ফেরদৌস আরা আলীম

না, মন্ত্রিসভার কোনও জরুরি বৈঠক এসব নিয়ে হয়তো বসে না। নারীর কীর্তি মহান হতেই পারে, কীর্তিময়ী নারীরা সম্মান পেতেই পারেন কিন্তু নারীর জীবন? নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু না, আমাদের অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিদ, রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ কারণ নির্ণয় করেছেন, প্রতিকারের পথও বাতলে চলেছেন। সকলেই ভাবছেন, কেবল ভাবছেন। ধর্ষণ কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ অথচ শাস্তি হয় না। ধর্ষণ মামলা জামিন অযোগ্য। অথচ জামিন নিয়ে অপরাধী আবার ধর্ষণের হুমকি দেয়, ধর্ষণ করে। ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ হবার কথা কিন্তু মামলা কিছুতেই শেষ হয় না।

গত কয়েকদিন ধরে খবরের কাগজের প্রথম পাতার বড় বড় অক্ষরের শিরোনামগুলোতে চোখ পেতে রাখি, এই বুঝি মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ কোনও বৈঠকের খবর এলো! কিন্তু না। খরায় চোখ পুড়ে যায়। আজ (..১৭) বুঝেছি খবর এলেও তা হবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খবর; নারী শিশু নির্যাতন বিশেষ করে ধর্ষণজনসংখ্যার অর্ধেকের একটা অতি সামান্য অংশের খবর; কিছুতেই তার পক্ষে জাতীয় গুরুত্ব পাওয়া সম্ভব নয়। বরং বগুড়ার সেই কিশোরীর কি হলো সে খবরটা দেখে নিই ভালো করে। ওরা মামেয়ে এখন সুস্থ; হাসপাতাল ছাড়তে হবে ওদের।

কিন্তু কোথায় যাবে ওরা? মেয়েটিকে রাজশাহী বিভাগের সরকারি সেফ হোমে পাঠানো হচ্ছে। মা যাবে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে। পরিবারের ৩ সদস্য ছিটকে যাবে ৩ জায়গা, ৩ ঠিকানায়। অথচ এই সেদিনও এদের ঘর ছিল, সংসার ছিল, সুখী গৃহকোণ ছিল। আদালতের আদেশ শুনে মামেয়েতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে। মেয়েটি সাংবাদিকদের বলেছে, সেফ হোম একটা জেলখানার মতো; আমি তো কোনও অপরাধ করিনি। আদালতের উপায় ছিল না কারণ মেয়ের পিতার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি মেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারবেন কিনা। পিতার উত্তর ছিল নাবাচক। আমাদের মনে পড়ে যাবে সেই পিতাকে যিনি মেয়ের নিরাপত্তা দিতে না পেরে রেললাইনে মাথা পেতে দিয়েছেন মেয়েসহ একসঙ্গে।

একই কাগজের পাতা উল্টাতেই বাঁশঝাড়ে তরুণীর লাশের খবর । বাঁশঝাড়ে লাশ? মনে পড়ে যায় আমাদের কথাসাহিত্যের প্রথম আধুনিক নির্মাতা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে। দেশভাগের পরে তিনিই প্রথম বাঁশঝাড়ে লাশ দেখিয়েছিলেন আমাদের। শুধু কি লাশ? একই সঙ্গে যুবক শিক্ষক আরেফ আলীর চোখে আমরা দেখেছি শীতের উজ্জ্বল জ্যোৎস্না রাত। দেখেছি কুয়াশার আচ্ছন্নতায় বাঁশঝাড়ে যুবতীর অর্ধ উলঙ্গ লাশ।

গল্পটা একটু খুলেই বলি। নিরীহ স্বভাবের এই যুবক শিক্ষক গ্রামের একটি সম্পন্ন, সম্ভ্রান্ত পরিবারের আশ্রয়ে থেকে সেখানকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। প্রকৃতির ডাকে বাইরে গিয়ে তিনি জোছনার মায়ায় পড়ে যান। ওই জোছনার চেয়েও রহস্যময় তাঁর আশ্রয়দাতা পরিবারের দরবেশ কিসিমের রহস্যমানব আবদুল কাদেরকে চোখের উপর দ্রুত অপসৃত হতে দেখেন তিনি। উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরির এক পর্যায়ে তিনি বাঁশঝাড়ে যুবতীর লাশ দেখেন। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থলে কাদেরকে ফিরে আসতে দেখে তাঁর মনে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে যে কাদেরই ওই নারীর হত্যাকারী। এখানটায় এসে গল্পের কলি দল মেলে ফুল হয়। গ্রামের এক দরিদ্র মাঝির স্ত্রীর সঙ্গে কাদেরের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। মাঝির স্ত্রীর সঙ্গসুখ উপভোগরত কাদের আশে পাশে মানুষের সাড়া পান। ভয়ার্ত নারীর কক্তে অনুচ্চ আর্তনাদ শুনেই কাদের তার গলা টিপে ধরে। মেয়েটি মারা যায়। আরেফ আলী নিশ্চিত যে এ ঘটনার হোতা কাদের। কিন্তু একথা কাউকে বলা যাবে না। সে বরং লাশটা নদীতে ফেলে দেবার কাজে কাদেরকে সাহায্য করে।

