কাজী রুনু বিলকিস

অস্বীকার করব না এ সরকারের অনেক ভাল কাজ আছে। পাশাপাশি যখন আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠে ত্বকী নামক এক অসাধারণ প্রতিভাবান কিশোরের থেঁতলানো শরীর, তনু নামের এক সংগ্রামী ছাত্রীর লাশ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ক্ষতবিক্ষত পড়ে থাকার কথা, যখন মনে আসে সাগররুমীর বীভৎস হত্যাকাণ্ডের কথা, তখন মনে হয় এসরকার বড় নিষ্ঠুর। কেন এসব বিচার হয় না? কেন সরকার এদের খুনীদের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে ? তখন আমার কাছে সরকারের ভাল কাজগুলো অর্থহীন হয়ে যায়। আমার আর কিছুই মনে থাকে না। সরকারের চোখ ধাঁধানো উন্নয়নে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সাধারণ মানুষ কার কাছে যাবে ? কি করবে ?

ভাবছিলাম ছোটবেলা থেকে সংবাদপত্র পাঠের অভ্যেসটা কেন করিয়েছিলেন আমার অভিভাবকরা? এখন মনে হয় এই অভ্যেসটার কারণে আমি সবসময়ই একটা অস্বস্তি ও মানসিক অশান্তির মধ্যে ডুবে থাকি। আমার ঘর, আমার পরিবার নিয়ে যতই শান্তিতে থাকি না কেন পারিপার্শ্বিক অবস্থা, প্রতিদিনের দুঃসংবাদ আমার ব্যক্তিগত শান্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শান্তিপ্রিয় প্রতিটি নাগরিককেই তাই করে বলে আমার বিশ্বাস। জাতীয় দুঃসংবাদগুলো আমার মগজে, আমার মননে এক ধরনের কষ্ট ভরে দিয়ে যায়। হতবিহ্বল করে দেয়। এর থেকে বেরিয়ে আসা মোটেও সহজ নয়।

সৃষ্টির শুরু থেকে নারী শারীরিক দুর্বলতার কারণে শক্তিধর পুরুষের কাছে নির্যাতিত হয়ে চলেছে। পৃথিবীর সর্বত্রই নারীরা নির্যাতিত হয়ে থাকে কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে তার অনুপাত নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে তার সুবিচার নিয়ে, প্রশ্ন হচ্ছেঅপরাধী ও নির্যাতকদের ক্ষমতার উৎস নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। প্রশ্ন সরকারের অবস্থান নিয়ে, সরকারি দলের নেতাকর্মীদের ক্ষমতার দাপট নিয়ে, প্রশ্ন হচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক পতন নিয়ে, সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে। দেশ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সরকার কোন কাজে ব্যস্ত আমাদের ঠিক জানা নেই। দেশে এখন কোনো বিরোধী দল নেই তাদের কোনো কর্মসূচি আমরা দেখতে পাই না। কোন সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চা নেই। সরকার যেন ক্রমশ স্বৈরশাসক হয়ে উঠছে। জনগণের সামনে দৃশ্যপটে ভেসে বেড়াচ্ছে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের তাণ্ডব, সরকারি দলের ছত্রছায়ায় থাকা প্রায় প্রতিটি নেতাকর্মী এখন খল নায়কের ভূমিকায়।

ক্ষমতার দাপট মানুষ কখনোই পছন্দ করে না। ক্ষমতাসীন দলকে এটা বুঝতে হবে। শুধু বগুড়ার ধর্ষক তুফান নয়। ক্ষমতার গর্ভে পয়দা হওয়া হাজারও তুফান দেশের সর্বত্রই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। নারী নির্যাতনের ধর্ষণের দেশ হিসেবে তালিকার শীর্ষে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার টের পাচ্ছে না।

মানবেতর প্রাণিদের কথা বাদ দিলে বাংলাদেশে সবচেয়ে নাজুক প্রাণী হলো নারী আর শিশু। নারী ও শিশু নির্যাতনের যে সব ঘটনাগুলো ইদানীং মিডিয়াতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ নেই। এটা ধারাবাহিকভাবে চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অর্থেবিত্তে ক্ষমতায় পুষ্ট মানুষ নামের পশুগুলো আমাদের চারপাশকে নরকে পরিণত করেছে। ধর্ষণ এখন বাংলাদেশে খুব সহজ ব্যাপার। ধর্ষণ এবং খুনই ক্ষমতা প্রদর্শনের এক উন্মুক্ত পথ। নারী নির্যাতন কখনও বন্ধ ছিল না প্রকাশ্য কিংবা গোপনে তা চলে আসছে। দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে ক্ষমতায় ভর করে এসব অনাচার চলছে।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নারীর শাসন চললেও এদেশে নারীর অবস্থানের কোন পরিবর্তন হয়নি। নারীর সনাতন নিয়তি নারীকে ছেড়ে যায় নি, ক্ষমতাসীন দলের তুফান, কিংবা আপন জুয়েলার্সের শাফকাত, সৎ মেয়ের ধর্ষক আরমান তাদের দুর্ভাগ্যক্রমে সামনে চলে এসেছে। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এসব ধর্ষকদের বসবাস। এদের মুখোশ উন্মোচিত হয় না। আমাদের শহর কিংবা গ্রাম, বাস, ট্রাক রিকশা সবখানে জাল বিছিয়ে রেখেছে তুফানেরা। কোন কোন সময় ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে নারীরাও পুরুষ হয়ে উঠছে। নিজের বিপক্ষে নিজেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। পুরুষকে সাহায্য করছে। ক্ষতিগ্রস্ত করছে নারীকে।

