বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

প্রাগ : রাতেও যে শহর তারুণ্যে উচ্ছল

বাংলাদেশে বোধকরি খুব কম সংখ্যক লোককে পাওয়া যাবে যারা বাটা জুতার নাম শোনেনি। বুদ্ধি বয়স থেকে ভাল, টেকসই ও নির্ভরযোগ্য জুতা বলতে ’বাটা’ বলে জেনে এসেছি এবং তা পরীক্ষিতও। যে কারণে বাটা পছন্দ করতাম তা হলো এতে দামের দিক থেকে ঠকার সম্ভাবনা নেই, যা অন্যান্য দোকানে থাকে। বাটার দোকানে ’ফিক্সড’ দাম, দড়াদড়ির বিশ্রি ব্যাপার নেই। চলতি বছর জানুয়ারিতে গাজীপুর হুমায়ন আহমদের ’নুহাশ পল্লীতে’ যাবার পথে গাড়ি থামিয়ে বাটার দোকান থেকে তড়িঘড়ি করে এক জোড়া জুতা কিনেছিলাম। বাটা জুতার আর একটি মজার ব্যাপার হলো এর মূল্য। কখনোই পুরো ত্রিশ বা চল্লিশ টাকা নয়, হয় ঊনত্রিশ টাকা নিরানব্বই পয়সা নয়তো ঊনচল্লিশ টাকা নিরানব্বই পয়সা। আরো মজার ব্যাপার হলো বাটার জন্মভূমি এই চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী, প্রাগের মূল শপিং এলাকায় বাটার যে বিশাল দোকান, সেখানেও দেখলাম মূল্যের একই দশা, কোনোটাই রাউন্ড ফিগারে নেই, সবার গায়ে সেই ’ঊন’ অর্থাৎ ঊনচল্লিশ বা ঊনপঞ্চাশ। ফানি! প্রথম দিন রাতের বেলায় দোকানটা নজরে পড়েনি। হোটেলে ফিরে ক্যামেরায় তোলা ফটো ঘাটতে গিয়ে দেখি বাটার সেই পরিচিত সাইনবোর্ড, যেমনটি বাংলাদেশে দেখা যায়। অবিকল, একই হরফে লেখা। এলোপাথাড়ি ছবি তুলতে গিয়ে বাটার দোকানটা এসে গেছে ক্যামেরার লেন্সে। হল্যান্ড ফেরার আগের দিন রাতে মনের মধ্যে খচখচ করছিল, বাটার জন্মভূমিতে এসে বাটার দোকনটাকে একবার কাছ থেকে না দেখে ফিরে যাব? মেনে নিতে পারলাম না। ফেরার দিন এয়ারপোর্টে যাবার আগে মেট্রো ধরে চলে এলাম প্রাগের মূল শপিং এলাকায়। দোকানটার ভেতরে গিয়ে উপরে নীচে ঘুরে এলাম, কয়েকটা ছবিও তুলে নিলাম। কেন জানি না বাটার সাথে একাত্মবোধ করলাম। যেন মনে হচ্ছিল এ আমার দেশের দোকান, মনে হচ্ছিল এ আমার বহুদিনের চেনা। সময় থাকলে এক জোড়া জুতাও কিনে নিতাম। কিন্তু আমাদের তাড়া ছিল। কেনা হলোনা।

