পংকজ দেব অপু

অবমূল্যায়নের ইতিকথা

২৮ জানুয়ারি প্রকাশিত হল চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের জেএসসি পরীক্ষার পুননিরীক্ষণের ফল। পুরনো ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে ৭৬৭০ পরীক্ষার্থী ১৮০৬৪টি উত্তরপত্র পুননিরীক্ষণের আবেদন করে। এতে অকৃতকার্য থেকে কৃতকার্য হয় ৫৪ জন। নতুন করে জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪৫ জন আর জি. পি. এ পরিবর্তন হয়েছে ২১৭ শিক্ষার্থীর। চট্টগ্রাম পুলিশ ইনস্টিটিউশনের শাহীন সুলতানার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো জেএসসি পরীক্ষায় এপ্লাস পাবে, কিন্তু ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত ফলাফল তার আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরালো। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় তার ফল ছিলো এপ্লাস। জেএসসিতে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষায় এপ্লাস তো দূরের কথা, সে একবারে ফেলই করেছে, এটা কিছুতেই মেনে নিতে না পেরে পুননিরীক্ষণের আবেদন করে সে। সে পায় গোল্ডেন এপ্লাস। মেয়ের এ ফলাফল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সুলতানার বাবা মসজিদের ইমাম এম. . রহিম বলেন, প্রথমে ফল দেখে আমি নিজেই ভেঙে পড়ি, এখন আমি খুব আনন্দিত, সুলতানাও দারুণ খুশি।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার শাহপীর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র শাহ্‌ আব্দুল্লাহ আরমানের ফলেও একই অবস্থা, সব বিষয়ে এপ্লাস পেলেও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অকৃতকার্য দেখানো হয় তাকে। পুননিরীক্ষণের ফল তাকে এনে দেয় জিপিএ৫ এর সাফল্য।

কেন আত্মসমালোচনা নয়?

 

দৃশ্যপট: উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার বাংলা দ্বিতীয় পত্রের একজন পরীক্ষক পরীক্ষণের জন্য উত্তরপত্র গ্রহণ করেছেন ৯০০। নির্ধারিত বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক যেখানে ৬০০ উত্তরপত্র পেয়েছেন, সেখানে তার অধীনে এক পরীক্ষক এতো উত্তরপত্র পেলেন কীভাবে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি শিক্ষাবোর্ডে কর্মরত একজনের কথা বললেন যিনি আত্মীয়তা সূত্রে এতোগুলো উত্তরপত্র পাইয়ে দিয়েছেন। তিনি তার ক্ষমতা জাহির করার জন্য এর সংগে আরও যোগ করলেনণ্ডবিয়ের খরচ বলে কথা, দুর্মূূল্যের বাজারে কে কাকে এতো টাকা দেবে? এক সপ্তাহের ব্যবধানে চার শতাধিক উত্তরপত্র পরীক্ষা করে তিনি হানিমুনে চলে গেলেন কক্সবাজারে। নিরীক্ষক তার পরীক্ষিত উত্তরপত্রে খুঁজে পেলেন অসংখ্য ত্রুটি। অবশেষে পরীক্ষক স্বীকার করলেন উত্তরপত্র মূল্যায়নে তার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। অথচ তার হাতেই তুলে দেওয়া হলো ৯০০ শিক্ষার্থীর জীবন।

দৃশ্যপট: প্রধান পরীক্ষকের নিরন্তর তাগাদা সত্ত্বেও এক পরীক্ষক কিছুতেই তার উত্তরপত্র জমা দিচ্ছেন না।। নির্ধারিত সময়ের দীর্ঘদিন পরে তিনি উত্তরপত্র নিয়ে আসলেন। পরীক্ষক দেখলেন, পরীক্ষক ভেতরে উত্তরপত্র পরীক্ষণ করেন নি, ভেতরে কোনো দাগও নেই, নম্বরও নেই, শুধু কভার পৃষ্ঠার নম্বর ফর্দে নম্বর বসিয়ে দিয়েছেন। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে (মোহাম্মদ মাহাবুব হাসানের দায়িত্ব গ্রহণের আগে) যথারীতি জানানো হলো। পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বললেনঅনার্সের উত্তরপত্র, মাস্টার্সের উত্তরপত্র নিয়ে দারুণ ব্যস্ত, উচ্চ মাধ্যমিকের উত্তরপত্রে এতোটা মনোযোগ দেয়া কি সম্ভব? তিনি প্রধান পরীক্ষকের বাসায় এসে কভার পৃষ্ঠায় প্রদত্ত নম্বরগুলো তুলে দিলেন ভেতরে। প্রধান পরীক্ষক গোপন রিপোর্টে তাকে ‘সি’ দিলেন। তার কী শাস্তি হলো জানা গেল না। দুই বছর পরে তিনিই হলেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রধান পরীক্ষক!

শাস্তি কি সবার জন্য সমান?

