আজাদী প্রতিবেদন

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নারীদের জরায়ু ক্যান্সারের চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নতুন ব্র্যাকি থেরাপি মেশিনটি পাওয়া গেছে দেড় বছর আগে। কিন্তু সোর্স নামের অপরিহার্য একটি যন্ত্রাংশ (যা দিয়ে রেডিয়েশন বের হয়) পাওয়া যায় আরও এক বছর পর। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেবা চালু হয়নি। ৬ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মেশিনটি হাসপাতালের রেডিওথেরাপি (ক্যান্সার) ওয়ার্ডের একটি কক্ষে গত দেড় বছর ধরে পড়ে আছে। অথচ মেশিনটি চালু হলে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিপুল সংখ্যক নারী ক্যান্সার রোগী এর সেবা পেত।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, হাসপাতালে আনা হলেও মেশিনটির কয়েকটি যন্ত্রাংশ নষ্ট। তাছাড়া সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মেশিনটি এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। ফলে মেশিনটির সেবা চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ বুঝিয়ে দেওয়া মাত্র মেশিনটির সেবা চালু করা হবে। তবে মেশিন পেয়েও দেড় বছরে সেটি চালু করতে না পারার পেছনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অবহেলা রয়েছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান। তাঁর মতে, মেশিনটির সেবা চালু করার ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক ছিলেন না। একটু আন্তরিক হলেই এর সেবা চালু করা কঠিন কিছু ছিল না।

যদিও মেশিনটির সেবা চালু করার ব্যাপারে নিজেরা যথেষ্ট আন্তরিক বলে দাবি করেছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন। তিনি বলেন, মেশিনটি এসেছে ঠিকই। কিন্তু আমরা এখনো সেটি বুঝে পাইনি। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঠিকঠাক করে বুঝিয়ে না দিলে আমরা তো সেবা চালু করতে পারছি না। একই কথা বলছেন রেডিওথেরাপি ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোখলেস উদ্দিন আহমদও।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জার্মান প্রতিষ্ঠান বিআইবিআইজির কাছ থেকে একসাথে তিনটি ব্র্যাকি থেরাপি মেশিন ক্রয় করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রত্যেকটি মেশিনের মূল্য ৬ কোটি টাকার কিছু বেশি। এর মধ্যে একটি বরাদ্দ দেওয়া হয় চমেক হাসপাতালকে। বাংলাদেশের এজেন্সি প্রতিষ্ঠান ‘প্রযুক্তি ইন্টারন্যাশনালের’ মাধ্যমে ২০১৫ সালের শেষ দিকে মেশিন তিনটি সরবরাহ করে জার্মানির ওই প্রতিষ্ঠান। চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দ পাওয়া মেশিনটি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি নিয়ে আসা হয় চমেক হাসপতালে। বাকি দুটি নেওয়া হয় ঢাকার কেন্দ্রীয় ওষুধাগারে। মেশিন সরবরাহ করলেও প্রতিষ্ঠানটি এর অপরিহার্য একটি যন্ত্রাংশ (সোর্স) সরবরাহ করে আরো এক বছর পর।

এ প্রসঙ্গে জার্মান প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশি এজেন্সি প্রযুক্তি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী এস এম শফিকুজ্জামান আজাদীকে বলেন, সোর্স বা রেডিয়েশনের যন্ত্রাংশটি আনতে হলে পারমানবিক শক্তি কমিশন থেকে একটি ইমপোর্ট পারমিট (আমদানি অনুমতিপত্র) লাগে। আর এ পারমিট নিতে হয় গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে। গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইমপোর্ট পারমিট পাওয়ার পর যন্ত্রাংশটি সরবরাহ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের প্রধান ডা. মোখলেস উদ্দিন আহমদ বলেন, পারমানবিক শক্তি কমিশনের এ অনুমতিপত্রের বিষয়টি হয়ত আমাদের যথাসময়ে জানানো হয়নি। আমরা জানতে পারলে অবশ্যই দ্রশুত ব্যবস্থা নিতাম।

এদিকে সোর্স পাওয়ার ৬ মাস পরও চালু হয়নি মেশিনটি। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা না আসায় মেশিনটি ইনস্টল করা যায়নি। এ েতে্র জার্মান প্রকৌশলীরা আসতে একটু দেরি করেছে বলে স্বীকার করেছেন প্রযুক্তি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান নির্বাহী এস এম শফিকুজ্জামান।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেশিনটি ইনস্টল করার লক্ষ্যে সর্বশেষ গত ১০ জুলাই জার্মান প্রকৌশলীরা হাসপাতালের রেডিওথেরাপি ওয়ার্ডে আসেন। এ সময় প্রযুক্তি ইন্টারন্যাশনালের কয়েকজন কর্মকর্তাও ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষানিরীক্ষা করে তারা মেশিনটির ইন্টারনাল ব্যাটারি ও অন্য একটি সার্কিট নষ্ট দেখতে পান। যার ফলে মেশিনটি আর চালু করা সম্ভব হয়নি।

বিষয়টি নিশ্চিত করে এস এম শফিকুজ্জামান বলেন, পরীক্ষানিরীক্ষা করে জার্মান প্রকৌশলী বলেছেন মেশিনটির ইন্টারনাল ব্যাটারি ডাউন (নষ্ট) হয়ে গেছে। এছাড়া আরো একটি সার্কিট নষ্ট হয়ে গেছে। এখন জার্মান থেকে নতুন ব্যাটারি ও সার্কিট আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেগুলো পৌঁছলে মেশিনটি ইনস্টল করা সম্ভব হবে।

মেশিন পাওয়ার দেড় বছরেও সেবা চালু করতে না পারা প্রসঙ্গে রেডিওথেরাপি ওয়ার্ডের প্রধান ডা. মোখলেস উদ্দিন আহমদের দাবি, মেশিনটি চালু করতে আমরা খুবই আন্তরিক। আমার ওয়ার্ডের সবাই চায় এটি দ্রুত চালু হোক। কিন্তু এখনো তো মেশিনটি বুঝে পাইনি। বুঝে পাওয়া মাত্র এর সেবা চালু হবে। এটি চালু হলে চট্টগ্রামের বিশাল সংখ্যক নারী ক্যান্সার রোগী এর সেবা নিতে পারবেন। তাদের আর ঢাকায় দৌঁড়াতে হবে না।

রেডিওথেরাপি ওয়ার্ড সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর নতুন করে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার ক্যান্সার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসে ওয়ার্ডে। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ নারী ক্যান্সার রোগী। সংখ্যায় এটি ২ থেকে ২ হাজার ২০০। এই নারী ক্যান্সার রোগীদের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত স্তন ক্যান্সারে। মোট আক্রান্তের প্রায় ২৫ শতাংশ নারী স্তন ক্যান্সারে ভুগছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জরায়ু ক্যান্সার। ক্যান্সারে আক্রান্ত মোট নারীর প্রায় ২০ শতাংশ এই রোগে ভুগছে। জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের ব্র্যাকি থেরাপি গ্রহণ অপরিহার্য বলে জানান রেডিওথেরাপি বিভাগের আবাসিক সার্জন ও ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. আলী আসগর চৌধুরী।

LEAVE A REPLY