সেই কবে ১২৩ বছর আগে ১৮৯৪ সালের ২৪ আগস্ট। সে সময়কার চেকোশ্লোভাকিয়ার মোরাভিয়া এলাকা, যা আজকের চেক প্রজাতন্ত্র প্রজাতন্ত্রের অধীন, থমাস বাটা, তার ভাই আন্তোনিও এবং বোন আনা গঠন করেন টি এন্ড টি বাটা সু কোম্পানী। কয়েক জেনারেশন ধরে তারা ছিলেন পেশায় জুতা সেলাইকারী বা আমরা যাকে বলি ’মুচি’। শুরুতে তাদের দশজন ফুলটাইম কর্মচারী ছিল। তাদের ছিল নিয়মিত সাপ্তাহিক মজুরী এবং কাজের নির্দিষ্ট সময়সূচি যা ঐ সময়ে একটি বিরল ব্যাপার। কিন্তু বছর ঘুরতেই থমাসের ব্যবসায় মন্দা দেখা দিল। ঋণের বোঝা বেড়ে উঠলো। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে থমাস ঠিক করলেন চামড়ার পরিবর্তে মোটা কাপড় দিয়ে জুতা তৈরি করবেন এবং অবাক করা এই ধরণের জুতা খুব অল্প সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। কোম্পানি বাড়তে লাগলো। কর্মচারী সংখ্যা বেড়ে পঞ্চাশে গিয়ে দাঁড়ালো। এরপর বাটার শনৈ শনৈ দশা। চার বছর পর প্রথম স্টিম চালিত মেশিন বসানো হলো। ১৯০৪ সালে সংবাদপত্র পড়তে গিয়ে থমাস আমেরিকায় এক ধরণের উন্নত মানের মেশিনের খবর পান। দেরী না করে তিন কর্মী নিয়ে বোস্টনের বাইরে লিন নামে এক শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। লক্ষ্য কী করে বড় উৎপাদনে যাওয়া যেতে পারে সে সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। ছয় মাস পর থমাস ফিরে আসেন নিজ দেশে এবং শুরু করেন বৃহৎ আকারে জুতা উৎপাদন, যা কিনা সে সময় ছিল ইউরোপের মধ্যে সব চাইতে বড়। তৈরি করেন ’বাতোভকি’ নামের জুতা যা চামড়া ও কাপড়ের তৈরি। এই জুতা ছিল ওজনে হালকা, চমৎকার স্টাইল এবং সহনশীল মূল্য। থমাসের কোম্পানীর প্রসার ঘটতে থাকে। ১৯০৮ সালে থমাসের ছোট ভাই আন্তোনিও মারা গেলে তিনি তার ছোট দুই ভাইকে ব্যবসায় সম্পৃক্ত করেন। বাটার প্রথম রপ্তানি শুরু জার্মানিকে দিয়ে, এর পর বলকান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। ১৯১২ সাল নাগাদ বাটার কর্মচারী সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৬০০, এর বাইরে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে যারা ঘরে বসেই বাটার কাজ করতেন। যে বাটার শুরু মাত্র ৬ কর্মচারী দিয়ে, ১২৩ বছর পর আজ সেই বাটার কারখানা রয়েছে বিশ্বের ১৮টি দেশে, ৭০টি দেশে রয়েছে ৫২০০টি ’রিটেল শপ’।

বাটা সম্পর্কে একটু বেশিই হয়তো লিখে ফেললাম। কিন্তু ওই যে বললাম, বাটার সাথে রয়েছে এক ধরনের নষ্টালজিক ব্যাপার। তাই হয়তো একটু পক্ষপাতিত্ব হয়ে থাকতে পারে। সে যাক, এসেছি প্রাগ। আগেই বলেছি, এসে মনে হলো দেরি করেই এসেছি। এমন একটি সুন্দর, উন্নত দেশ আগে দেখতে আসিনি কেন তার কোন সদুত্তর পাইনি নিজে নিজে। তারপরও এই ভেবে সান্ত্বনা খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছি যে ’বেটার লেট্‌ দ্যান নেভার’। যে বিষয়টা আমার কাছে বিশিষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো এই উন্নত পূর্ব ইউরোপীয় দেশটিতে এসে মনে হলো সত্যিকার অর্থে ইউরোপ এসেছি। হল্যান্ড আছি বছর ছাব্বিশেক। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালী, গ্রীস থেকে শুরু করে ইউরোপের বেশ কটি দেশ ঘোরা হয়েছে, দেখা হয়েছে, কিন্তু এর প্রতিটি দেশে গিয়ে কোন কোন এলাকায় পৌঁছে মনে হয়েছে মরক্কো, তুরস্ক, সুরিনামে, চীন, বা আফ্রিকার কোন অংশে এসেছি। প্যারিসের এমন এলাকা আছে যেখানে আক্ষরিক অর্থে আপনার গা ভারী হয়ে আসবে ভয়ে, চারিদিকে কালোদের ছড়াছড়ি, আড্ডা, নোংরা, এদিকওদিক গাড়ির ভগ্নাংশ, ছেঁড়া টায়ার, মাতাল, ভিক্ষুকের হাতপাতা। মেট্রো স্টেশনে ঢুকতে নাকে হাত বা কাপড় দিতে হবে দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্যে। এ কেবল প্যারিসের দশা নয়, হল্যান্ডেরও অনেক জায়গায় এর দেখা মিলবে, যদিও বা উত্তর সাগর পাড়ের এই দেশ প্যারিস কিংবা নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের মত নোংরা নয়। লন্ডনের বিশেষ করে বাঙালি বা এশিয়ান পাড়া ব্রিক লেন তো .ঢাকার আর এক সংস্করণ। ব্রিক লেইন এলাকায় থাকে ছোট বোন মনিকার একমাত্র মেয়ে, নিপা। বছর সাতেক আগে স্বামীর সাথে লন্ডন এসে ইস্ট লন্ডনের এই এলাকায় ঘাঁটি গাড়লে বলে, ইউরোপ এসেছি মনেই হয়না। ডানে, বায়ে, সামনেপেছনে বাঙালি, এদিকওদিক পানের পিক, ঢাকা চাটগাঁর মত ফুটপাত দখলে গেছে দোকনগুলোর মালিকের। অনেক জায়গায় পসরা দোকানফুটপাত পেরিয়ে প্রায় গাড়ি রাস্তায় এসে পৌঁছেছে। তাতে লাল শাক, পালং শাক, মাটির নিচের শক্ত কচু থেকে, লাউ, কাপড়, ওড়না সব। রাস্তার ধারের রেস্টুরেন্ট গুলোতে বাঙালি খদ্দেররা দেদারসে হাত দিয়ে ভাত খাচ্ছে, মাছ, মাংস দিয়ে, একেবারে দেশি স্টাইল। ইতালীর দশা ভিন্ন নয়। রোমের বাঙালি বা বিদেশি এলাকায় এলে মনে হয় ঢাকার গুলিস্তান বা চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ। ইউরোপকে খুঁজে পাইনে।

