেখে; কাছে আসতেন নাযদি আমরা রণে ভঙ্গ দেই! গোপনে তিনি উপভোগ করতেন সংসারের সৌন্দর্য, প্রয়োজনেরও অধিক যুগিয়ে রাখতেন নিত্য দরকারি সবকিছু। সন্তানদের সাথে সহজ হওয়া তার ধাতে ছিল না। হাসতেন লুকিয়ে, নিজের ভাব বজায় রেখে। মা আমার মাটির মানুষ, তিনি বয়স বাড়ার সাথে সাথে ছোট হয়ে যেতেন সন্তানদের প্রয়োজনে, গেরস্থের দরকারে। স্বামীর কঠিন ব্যক্তিত্বের নিচে মা আমার ছড়িয়ে দিতেন যাবতীয় মায়া আর সংসারের সংযোগ। সন্তানেরা বেড়ে উঠতাম এরই ভেতরেআনন্দবেদনার আপাত সরল সমীকরণে।

এরকম বর্ষায় বড়ভাই আমার মাছ ধরতে যায় বিলে। জলতলে পুকুর বিল একাকার। মাছ ধরায় ব্যস্ত গ্রামের ছেলেবুড়ো। কত রকমের জালের ব্যবহার! আমার বয়স তখত দশের ঘরেমা বাইরে যেতে দেন না সাঁতারে অপরিপক্বতার অজুহাতে। বড়ভাই প্রথম প্রথম চাচাদের সাথে ঘরের পুকুরে মাছ ধরতে সাহায্য করতেন। পাড় বেয়ে পানি চলাচলের জায়গায় জাল ফেলে ধরতেন পুকুরেরই রুইকাতলামাগুরশিংশোল মাছ। মাছের সংখ্যা বাড়তির দিকে থাকা মানে চাচাদের মুখ উজ্জ্বল হওয়া। বড়ভাই ডুলা নিয়ে থাকে চাচাদের পাশে পাশে। আমরা রান্নাঘর থেকেই দেখি ওসব আনন্দকর্ম। মা চুলার ছাঁই আর দা নিয়ে বসে জ্যান্ত মাছ কুটবার জন্যে। গত বর্ষাতেই তো ঘটেছিল ব্যাপারটা। বানের জলে প্রায় ধসে যায় রহিম চাচাদের পুকুরের পাড়। ভেঙে যায় সীমানা প্রাচীর। পুকুরের মাছ অবাধ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী হয়ে ঘোরাঘুরি করে এদিকওদিক। তাদের পুকুরের সাথেই আমাদের ভিটের শেষ সীমানা। প্রথমে মাছ পালিয়ে যাবার দোষে, পরে পাড় ভেঙে মাটি আমাদের সীমানায় আসার অপরাধে চাচাতো ভাইদের মধ্যে তুমুল কথা কাটাকাটি, মুখ চাওয়াচাওয়িই বন্ধ হয়ে যায় শেষপর্যন্ত। আমার শিশুমন বোঝে নাকেনইবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের দায় চাচারা কাঁধে নেবে? পাশাপাশি ঘর, সময়অসময়ে যাওয়াআসায় পড়ে যায় যতিচিহ্ন। মা মানা করেরহিম চাচাদের ঘরে যাবা না। মায়ের চোখ রাঙিয়ে নিষেধ করা কিংবা বড়ভাইয়ের কঠিন ভাবসাবে আমার বুঝতে অসুবিধা হয় নাএ বড় ব্যারাম! রাতে বাবা দোকান থেকে আসলে আরেক দফা শলাপরামর্শে বসে আব্বার ভাইয়েরা মিলে। রহিম চাচাদের বেয়াদবি তারা কোনভাবেই মানবে না! প্রয়োজনে আদালতে যাবে। এ্যা, এত বড় সাহস, পাড় কি আমরা ভাঙছি, বেড়া কি আমরা ঠেলছিবানের জলে কত কিছু তো ভেসে যায়! বড় আব্বা বলেনবাদ দাও ওসব, বিবাদী হওয়া গাধার লক্ষণ। ছাগলের জন্য গরু বলি দিয়ে লাভটাই কিসে! মামলাপ্রেম এক প্রকার উবে যায় বড় আব্বার যুক্তিতে। আম চুরিতে মামলা করার রেকর্ড তো এ থানার মানুষদেরই দখলেঘাইঘুই করে থেমে যায় মামলার খায়েস।