শিশু খুনের প্রবণতাও বাড়ছে। আরও বেশি ভয়ংকর কথা হচ্ছে শিশুরা খুন হচ্ছে আপন মা বাবার হাতেও। এছাড়া পারিবারিক জটিলতা, যৌতুক মা বাবার বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের জটিলতার নির্মম শিকার হচ্ছে শিশুরা। এক শ্রেণির পাষণ্ড প্রকৃতির মানুষ পূর্ণ বয়স্ক শত্রুর ওপর হিংসা ক্রোধ চরিতার্থ করতে বেছে নিচ্ছে শত্রুর শিশু সন্তানকে হত্যা করার পৈশাচিক পন্থা। শিশু ধর্ষণের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আঁতকে উঠতে হয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম বলছে, গত বছর সারাদেশে চারশর বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ৬৪ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। স্তম্ভিত হতে হয় যখন দেখা যায় গণধর্ষণের শিকার শিশুদের অধিকাংশের বয়স চার থেকে নয় বছর। গণধর্ষণের শিকার শিশুদের ধর্ষণ করার পর খুন করে লাশ পুঁতে রাখা কিংবা কোথাও ফেলে দেওয়াএ কোন সমাজে আমাদের বসবাস? কি করে ঘটতে পারে এমন সব বিকৃত পৈশাচিকতা? সাধারণভাবে মনে করা হয় বিচারহীনতার পরিবেশ, সব ধরনের অপরাধ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া, অপরাধীরা মনে করে অপরাধ করে পার পাওয়া সম্ভব।

বগুড়ার মামেয়ে নির্যাতনের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় আমরা পতনের কোন স্তরে আছি? ধর্ষকের এই দুঃসাহসকে আমরা কোনোভাবে ব্যক্তিঅপরাধ হিসেবে মেনে নিতে পারছি না। তুফান ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতা, সে জানে তার অপরাধের ভার নেওয়ার জন্য তার দল আছে তার ক্ষমতার উৎস তার দল। সেই ধর্ষক তুফান ও তার সহযোগীদের প্রেপ্তারের ছবি দেখেছি বটে। তবে তুফানেরা বেরিয়ে আসবে এটা নিশ্চিত। ক্ষমতাশ্রয়ীদের বিচার হয় না। এই বোধ এই বিশ্বাস আমাদেরকে অসহায় করে তুলছে অনেক নৃশংস ঘটনার বিচার না দেখে দেখে। দরিদ্র পরিবার হলে তো আর কথাই নেই, বিচার চাইতে গিয়ে কত পরিবার যে সর্বহারা হয়েছে, দেশ ছাড়া হয়েছে তার কতটুকুই বা আমরা জানি?

অস্বীকার করব না এ সরকারের অনেক ভাল কাজ আছে। পাশাপাশি যখন আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠে ত্বকী নামক এক অসাধারণ প্রতিভাবান কিশোরের থেঁতলানো শরীর, তনু নামের এক সংগ্রামী ছাত্রীর লাশ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ক্ষতবিক্ষত পড়ে থাকার কথা, যখন মনে আসে সাগররুমীর বীভৎস হত্যাকাণ্ডের কথা, তখন মনে হয় এসরকার বড় নিষ্ঠুর। কেন এসব বিচার হয় না? কেন সরকার এদের খুনীদের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে ? তখন আমার কাছে সরকারের ভাল কাজগুলো অর্থহীন হয়ে যায়। আমার আর কিছুই মনে থাকে না। সরকারের চোখ ধাঁধানো উন্নয়নে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সাধারণ মানুষ কার কাছে যাবে ? কি করবে ?

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায়ে যে পর্যবেক্ষণ বক্তব্য দিয়েছেন তার সামান্য কিছু অংশ উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করব।

ফ এমন একটি পঙ্গু সমাজে আমরা আছি ভালো মানুষ আর ভালো স্বপ্ন দেখেন না।

ফ ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দাম্ভিকতা দেখানোর ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার মতো কোন নজরদারি প্রতিষ্ঠান (ওয়াচ ডগ) নেই।

ফ রাজনীতি এখন আর মুক্ত নয় এটি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে।

ফ পূর্ব পুরুষেরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চেয়েছিলেন ক্ষমতাধর দৈত্য জন্ম দিতে চাননি।

ফ একমাত্র বিচার বিভাগই অপেক্ষাকৃত স্বাধীন, যদিও তা ডোবার পথে।

LEAVE A REPLY