কিন্তু যুবক শিক্ষক কিছুতেই স্বস্তি পান না। এক পর্যায়ে পুলিশকে তিনি ঘটনাটা জানান। অতঃপর বাস্তব সামাজিক পটভূমিতে আমরা সামাজিক কুশীলবদের পদচারণার শব্দ শুনি। এবং জেনে যাই যে এ হত্যার দায় বহন করতে হবে আরেফ আলীকে। কারণ অপরাধ করার জন্য আবদুল কাদেরদের মুক্ত থাকতে হবে। এটাই নিয়ম শিল্পের। বড় মাপের শিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর তিনখানা উপন্যাসে (বীজে শাঁসে মুখ্যত ক্রাইম স্টোরি হায়াৎ মামুদ) ঘুরে ফিরে সে কথাটিই তো বলেছেন। সে শৈল্পিক বাস্তবতা থেকে অর্ধশত বর্ষ পরেও আমাদের বাস্তব মুক্তি মিলেছে কি?

গহীন অরণ্যে প্রাসাদোপম বাড়ি ঘরের গল্প আমাদের অনেক আছে। সেখানে বন্দী করে রাখা রাজকন্যার বিনামেও প্রেমিকা বা স্ত্রীর গল্পও আমাদের কম নেই। রুদ্ধশ্বাসে সে সব গল্পের শেষ পর্যন্ত ছুটে গেছি বারবার, বহুবার। এখন তো সে ঘন ঘোর জঙ্গল এলাকা আর নেই। কাঙিক্ষত প্রয়োজনীয় বনভূমিই তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। লোকালয়ের ধারেকাছে এ রকম পরিত্যক্ত ভবনে তালাবন্দী করে ছ’মাসেরও বেশি সময় ধরে তরুণীকে আটকে রাখা চাচা সম্পর্কের কেউ, দিনের পর দিন তাকে নির্যাতন করে। কাক পক্ষীও তা জানে না, এও সম্ভব? এসব ভবন কি ভেঙে ফেলা যায় না? সিরাজগঞ্জ সদরের কলেজ ছাত্রী সুখী খাতুন (২১) গলাকাটা লাশ হয়ে পড়ে আছে। পুলিশের সোজা হিসাব এ হত্যাকাণ্ড হয় প্রেমঘটিত অথবা শত্রুতাজনিত। প্রেমে প্রতারিত হয় মেয়েরা। হতেই পারে। ছেলেরা হয় না? হয় নিশ্চয়ই। কিন্তু উভয়ক্ষেত্রে মেয়েটিকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয় কেন? তার হ্যাঁ বা না দুটোই হত্যাযোগ্য অপরাধ? ‘শত্রুতাজনিত’ শব্দটা আরও মারাত্মক। নিজে শত্রু না হয়েও শত্রুতার মোক্ষম শিকার সে হতে পারে। আরও একটি শব্দের সঙ্গে ইদানিং খুব সাক্ষাৎ হয় আমাদের। প্রলোভন। আড়াই বা তিন সাড়ে তিনের শিশু কন্যাটি চকলেটবিস্কুটে প্রলুব্ধ হয়ে ধর্ষকের পিছু নেয় এবং কিশোরী বা তরুণী পড়ে বিয়ের প্রলোভনে। বিয়েতে প্রলুব্ধ মেয়েটির জন্য শরীরি সম্পর্কের ফাঁদপাতা হয়। সেখানে একক ধর্ষণ, গণধর্ষণ, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ধরে ধর্ষণ, ভিডিও চিত্র ধারণ এবং শেষ পর্যন্ত খুন হয়ে যেতে হয় মেয়েটিকে। এসব ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনাও প্রচুর ঘটছে।

