আজাদী প্রতিবেদন

অভ্যন্তরীণ নৌরুটে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চট্টগ্রাম অঞ্চল মূলত চলছে য়ে খুঁড়িয়ে। চট্টগ্রাম থেকে লক্ষ্মীপুরের আজাদ বাজার পর্যন্ত ৫০ নর্টিক্যাল মাইলের বেশি এলাকায় বয়া স্থাপন বা স্থানান্তরসহ বহু জরুরি কাজ সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন রুটে চলাচলকারী লাইটারেজ জাহাজসহ সব ধরনের নৌযানের জন্য বয়া এবং বিকন স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। একটি বয়ার অভাবে জাহাজ ভুল পথে গিয়ে সাগরে নিমজ্জিত হওয়া কিংবা চরের সাথে ধাক্কা খেয়ে আটকে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। রাতের বেলায় নদীতে বয়া এবং বিকনগুলো জাহাজের নাবিকদের পথ দেখায়। চট্টগ্রাম থেকে আজাদবাজার পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএর ১৭টি বয়া রয়েছে। এছাড়া ১০টি বিকন রয়েছে। কিন্তু নদীর পানিতে ভাসমান এসব বয়া এবং বিকন বিভিন্ন সময় নষ্ট হয়ে যায়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এগুলো মেরামত কিংবা নতুন করে স্থাপন বা স্থানান্তর করতে হয়।

চট্টগ্রাম বিআইডব্লিউটিএর কাছে ধ্রুবতারা নামে একটি জাহাজ ছিল। ওই জাহাজটি দিয়ে বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশলীরা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বয়া এবং বিকন মেরামতসহ প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করতেন। কিন্তু জাহাজটি বছর কয়েক আগে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর এটি আর ফেরত আসেনি। বর্তমানে কোথাও বয়া বা বিকন নষ্ট হলে চট্টগ্রাম বিআইডব্লিউটিএ থেকে ঢাকায় খবর দেয়া হয়। ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন শেষে জাহাজ পাঠানো হলেই কেবল নষ্ট বয়া এবং বিকন মেরামত সম্ভব হয়। চট্টগ্রামে বিআইডব্লিউটিএর যেই জেটি ছিল তাও নষ্ট হয়ে রয়েছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে। চট্টগ্রামের জাহাজ মালিকদের প থেকে বিআইডব্লিউটিএর জাহাজটিকে চট্টগ্রামে জরুরি ভিত্তিতে ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতে বছরে চার কোটি টনেরও বেশি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়। চালডালসহ বিভিন্ন ভোগ্য পণ্য, সার, ক্লিংকার, পাথরসহ নানা ধরনের পণ্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, বাঘাবাড়ী, নগরবাড়ী, নোয়াপাড়া, বরিশাল, খুলনা, মংলা, চাঁদপুর, ঘোড়াশালসহ দেশের নানা স্থানে পরিবহন করা হয়। অয়েল ট্যাংকারগুলো চলাচল করে চাঁদপুর, বরিশালসহ নানা রুটে। পণ্যবাহী লাইটারেজ জাহাজ এবং জ্বালানি তেলবাহী অয়েল ট্যাংকার মিলে এক হাজারেরও বেশি জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে পণ্য বোঝাই করে বিআইডব্লিউটিএর কাছে মাস্টার পাইলট বুকিং দেয়। পাইলট জাহাজগুলোকে চট্টগ্রাম থেকে পঞ্চাশ নর্টিক্যাল মাইলের মতো নিয়ে লক্ষ্মীপুরের চরগজারিয়া এলাকার আজাদ বাজারে পৌঁছে দেয়। আজাদ বাজারে একটি পাইলট হাউজ রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে যাওয়া পাইলটেরা ওখানে গিয়ে জাহাজ থেকে নেমে পাইলট হাউজে অবস্থান করেন। ফিরতি পথের অপর জাহাজের পাইলট হিসেবে এসব মাস্টার পাইলট আবারো চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। চট্টগ্রামে বিআইডব্লিউটিএর প্রায় ৫০ জনের মতো প্রশিক্ষিত মাস্টার পাইলট রয়েছেন। একজন পাইলট নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি জাহাজকে ষোলশ’ টাকা প্রদান করতে হয়। জাহাজ যাত্রার আগে মাস্টার পাইলটের উপস্থিতি নিশ্চিত করা বাধ্যতামুলক। চট্টগ্রাম বিআইডব্লিউটিএ পাইলট খাত থেকে বছরে প্রায় গড়ে ৭/৮ কোটি টাকা আয় করে থাকে বলেও সংশিহ্মষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

লাইটারেজ জাহাজে মাস্টার পাইলট সরবাহ দেয়ার ব্যাপারটি এককভাবে বিআইডব্লিউটিএ করে থাকে। মাস্টার পাইলট ছাড়া কোন জাহাজেরই চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনা অতিক্রমে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। লাইটারেজ জাহাজে মাস্টার পাইলট সরবরাহ ছাড়াও নৌ পথের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারটি বিআইডব্লিউটিএ নিয়ন্ত্রণ করে। নদীর চ্যানেল কিভাবে নির্ধারিত হবে, কোথায় কতটুকু ড্রাফট আছে, কোন দিকে চলাচল করার মতো পর্যাপ্ত পানি আছে, কোন দিকে চর আছে ইত্যাদি ব্যাপারগুলো বিআইডব্লিউটিএ ঠিক করে।

এ বিষয়ে গতকাল লাইটারেজ জাহাজের মালিক আলহাজ্ব জগলুল হায়াৎ চৌধুরী বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দেয়া হলেও চট্টগ্রামের প্রতি অবহেলা স্পষ্ট। এখানের জাহাজটি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ বয়া এবং বিকন স্থাপনে জাহাজটি খুবই জরুরি ছিল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঢাকা নির্ভরতার মতো চট্টগ্রামের বিআইডব্লিউটিএকেও ঢাকা নির্ভর করে রাখা হয়েছে।

চট্ট্রগ্রম থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে জাহাজ চলাচল ঝুঁকির মধ্যে থাকে বলে মন্তব্য করেছেন ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের কর্মকর্তা হাজী সফিক আহমেদ। তিনি বলেন, শুধু জাহাজ চলাচলই নয়, এক একটি জাহাজের বিশ বাইশ জন মানুষের জীবন এবং কোটি কোটি টাকার আমদানি পণ্যের নিরাপত্তাও বিআইডব্লিউটিএর সক্ষমতার উপর নির্ভর করে। তিনি চট্টগ্রাম বিআইডব্লিউটিএ’র প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

LEAVE A REPLY