তিন বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ ডাবল লাইন হচ্ছে ঢাকাচট্টগ্রাম রেলপথ। গত ৪ আগস্ট দৈনিক আজাদীর এরকম একটা সংবাদে আনন্দ ও আশার সঞ্চার হলো প্রাণে। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার রেলপথ ‘ডাবল লাইন’ করার মধ্যদিয়ে ঢাকাচট্টগ্রামের ৩২০ কিলোমিটার রেলপথ ডাবল লাইন সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। এতে কমবে যাত্রার সময়।

যোগাযোগই হচ্ছে একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান মাধ্যম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে ইতোমধ্যেই সড়ক ও রেল উন্নয়নে যে মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ হলে গোটা দেশের চিত্রই পাল্টে যাবে। পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াত সুবিধা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি আরও অনেক বেশি গতিশীল হবে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পদ্মা সেতু চালু হলে ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে রেলপথ যাবে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর। এজন্য ২৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন নির্মাণ করবে ইংল্যান্ডের ডিপি রেল কোম্পানি। এতে খরচ হবে ৬০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সাল নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে এই রেলপথের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২০ লাখ ইউনিট কনটেইনার পরিবহন সম্ভব হবে। এ ছাড়া দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ চট্টগ্রামের যোগযোগ অনেক সহজ হবে। কমবে সময় ও ভ্রমণ ব্যয়। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডের ডিপি রেলের একটি সমঝোতা চুক্তিও সম্পাদন হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানটি নকশা প্রণয়ন, অর্থায়ন, রেললাইন নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। এ কাজে সহযোগিতা করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন। রেলওয়ের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাল্টে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের চিত্র। বিশেষ করে বরিশাল বিভাগ প্রথমবারের মতো রেল সংযোগের আওতায় আসবে। গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে মালামাল পরিবহনের মাধ্যমে এই রেলপথ দেশের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

বেশি দিন আগের কথা না, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাতায়াতের জন্য একদিনের প্রস্তুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হতো। সড়কের পথে পথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়িয়েও যানজটে নাকাল হতে হতো যাত্রীদের। এমন দিনও গেছে, রওয়ানা হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পরও ঢাকা পৌঁছানো যায়নি। আবার রেলপথ সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় এক ট্রেনকে লাইন ছাড়তে গিয়ে পথে পথে অন্য ট্রেনের যাত্রাবিরতি ছিল নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। তবে এখন সে চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। ডাবল রেললাইন ঢাকাচট্টগ্রাম যাতায়াতের সময় কমিয়েছে। পাঁচ থেকে সোয়া পাঁচ ঘণ্টাতেই এখন ঢাকা পৌঁছানো যাচ্ছে। সম্পূর্ণ ডাবল লাইন হলে এই সময় চার ঘণ্টায় নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়ক ও রেলের উন্নয়নের মধ্য দিয়েই দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার পুরো চিত্র পাল্টে দিতে সরকার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে । যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উন্নয়নই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গতিশীল এবং শক্তিশালী করবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, চীন ও জাপানের সরাসরি আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে ২০২২ সালের মধ্যে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যেই উল্লেখিত দাতা সংস্থা ছাড়াও ভারত ও ইন্দোনেশিয়া এগিয়ে এসেছে। সড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রায় অর্ধেক কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান সরকারের আমলে ঢাকাচট্টগ্রাম রেলপথে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হচ্ছে। এর মধ্যে অনেক কাজ শেষ হয়েছে, বেশকিছু কাজ শেষ হওয়ার পথে। বেশকিছু অবকাঠামোগত উন্নয়নও শেষ হয়েছে। চলতি বছরের মধ্যে লাকসাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত অংশটির ডাবল লাইন সম্পন্ন হলে বিরতিহীন ট্রেনগুলো আরো কম সময়ে ঢাকাচট্টগ্রাম যাতায়াত করবে।

রেলপথ সচিবকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, গত বছরের শেষ দিকে ঢাকাচট্টগ্রাম রেলপথের কিছু অংশে ডাবল রেললাইন চালু হওয়ার পর থেকে রেলের গতি বেড়েছে। লাকসাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত ডাবল লাইনের কাজ শেষ হলে যাতায়াতে আরো কম সময় লাগবে। আবার ডাবল লাইনের কারণে আগের তুলনায় ট্রেনের সংখ্যাও বেড়েছে। নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।

আমরা চাই রেলের পরিসেবায় যাত্রীদের সন্তুষ্টি। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলার মতো ট্রেন যুক্ত হওয়ায় অনেকেই খুশি। তবে টিকিট প্রাপ্তিটা সহজলভ্য করতে হবে। রেলের সেবার মান আরো বৃদ্ধি পেলে রেলভ্রমণই হবে মানুষের অনিবার্য যোগাযোগ মাধ্যম। এতে আয় যেমন বাড়বে, তেমনি যাত্রী পরিবহনেও রেল পালন করবে যুগান্তকারী ভূমিকা।

LEAVE A REPLY