ভাইপোকে নিয়ে বর্ষার ব্যাঙডাকা সন্ধ্যায় চাচারা টর্চের চোরা আলোয় মাছ ধরতে যায় বিলে। হাতে জাল। কোমর কখনোবা বুক বরাবর পানিতে জাল টেনে দেয় চাচারা। বড়ভাই টর্চের আলো দেখায়। বড়ভাইয়ের উৎসাহি তরশুণচোখ চারদিকে দেখতে পায় আলো আর আলো। চেরাগের আলো, হারিকেনটর্চের আলো। শখের মৎস্য শিকারীরা ব্যস্ত কায়দা করে জাল বসাতে। বিকেলে গেড়ে দেওয়া জালে আটকা পড়া মাছ ধরছে কেউ কেউ। কথার ফুটানিও চলে সমানতালে। দিনে কার ঘরে কত মাছ গেছে তার খসড়াও দাঁড় করিয়ে দেয় চালাকগোছের মানুষেরা। হয়তো পরিবেশ শান্ত হলে পাড়ার চায়ের দোকানে তা দিয়ে রসালো আর উদ্ভট গল্পও বানানো যাবে! বোয়ালচিতলমাগুরশোল মাছ ধরার গল্পে জিহ্বটাও কেমন জানি জেগে উঠে ভীষণ। হয়তো তার শরীরে লেগে আছে দুপুরে বা কিছুক্ষণ আগে খেয়ে আসা হাড়ির মাছতরকারির ঝোল। বড়ভাই, রাস্তার কোল ঘেষে দাঁড়ায়যেখানটায় ঘাসেরা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে ভাটার জের ধরে। হঠাৎ তারই দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে পায়ের গোড়ালির একটু উপরে কিসে যেন বসিয়ে দেয় কাঁটাপোকামাকড়ই হতে পারে। কত ধরনের পিঁপড়ে ভেসে আসে বানের জলে! টর্চের আলো বেহুদা খরচ করে না বড়ভাই। চাচারা জালের নিপুণ ফাঁদ পেতে রাস্তায় এসে দেখে ভাইপো তাদের কিছুটা অস্বস্তিতে! পায়ের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বড়ভাই জানায়তাকে পোকায় কাটছে! চাচারা কোলে নিয়ে, পায়ে কিয়ৎক্ষতে তখন রক্ত আসছে খুব সামান্য করে। বাড়িতে আনলে, মা আমার চিক্কুর পাড়েধনরে আমার সাপে কাটছে! ততক্ষণে বড়ভাইয়ের ফর্সা পা প্রায় শ্যামলার দিকে। কী ব্যাপার? পাড়ার বৌঝিরা, অশান্ত রাতে ভিড় করে আমাদের কাচারিঘর। রহিম চাচা ডাকতে যায় এনাম বৈদ্যকে। বৈদ্য এসে, বড়ভাইয়ের পায়েযেখানে পোকা না কিসে কাটছে, বিড়বিড় করে কী যেন পড়ে ফুঁ দেয়। ধারালো ব্লেডে আঁকতে থাকে বড়ভাইয়ের পা। ভাইয়া তখন নিরব, নিথর শুয়ে থাকে কাচারি ঘরের মেঝে। আমাদেরই অগোচরে হয়তো সে মুখ লুকাতে চায় নতুন ঠিকানায়। বৈদ্য জানায়, সব শেষ! সাপে কাটার সাথে সাথে পায়ে শক্ত করে রশি দিয়ে বেঁধে দিলে বিষ শরীরে ছড়াতো না। না, সে আর নাই! বাইরে তখন বেড়ে যায় বৃষ্টির কান্না। থেকে থেকে বজ্রপাতের হুংকারে কেঁপে কেঁপে উঠে কাচারিঘরে থাকা মানুষদের প্রাণ। বাতাসের বেপরোয়া আক্রমণে গাছের ঢাল ভাঙে, টিনের চাল প্রতিবাদ করে তুমুল শব্দে। মাআপার কান্নার শব্দ বৃষ্টির সাথে মিলিয়ে বিউগলের করুণ সুরে কাঁপতে থাকে আমাদের পাড়া, হৃদয়ের ভেজা বারান্দাটি।

বাস থামে মিহিরদের স্কুলের সামনে। ছেলেকে নামিয়ে দিতে আমরা ছেড়ে দিতে উদ্ধত হই সিটের অধিকার। হেলপার চিল্লায়এই নামেন, নামেন, জি..সি নামেনআগে নামতে দিনএস.এস.সি পাস দেবার পরেই সচেতনভাবে মাবাবা আমাকে শহরে পাঠিয়ে দেয়। সরকারি কলেজে পড়াশুনার পর চাকরিতে ঢুকলেও তারা খুব আগ্রহ দেখায় না গ্রামমুখি হতে। বিয়ের দুইদিন পরেই তানিয়াকে পাঠিয়ে দেয় আমার সাথে। অনেক বলার পরেও মা রাজি হয় না গ্রামে নতুন বউকে রাখতে। বাবা মাঝেমধ্যে মাকে নিয়ে আসতেন আমাদের দেখতে। তবে কি তারা জল থেকে দূরে রাখতে, বড়ছেলের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু ভুলে থাকতেই আমাকে ব্যস্ত রাখে পোকামাকড়হীন, মাছ ধরার সুযোগবিহীন এই শহরে! কত জল গড়িয়ে গেল জলকদরের বুক হয়েমাবাবা বিদায় নেয় পৃথিবীর বুক থেকে। হয়তো ক্রমাগত শহরবাস আমাকে করে তোলে আবেগহীন, অসামাজিক। ফ্ল্যাটেই গড়ে উঠে আমাদের ভেতরকার পৃথিবী। বাড়িতে যাওয়া হয় কেবল ঈদচাঁদে। ঈদের নামাজ শেষে কবরস্থানে জিয়ারত করি মাবাবাবড়ভাইয়ের কবর। বড়ভাইয়ের কবরের সীমানা দেখিয়ে মিহিরকে বলিওই দেখো বাবা, ওখানেই শুয়ে আছে তোমার বড় আব্বা। তুমি তো কোনদিন চাচার কিংবা বড় আব্বার আদর পাওনিসালাম করো, দোয়া পড়ো। কী এক শূন্যতায় ভরতে থাকে আমার জীবনের সুখশান্তি। হেলপার বাসের দরোজা ক্লিয়ার করতে তৎপর। পেছন থেকেই ব্যস্ত একজন বলেআগে পথ সাফ কর, তারপর নামাবাসের দরোজার পঙ্গু মানুষটিকে ধাক্কা দিয়েই বলেবাম পা আগে দিয়ে নামতে পারেন না বুড়া? নামেন, নামেনপথ ক্লিয়ার করেন।

আমরা বাস থেকে নামলে মিহির বলেআব্বু দেখো না, বুড়োদাদুটির বাম পা নেই! বুড়ো যাত্রীর জামা বুকের দিকে ভেজাবৃষ্টিতে। চোখের জলেও হতে পারে!

LEAVE A REPLY