সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি

বেপরোয়াভাবে পাথর আহরণের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে এসব পাথর আহরণ কর্মকাণ্ড চললেও এটি বন্ধে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এর ফলে পাথর উত্তোলনে জড়িতরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে দিন দিন। এতে ধসের মুখে পড়েছে চন্দ্রনাথ পাহাড়। সে সাথে ধসে পড়ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী মন্দিরগুলো। বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়ে রয়েছে বড় বড় পাথর। বলতে গেলে পাহাড়টা একটি পাথরের ডিপো। এক একটি পাথরের ওজন কয়েক টনের মত। পাথর ব্যবসায়ীরা এসব পাথর খুঁজে নেন। তারপর তারা শাদব বা ছেনি দিয়ে প্রথমে ঐ পাথর খুঁড়ে সেখানে একটি গর্ত করে এরমধ্যে বারুদ পুরে দেন। এরপর লম্বা একটি রশির এক প্রান্ত গর্তে রেখে অপর প্রান্ত দূরে নিয়ে যান। এরপর সেখানে আগুন লাগিয়ে দিয়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। আগুন রশির একপ্রান্ত থেকে জ্বলতে জ্বলতে অপর প্রান্তে বারুদে লাগার সাথে সাথে প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ফেটে যায় পাথর। এসময় বিকট শব্দে কেঁপে উঠে পাহাড়সহ আশপাশের এলাকা। বড় পাথরটি টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ে চারিদিকে। এরপর পাথর ব্যবসায়ীরা এসব খুঁজে নিয়ে জড়ো করেন নির্দিষ্ট স্থানে, তারপর বিক্রি করে দেন। দীর্ঘদিন ধরেই চলছে এসব পাথর ভাঙা কার্যক্রম।

এলাকাবাসী জানান, দু’ধরণের পদ্ধতিতে পাহাড় থেকে ভাঙা পাথর পাচার করা হয়। প্রথমতজড়ো করা নির্দিষ্ট স্থান থেকে পাথরের টুকরোগুলোকে পাহাড়ের একটি সুবিধাজনক স্থানে নিচের দিকে গড়িয়ে দেয়া হয়। গাছগাছালি দুমড়েমুছড়ে এক সময় পাথরটি পড়ে পাহাড়ের পাদদেশে।

সেখান থেকে ঠেলা বা ভ্যান গাড়ি করে ঢাকাচট্টগ্রাম ট্রাংক রোড, তারপর ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় দেশের বিভিন্ন জায়গায়। দ্বিতীয়তছোট ছোট পাথরগুলোকে পাহাড়ের ছরার পথে নিয়ে যায়। তারপর বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢলের মুখে ছেড়ে দেয়া হয়। পানির সাথে সাথে পাথরগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে সমতলে চলে আসলে তা উদ্ধার করে গাড়িতে করে পাচার করা হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। এছাড়া প্রতিদিনই পাহাড়ের বিভিন্ন ছরা থেকে পাথর স্থানীয়ভাবে বিক্রি করা হয়।

সীতাকুণ্ড মেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও পৌর প্যানেল মেয়র হারাধন চৌধুরী বাবু জানান, প্রতিবছরই কোনো না কোনো টিলা ধসে পড়ছে। ১৯৯৯ সালে শংকরমঠের টিলা ধসে চাপা পড়ে ১১টি গরু মারা গিয়েছিল। পাথর সরে যাওয়ার কারণ পাহাড়ের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ছে। কর্তৃপক্ষ এসব বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট চন্দন দাশ জানান, ব্যাপকভাবে পাথর ভাঙার ফলে চন্দ্রনাথ পাহাড় হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন অসুবিধা সৃষ্টি হচ্ছে জনজীবনে। পাহাড়ের মাটি থেকে পাথর খুঁড়ে নেয়ায় পাহাড়ের স্থায়ীত্ব কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্যও। অন্যদিকে হুমকির মুখে পড়েছে হিন্দুদের ঐতিহ্যবাহী স্বয়ংম্ভুনাথ ও বিরূপাক্ষ মন্দির। যে কোনো সময় এসব মন্দির মুহূর্তে ধসে স্তূপে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চন্দন দাশ।

এলাকাবাসী জানান, পাথর ভাঙার কম্পনের ফলে পাহাড়ি গাছগাছালির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের মাটি ও পাথরে ছরাখালগুলো ভরে যাচ্ছে। ছরা ভরে যাওয়ায় একটু বৃষ্টি হলেই পানি উঠে যাচ্ছে ঘরবাড়িতে, ফসলহানিসহ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে ব্যাপক। ফলে প্রতিবছর এখানে বন্যায় ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে।

সীতাকুণ্ড পৌরসভার মেয়র আলহাজ্ব বদিউল আলম দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী। যার ফলে পাহাড়ের ভিত দুর্বল হয়ে যে কোনো সময় পাহাড়ের টিলা ধসে পড়তে পারে।’ মেয়র অরো জানান, ‘এই পাহাড় রক্ষণাবেক্ষণ করে সরকার প্রচুর রাজস্ব আয় করতে পারে। রাবার প্রকল্প হাতে নেয়ার মতো উপযুক্ত মাটি এই পাহাড়ে বিদ্যমান। তাছাড়া বৃক্ষ নিধন অভিযান প্রতিরোধ করে ব্যাপক বৃক্ষ রোপণ করেও কোটি কোটি টাকা আয় করতে পারে সরকার।

LEAVE A REPLY