 

উত্তরপত্র মূল্যায়নে চরম গাফিলতির প্রমাণ যারা রাখেন তাদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রত্যেক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হর হামেশাই বলে থাকেন। শুনতে খারাপ লাগলেও এ কথা সত্যণ্ডসবার শাস্তি একরকম হয় না, ক্ষমতাধর হওয়ার কারণে কারও কারও ভাগ্যে শাস্তির বদলে পুরস্কারও জোটে। আবার কারও শাস্তি খুবই বেশি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ বললেনছোট্ট একটি ভুলের কারণে তাকে দুই বছর উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে দেয়া হয়নি অথচ সরকারি শিক্ষক হলে এ রকমটি কখনও হতো না।

একটু যদি ভাবি

 

এসএসসির ফল ঘোষণা হবে। এক সপ্তাহ আগে থেকে আমার মেয়ের নাওয়াখাওয়া এক রকম বন্ধ। প্রিয় পরীক্ষকবৃন্দ, আমরা কি একটিবার কল্পনা করতে পারি না পরীক্ষার্থীর জীবন মরণ সমস্যার কথা। পুননিরীক্ষণের ফলাফল পাওয়ার আগে দীর্ঘ একমাস কী রকম নিদারুণ কষ্টে কাটিয়েছে সুলতানা আর আরমান। এরা তো শুধু আমাদের শিক্ষার্থী না, আমাদের সন্তানও বটে। তারা ভালো ফলাফলের প্রত্যাশায় যে সময়টুকু অতিক্রম করেছে, সে সময় যে কোনো দুর্ঘটনাওতো ঘটে যেতে পারত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধুর নম্বর ফর্দে ১০০ নম্বর যোগ না করার কারণে সে হতাশায় আকণ্ঠ ডুবে গিয়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। অথচ আমাদের বিভাগীয় প্রধান শুধু বলেছিলেন ‘দুঃখিত’ প্রিয় শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে শুধু ‘দুঃখিত’ বললেই কি হবে, এ বিষয়টা নিয়ে আমাদের ভাববার সময় এসেছে।

শিক্ষা বোর্ডের দায়

 

এপ্রিলে শুরু হবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ২০১৭ অথচ ২০১৬ সালের উত্তরপত্র পরীক্ষণের, নিরীক্ষণের সম্মানী পরীক্ষকরা এখনও পাননি। এ ব্যাপারে গত বছর তৎকালীন শিক্ষাবোর্ড সচিব ড. পীযুষ দত্তের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেছিলেনণ্ডবিল অন লাইনে করার কারণে অনাকাঙিক্ষত এ দেরি। দুঃখজনক হলেও সত্যণ্ডসব বিল শেষ পর্যন্ত অন লাইনে করা যায়নি, কিছু বিল চেকএর মাধ্যমেও পরিশোধ করা হয়েছে। দীর্ঘ এক বছর ধরে টাকা না পাওয়ায় শিক্ষকদের অনেকেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। তাদের কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেনণ্ডপেটে খেলে পিঠে সয়। সামান্য ভুল হলেই শাস্তির আওতায় আনা হবে অথচ দীর্ঘ সময় বিল আটকে রাখা হবে। এতো ভাবাই যায় না।

গতানুগতিক নয়, দরকার

যথার্থ নির্দেশনা

 

প্রতি বছর উত্তরপত্র মূল্যায়নের আগে সচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং প্রধান পরীক্ষকগণ সচিব, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এবং প্রধান পরীক্ষকগণ এক সমন্বয় সভায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরীক্ষকদের দিক নিদের্শনা দিয়ে থাকেন। সময় নির্ধারিত করা থাকলেও প্রায় প্রতিবারই কর্মকর্তারা সভায় দেরিতে উপস্থিত হন। সময় নষ্ট হওয়ার অজুহাতে তারা নিজেদের বক্তব্যই শুধু দেন, পরীক্ষকদের বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হয় না। ফলে পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা কখনো পাওয়া হয় না, তাই উত্তরপত্র মূল্যায়নে সমস্যা থেকেই যায়। বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্য থেকে যারা প্রধান পরীক্ষক নির্বাচিত হন উত্তরপত্র বণ্টনে সংখ্যাগত বৈষম্য সৃষ্টি করে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ তাদের অবমূল্যায়ন করেনএ ধরনের অভিযোগ প্রতিবারই করা হয়।

শেষ কথা : সাপের বিষের কী যন্ত্রণা সে কখনও কি বুঝবে, যাকে সাপ একবারও দংশন করেনি। শিক্ষকদের উপলব্ধি করতে হবেতারা যদি অন্যের সন্তানদের উত্তরপত্র মূল্যায়নে দায় সারা ভাব নেন, তবে তাদের সন্তানেরাও অন্য শিক্ষকের অবমূল্যায়নের শিকার হবে। সম্মানিত শিক্ষকেরা যদি মানসচক্ষে একবার আমাদের অসহায় পরীক্ষার্থীদের মুখ ধারণ করতে পারেন তবে কখনো আর তারা গাফেলতি করবেন না, প্রিয় শিক্ষার্থীরাও মানসিক চাপে আত্মহননের পথে যাবার চেষ্টা করবে না। তবে শিক্ষাবোর্ড কি শিক্ষকদের শাস্তির আওতায় আনার কথা ভাবতে পারবেন? আমরা চাই সবার সমন্বয়ে একটা ভালো পরীক্ষা হোক।

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ

নানুপর লায়লাণ্ডকবির ডিগ্রি কলেজ।

LEAVE A REPLY