সেই অর্থে প্রাগ যথার্থই ইউরোপীয় শহর। কদিনের অবস্থানে কোনো কালো চোখে পড়েনি। কেবল গুনে গুনে চার আফ্রিকীয় যুবককে দেখলাম নদীর বুকে বোট ট্রিপ করতে গিয়ে। হাতে ফোল্ডার নিয়ে ওরা ট্যুরিস্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিল। ভালো লেগেছে কোথাও কোন মরক্কীয় চোখে পড়েনি বলে, ভালো লেগেছে কোন তুর্কী বা আলজিরীয় চোখে পড়েনি বলে। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন মরক্কীয় বা তুর্কীদের নিয়ে লেখকের ’এলার্জি’ রয়েছে। কিন্তু তা না। এরা নেই বলে প্রাগ শহর নিরাপদ মনে হয়েছে। গভীর রাতেও অনিরাপত্তায় ভুগিনি। গভীর রাতেও তরুণীরা স্বল্প বসনে শহরের বিভিন্ন স্থানে আড্ডা দিয়ে চলেছে, কেউবা দল বেঁধে গোল হয়ে বসেছে, কেউ বা রেকে বসে, কেউবা ক্যাফেবারে। কিছু চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিক চোখে পড়েছে। কিন্তু এরা মরক্কীয়, আলজিরীয় বা তুর্কীদের মত নাগরিক জীবনে ’নুইসেন্স’ সৃষ্টি করেনা। সাম্প্রতিক সময়ে বেলজিয়াম, ইউরোপ, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানীসহ বিভিন্ন শহরে যে সন্ত্রাস তার বেশির ভাগেই এরা জড়িত। হল্যান্ডে এদের রয়েছে দুর্নাম। মূলধারা সমাজ থেকে বাইরে এরা। এই গোষ্ঠীদের মাঝে বেকার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যহারে বেশি। ফলে অনেকেই, বিশেষ করে তরুণ গোষ্ঠী ভোগে হতাশায়, আর হতাশা থেকে এদের অনেকে জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাস, চুরি, ড্রাগস্‌ সহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ডে। প্রাগে এদের চোখে পড়েনি। পড়েনি বলে প্রাগ সুন্দর রয়েছে, নেই বলে প্রাগকে মনে হয়েছে ইউরোপের একটি নগরী। প্রাগকে মনে হয়নি আমস্টারডাম, লন্ডন, প্যারিস, ব্রাসেলস, রোমের মত আর একটি নগরী।

(চলবে) ২০১৭

LEAVE A REPLY