স্বামী প্রবাসী। তার রেখে যাওয়া সদ্য বিবাহিত তরুণী স্ত্রীর উপর শ্বশুরভাসুর দেবর সবারই চোখ পড়ে কারণ চোখ আছে সবার। চোখ থাকে না কেবল শাশুড়ির; তিনি অন্ধ হয়ে যান। অন্ধ হতে হয় তাঁকে। সেই ফাঁকে খুন হয়ে যায় মেয়েটি বা আত্মহত্যা করে। গফরগাঁওয়ের স্বপ্না খাতুন (৭ মাসের বিবাহিত) দেবরের যৌন হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়ে চলে গেল। (যুগান্তর, ৪ আগস্ট) জেলায় জেলায় এখন পর্ণোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ ট্রাইব্যুনালে মামলা হচ্ছে। মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। আদালত এলাকার থানাকে মামলাটি এজাহার হিসেবে নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দিচ্ছেন। কিন্তু অর্থে বিত্তে বা ক্ষমতার দাপটে প্রভাবশালীদের ছায়ায় যাদের বসবাস তাদের নাম নেবার সাধ্য আছে কারও? তাছাড়া পর্ণোগ্রাফি কাদের নিয়ন্ত্রণে? আমাদের এক ফুয়াদের (চেনেন তাঁর পিতাকে?) কাছ থেকে বিদেশি পর্ণোগ্রাফি সাইট কর্তৃপক্ষও উচ্চ মূল্যে সে পণ্য কেনে; ভাবা যায়? ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করা ফুয়াদ ৮টি ওয়েবসাইটে নিজের তৈরি করা ভিডিও দেখায়। ধর্ষক তৈরি করে।

বগুড়ার শেরপুর থেকে সিরাজগঞ্জের কালিতাপুরকতদূর? যতদূরই হোক কালিতাপুর চরে প্রেমিক বা বন্ধুসহ নৌকায় বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছে মেয়েটি। বিবাহিত নয় বলে ওদের কাছে দাবি করা হলো ১৫,০০০ টাকা। শেষ পর্যন্ত ছেলেটিকে আটকে রেখে ৪ জনের একটি দল মেয়েটিকে নির্যাতন করে। মেয়ের চিল চিৎকারে লোকজন জড়ো হয়। মেয়েটি মামলা করেছে। অপরাধের হোতা জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি এবং ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সহযোগিসহ ধরা পড়েছেন, সংগঠন থেকে এঁরা বহিষ্কৃত হয়েছেন।

না, মন্ত্রিসভার কোনও জরুরি বৈঠক এসব নিয়ে হয়তো বসে না। নারীর কীর্তি মহান হতেই পারে, কীর্তিময়ী নারীরা সম্মান পেতেই পারেন কিন্তু নারীর জীবন? নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু না, আমাদের অপরাধ বিশেষজ্ঞ, সমাজবিদ, রাজনৈতিক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ কারণ নির্ণয় করেছেন, প্রতিকারের পথও বাতলে চলেছেন। সকলেই ভাবছেন, কেবল ভাবছেন। ধর্ষণ কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ অথচ শাস্তি হয় না। ধর্ষণ মামলা জামিন অযোগ্য। অথচ জামিন নিয়ে অপরাধী আবার ধর্ষণের হুমকি দেয়, ধর্ষণ করে। ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ হবার কথা কিন্তু মামলা কিছুতেই শেষ হয় না। ভেবে কেউ কূল পাচ্ছেন না, মলিন ধূলা লাগিবে কেন পায়ে/ধরনী মাঝে চরণ ফেলা মাত্র?

আমরা জানি ৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে এরশাদ আমলে বেগম সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে নারী নির্যাতন ও সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ কমিটি গঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আজকের এবং (অনেকদিনের) সভাপতি ছিলেন সে কমিটির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেত্রী এবং কর্মী। আজ বড় দুঃখে, নিদারুণ হতাশায় তাঁর লেখা পড়ছি। ‘শেষ হোক অনিঃশেষ যন্ত্রণার এ সময়’ শিরোনামে তিনি (আয়েশা খানম) লিখেছেন দৈনিক সমকালে সম্পাদকীয় ও মন্তব্য পাতার শীর্ষদেশে (২২ শ্রাবণ ১৪২৪)। তিনি লিখেছেন, ‘… এক উদ্বিগ্ন সময় অতিক্রম করছি আমরা। অনেক কিছু নীরবে হজম করছি। কত যে কষ্ট তা প্রকাশ করতে পারি না।আমরা কি এক হয়ে দাঁড়াতে পারি না? আমরা কি দলমত ভুলে বসতে পারি নানারীর প্রতি যে কোনো ধরনের সহিংসতার ঘটনা এলে সে বিষয়ে নীতি অবস্থান হবে জিরো টলারেন্স? যতদিন তা পারবো না, ততদিন বিচারের বাণী নিরবে, নীভৃতে কাঁদবে, তাতে সন্দেহ নেই।’

LEAVE A REPLY